Logo
Logo
×
বেকারি পণ্যের দাম বাড়ল ২০ শতাংশ, যে কারণ দেখাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা

বেকারি পণ্যের দামও বাড়ায় ভোক্তার খাদ্য ব্যয়ের তালিকায় যুক্ত হয়েছে নতুন চাপ। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ

অর্থনীতি ।  পণ্যবাজার

বেকারি পণ্যের দাম বাড়ল ২০ শতাংশ, যে কারণ দেখাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০২:৪৯ পিএম

আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ১৫:০৯ পিএম

নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপে যখন সাধারণ মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠেছে, তখন ভোক্তার খাদ্য ব্যয়ের তালিকায় যুক্ত হয়েছে নতুন চাপ। চিনি, ময়দা, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণ দেখিয়ে পাউরুটি, বিস্কুট, চানাচুরসহ শুকনা বেকারি পণ্যের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় শনিবার সকাল থেকে নতুন দরে এসব বেকারি পণ্য বিক্রি শুরু হয়েছে।

নতুন দাম

বেকারি পণ্যের নতুন দাম কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়া হয় গত ৯ সেপ্টেম্বর। ‘ব্রেড বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি’ এ মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেয়। এরপর নতুন দর কার্যকরের প্রস্তুতি হিসেবে দুই দিন কারখানা বন্ধ রাখেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। পরে শনিবার থেকে বাড়তি দরে উৎপাদন ও বাজারজাত শুরু হয়।

নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, আগে ১০০ টাকায় বিক্রি হওয়া দুই পাউন্ডের একটি পাউরুটির দাম বেড়ে হয়েছে ১২০ টাকা। একইভাবে ৫০ টাকার এক পাউন্ড পাউরুটির নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ টাকা।

শুধু পাউরুটি নয়, অন্যান্য বেকারি পণ্যের দামও বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ চায়ের দোকানে আগে ১০ টাকায় বিক্রি হওয়া কিছু বেকারি পণ্যের দাম এখন ১৫ টাকা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কাঁচামাল ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির দাবি

ব্যবসায়ীদের দাবি, গত কয়েক মাসে বেকারি শিল্পে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ময়দা, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো প্রধান কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

তাদের মতে, এতে শুধু কাঁচামালের ব্যয় নয়, কারখানা পরিচালনার সামগ্রিক খরচও বেড়েছে। ফলে আগের দামে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে বাধ্য হয়েই দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ব্রেড বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, রুটি, বিস্কুট, কেক, বাটার বনসহ সব ধরনের বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ওজন কমিয়ে দাম সমন্বয় করা হয়েছে, আবার কিছু পণ্যের দাম সরাসরি বাড়ানো হয়েছে। সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, উৎপাদন খরচ অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় সমিতির সদস্যরা সম্মিলিতভাবে দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বেকারিগুলো স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না।

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত

সমিতির সভাপতির ভাষ্য, আগে ভোর হওয়ার আগেই যেসব বেকারিতে পাউরুটি, কেক ও বিস্কুটসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির কাজ শুরু হতো, এখন অনেক কারখানাকে দিনের বড় একটি সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

এর ফলে বিশেষ করে ছোট উদ্যোক্তারা বেশি সমস্যায় পড়ছেন বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা।

দাম বাড়ায় বিক্রি কমার অভিযোগ

ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি থাকলেও হঠাৎ করে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতা ও চা-দোকানিদের ভাষ্য, নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর বেকারি পণ্যের বিক্রি কমেছে।

আগে যেসব পণ্য দুপুরের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যেত, সেগুলোর কিছু এখন দিনের শেষেও অবিক্রীত থাকছে। অনেক ক্রেতা আগের তুলনায় কম পরিমাণে পণ্য কিনছেন। কেউ কেউ বাড়তি দাম শুনে পণ্য না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন।

সব বেকারিতে বাড়েনি দাম

তবে সমিতির ঘোষিত নতুন দাম দেশের সব বেকারি অনুসরণ করছে না। রাজধানীর মানিকনগরের ভাণ্ডারি বেকারির স্বত্বাধিকারী মো. আকাইদ হোসেন জানিয়েছেন, তারা সমিতির বাড়ানো দাম অনুসরণ করছেন না।

তার দাবি, উৎপাদন খরচ ও পণ্যের মান বিবেচনা করেই তারা আগে নিজেদের দাম নির্ধারণ করেছেন। বাজারের প্যাকেটজাত বিস্কুট, কেক ও রুটির তুলনায় তাদের পণ্যের মান উন্নত হওয়ায় ভালো মানের পণ্যের জন্য তারা নিজেদের হিসাব অনুযায়ী কিছুটা বেশি দাম নেন। তাই সমিতির নতুন মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তারা আর দাম সমন্বয় করেননি।

মুগদা বাজারের আরেক বেকারি ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তারাও সমিতির বর্ধিত দাম অনুসরণ করছেন না। ওই বেকারিতে বিভিন্ন আকার ও ধরনের কেক, বিস্কুট, পাউরুটি ও বাটার বন তৈরি করা হয়। উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে গত জুনেই তাদের পণ্যের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। ফলে সমিতির নতুন সিদ্ধান্তের কারণে তারা আর দাম বাড়াবেন না।

একেক এলাকায় একেক দাম

ফলে একই ধরনের বেকারি পণ্যের ক্ষেত্রেও এলাকাভেদে ভিন্ন দামের চিত্র দেখা যাচ্ছে। কোথাও সমিতির নির্ধারিত নতুন দর কার্যকর হয়েছে, আবার কোথাও আগের দামেই পণ্য বিক্রি হচ্ছে।

এতে একদিকে যেমন ভোক্তাদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে, অন্যদিকে একই পণ্যের ভিন্ন দাম নিয়ে বিভ্রান্তিও তৈরি হচ্ছে।

ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ

ব্যবসায়ীরা উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে দাম বাড়ানোর কথা বললেও এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ ভোক্তার পকেটে। বিশেষ করে ১০০ টাকার পাউরুটি ১২০ টাকা এবং ১০ টাকার বেকারি পণ্য ১৫ টাকা হওয়ায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর নিয়মিত খাদ্য ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে এমনিতেই যখন সংসারের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, তখন পাউরুটি, বিস্কুট ও অন্যান্য বেকারি পণ্যের এই নতুন মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তার জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করেছে।

দামের অঙ্ক ছোট মনে হলেও নিয়মিত কেনাকাটার ক্ষেত্রে এর প্রভাব জমতে থাকে। একটি পরিবার যদি প্রতিদিন বা নিয়মিত পাউরুটি, বিস্কুট কিংবা অন্যান্য বেকারি পণ্য কেনে, তাহলে মাস শেষে বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ দৃশ্যমান হয়ে উঠবে।

বিশেষ করে নিম্ন ও সীমিত আয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে কয়েক টাকা বাড়তি খরচও অন্য কোনো প্রয়োজনীয় পণ্য কম কেনার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

উৎপাদন ব্যয় বনাম ভোক্তার সক্ষমতা

বেকারি শিল্পের জন্য ময়দা, চিনি ও ভোজ্যতেল মৌলিক কাঁচামাল। এসব উপকরণের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে—এটি ব্যবসায়িক বাস্তবতা। এর সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কারখানার পরিচালন ব্যয়ও বাড়তে পারে।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, আগের দামে পণ্য বিক্রি করলে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই দাম সমন্বয় করা ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প কম।

কিন্তু ভোক্তার দিকটি ভিন্ন। আয় বা বেতন একই থাকলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার অর্থ হলো একই পরিমাণ পণ্য কিনতে পরিবারের বাজেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ বের করতে হবে। ফলে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু একটি পণ্যের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পুরো মাসের খাদ্য বাজেটকে প্রভাবিত করতে পারে।

মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব কোথায়?

এই মূল্যবৃদ্ধির তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে তিনটি জায়গায়।

প্রথমত, পারিবারিক খাদ্য বাজেট। নিয়মিত কেনা পণ্যের দাম বাড়লে মাসিক ব্যয় বাড়বে।

দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ব্যবসা। চায়ের দোকান, ছোট খাবারের দোকান কিংবা খুচরা বিক্রেতাদেরও বাড়তি দামের সঙ্গে বিক্রির ভারসাম্য সামলাতে হবে।

তৃতীয়ত, ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা। আয় না বাড়লে একই পরিমাণ খাদ্যপণ্য কিনতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। ফলে পরিবারের অন্য খাতে ব্যয় কমানোর প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে