প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫১ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৩:২১ পিএম
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারেও তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) ২৭ দেশের এই জোটে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও ভিয়েতনাম একই সময়ে ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানি বাড়িয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে ইইউর ব্যবসায়ীরা তৈরি পোশাক আমদানি কমালেও বাংলাদেশ সেই সংকটে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৩.৬৫ শতাংশ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অফিস ইউরোস্ট্যাটের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ ইইউর বাজারে ১ হাজার ৩৭ কোটি ২৮ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে।
গত বছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২০১ কোটি ২১ লাখ ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে ১৬৩ কোটি ৯৩ লাখ ইউরো বা ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
ইইউর বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার হার প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে তুরস্কের রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ৩২ শতাংশ, ভারতের ১২ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ১১ দশমিক ৮১ শতাংশ।
কম্বোডিয়ার রপ্তানি কমেছে ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ। শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে চীন ও ভিয়েতনাম ছাড়া অন্য দেশগুলোরও রপ্তানি কমেছে।
চীন ও ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছে
ইইউর বাজারে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে চীন ১ হাজার ৬৪২ কোটি ১৭ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশটির রপ্তানি বেড়েছে ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
ভিয়েতনাম একই সময়ে ইউরোপে ২৫৫ কোটি ১৮ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। তাদের রপ্তানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ—প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে যা সর্বোচ্চ।
অর্থাৎ ইউরোপীয় ক্রেতারা সামগ্রিকভাবে পোশাক কেনা কমালেও চীন ও ভিয়েতনাম থেকে আমদানি বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে ইইউর বিভিন্ন দেশ চীন, বাংলাদেশ, তুরস্ক, ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন উৎস থেকে মোট ৫ হাজার ১৬১ কোটি ৩৭ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আমদানি কমেছে ৫ দশমিক ১০ শতাংশ।
প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পতন বেশি
ইউরোপের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চীনের পর বাংলাদেশের অবস্থান। তবে রপ্তানি কমার দিক থেকে চলতি বছর বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক।
শীর্ষ ১০ রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে চীন ও ভিয়েতনামের রপ্তানি বাড়লেও তুরস্ক, ভারত, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি কমেছে।
জানুয়ারি-জুলাই সময়ে তুরস্ক ৪৩৮ কোটি ৪৩ লাখ ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ৩২ শতাংশ কম। ভারত রপ্তানি করেছে ২৭৪ কোটি ৩৪ লাখ ইউরোর পোশাক; তাদের রপ্তানি কমেছে ১২ দশমিক ২৪ শতাংশ।
এ ছাড়া পাকিস্তানের রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ৮১ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ১২ দশমিক ১২ শতাংশ এবং মরক্কোর ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ।
পরিমাণেও পিছিয়েছে বাংলাদেশ
মূল্যমানের পাশাপাশি পোশাক রপ্তানির পরিমাণের দিক থেকেও বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে চীন ইইউর বাজারে ৮১ কোটি ৬২ লাখ ৬০ হাজার কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশটির রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ।
অন্যদিকে বাংলাদেশ একই সময়ে ৭৫ কোটি ১৯ লাখ ১০ হাজার কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এই পরিমাণ গত বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ কম।
পোশাকের দামেও বড় ব্যবধান
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য।
চলতি বছরের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে চীন প্রতি কেজি তৈরি পোশাক গড়ে ২০ দশমিক ২০ ইউরো দরে রপ্তানি করেছে। যদিও এই দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ১৮ শতাংশ কম।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য ছিল ১৩ দশমিক ৮০ ইউরো। এই দাম গত বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ কম।
অর্থাৎ চীনের তুলনায় বাংলাদেশের পোশাক কম দামে রপ্তানি হচ্ছে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের গড় রপ্তানি মূল্য কমার হারও বেশি।
তবে তুরস্ক, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার রপ্তানি করা প্রতি কেজি পোশাকের দাম বেড়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে প্রতি কেজির দাম কমেছে ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমার পেছনে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ—দুই ধরনের কারণের কথা বলছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসানের মতে, সামগ্রিক রপ্তানি পরিস্থিতি ভালো নয়। গত অর্থবছরেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। বিশ্ব পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, গ্যাস-বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সমস্যাও শিল্পটির ওপর প্রভাব ফেলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইইউর বাজারে পোশাক রপ্তানি কমার তিনটি কারণও উল্লেখ করেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমত, ইউরোপের ভোক্তা পর্যায়ে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমেছে। দ্বিতীয়ত, চীন ইউরোপের বাজারে আগ্রাসী বিপণনের মাধ্যমে ক্রয়াদেশ বাড়াচ্ছে। তৃতীয়ত, ভারতের সঙ্গে ইইউর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) হওয়ায় কিছু ক্রয়াদেশ ভারতে চলে যাচ্ছে।
ভিয়েতনামের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক
ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পাশাপাশি আরও কয়েকটি এশীয় দেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগী হিসেবে রয়েছে। চীন ও বাংলাদেশের পর তুরস্ক, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া উল্লেখযোগ্য রপ্তানিকারক।
এই দেশগুলোর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। একই সময়ে চীনের রপ্তানি বেড়েছে ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
ফলে ইউরোপীয় ক্রেতাদের মোট পোশাক আমদানি কমলেও চীন ও ভিয়েতনাম সেই বাজারে নিজেদের রপ্তানি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও কমেছে বাংলাদেশের রপ্তানি
ইউরোপের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও চলতি বছর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে।
২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৪৬৫ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের ৪৯৮ কোটি ২৬ লাখ ডলারের তুলনায় এই রপ্তানি কমেছে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (অটেক্সা) গত ৫ সেপ্টেম্বর এ তথ্য প্রকাশ করে। তবে রপ্তানি কমলেও যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকের বাজারে বাংলাদেশ দ্বিতীয় শীর্ষ সরবরাহকারী অবস্থান ধরে রেখেছে।
সামনে কী?
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার হলেও জোট হিসেবে ইউরোপীয় বাজারগুলোর গুরুত্ব আরও বেশি। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ ইউরোপের বাজার থেকে আসে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, ইইউর ব্যবসায়ীরা সামগ্রিকভাবেই কম পোশাক আমদানি করেছেন। তবে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়ে যাওয়াটিই বেশি উদ্বেগের বিষয়।
তিনি আরও জানান, চলতি বছরের জুন ও জুলাইয়ে আগের পাঁচ মাসের তুলনায় ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমার হার কিছুটা কমেছে। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পতন তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
এখন বছরের বাকি সময়ে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কোন দিকে যায়, সেটিই তৈরি পোশাক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।




