প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৭ এএম
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে
ছবি: এআই
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৮:০২ পিএম
আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ২০:০৬ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে আরও ১১টি নতুন বিমান কেনার চুক্তির কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ। নিউইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এ তথ্য জানান। এর আগে গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি বিমান কেনার চুক্তি করেছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ওই চুক্তির মূল্য ধরা হয়েছিল প্রায় ৩৭০ কোটি ডলার বা ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা।
সরকারের পক্ষ থেকে বিমান খাত সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হলেও বোয়িং কেনার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বৃহত্তর বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
বোয়িং কেনা নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য
মাহদী আমিন বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তির যৌক্তিকতা হিসেবে বিমান খাত সম্প্রসারণের কথা বললেও বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের পূর্বের একটি বক্তব্যে ভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
গত ৩১ আগস্ট ময়মনসিংহে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি অনুরোধ ছিল—যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং উড়োজাহাজ ব্যবহার করা। সেই অনুরোধের অংশ হিসেবেই বিমান কেনা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এর ফলে বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তিগুলোকে শুধু বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হবে, নাকি এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিবেচনাও রয়েছে—তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তিও আলোচনায়
বোয়িং চুক্তির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। চুক্তিটি ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড’ নামে পরিচিত।
চুক্তির বাণিজ্যিক শর্তগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য আমদানির বিষয়টি অন্যতম। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশকে আগামী পাঁচ বছর প্রতি বছর অন্তত সাত লাখ টন মার্কিন গম এবং বছরে অন্তত ১২৫ কোটি ডলারের সয়াবিন ও সয়া-পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চুক্তিটির সমালোচকেরা বলছেন, এসব পণ্য আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা তৈরি হলে বাংলাদেশকে তুলনামূলক বেশি দামে পণ্য কিনতে হতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন গমের দাম অন্যান্য আন্তর্জাতিক উৎসের তুলনায় বেশি কি না, সেটিও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
শুল্ক সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন
চুক্তিতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার নিয়ে সমতা আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কহার ১৯ শতাংশ থাকার কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে প্রচলিত এমএফএন শুল্ক যুক্ত হলে কার্যকর গড় শুল্কহার আরও বেশি হতে পারে।
সমালোচকদের মতে, নতুন চুক্তির ফলে দুই দেশের বাণিজ্যে শুল্ক সুবিধার ভারসাম্য বাংলাদেশের অনুকূলে থাকবে না। তবে চুক্তির পক্ষের যুক্তি হলো, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশ এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এলএনজি আমদানির অঙ্গীকার
চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির বিষয়টিও রয়েছে। সম্ভাব্য ১৫ বছরে এ আমদানির মূল্য প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মার্কিন প্রতিষ্ঠান গানভরের সঙ্গে ১৩ বছর মেয়াদি একটি চুক্তির আওতায় মোট ১১৭ কার্গো এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর প্রথম চালান সম্প্রতি বাংলাদেশে পৌঁছেছে।
দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য সরবরাহকারীর তুলনায় মূল্য ও সরবরাহের শর্ত কতটা প্রতিযোগিতামূলক—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা।
তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়েও শর্ত
বাণিজ্য চুক্তিতে বাংলাদেশের তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও কিছু কৌশলগত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও শর্ত রয়েছে বলে সমালোচকেরা উল্লেখ করেছেন।
বিশেষ করে পারমাণবিক চুল্লি বা জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে—এমন উৎস থেকে কেনাকাটার বিষয়ে বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে। চীন ও রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশকে ঘিরে বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
চুক্তির শর্ত ভঙ্গ হলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করে আগের উচ্চ শুল্ক পুনর্বহাল করতে পারে—এমন বিধান থাকার বিষয়টিও সমালোচনায় এসেছে।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্বেগ
চুক্তির বিভিন্ন শর্ত নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও নীতিবিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) চুক্তিটি দ্রুত পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।
অর্থনীতিবিদ ও অধিকারকর্মীদের একটি অংশ চুক্তির কিছু শর্তকে বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন এবং চুক্তি পুনর্বিবেচনা বা বাতিলের দাবি তুলেছেন।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর প্রয়োজন বাংলাদেশে রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বাস্তবতায় এসব পণ্য কোনো না কোনো উৎস থেকে আমদানি করতেই হবে।
ফলে বোয়িংয়ের নতুন বিমান কেনার চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য ও এলএনজি আমদানির প্রতিশ্রুতি এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির শর্ত—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে দেশে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।





