প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৮ এএম
বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। সব পরীক্ষা সফল হলে ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ
পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ একটি নিরাপত্তা পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হয়েছে। বাকি পরীক্ষাগুলোও পরিকল্পনা অনুযায়ী শেষ হলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে।
তবে এই পর্যায়ে পৌঁছাতে প্রকল্পটিকে একাধিক কারিগরি ও সরবরাহসংক্রান্ত জটিলতা পার হতে হয়েছে। নিরাপত্তা ভালভে ত্রুটি ধরা পড়ায় প্রথম ইউনিট চালুর সময়সূচি পিছিয়ে যায়। একই সময়ে দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনেও আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল।
নিরাপত্তা ভালভের ত্রুটিতে পিছিয়েছিল সূচি
রূপপুরের প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিভাজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপাদন সেপ্টেম্বরে শুরু করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু প্রেসার অপারেটেড রিলিফ ভালভ বা নিরাপত্তা ভালভ ব্যবস্থার পরীক্ষায় কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ায় সেই পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়।
ত্রুটি সংশোধনের পর ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথম ইউনিটে ১৬ মেগাপ্যাসকেল চাপে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।
এই ব্যবস্থার কাজ হলো চুল্লির প্রাথমিক কুলিং সার্কিটে চাপ নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখা। কোনো কারণে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে ভালভ সক্রিয় হয়ে চাপ কমিয়ে নিরাপদ অবস্থায় নিয়ে আসে।
পরীক্ষার সময় মূল নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে ভালভের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হয়। ভালভ কত দ্রুত খুলছে ও বন্ধ হচ্ছে, সতর্কসংকেত ঠিকমতো কাজ করছে কি না এবং প্রয়োজনীয় চাপ ও তাপমাত্রার তথ্য সঠিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হয়েছে।
পরীক্ষা শুরুর আগে অগ্নিনিরাপত্তা ও তেজস্ক্রিয়তা-সংক্রান্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাও পরীক্ষা করা হয়।
এবার ১৮ মেগাপ্যাসকেলের পরীক্ষা
১৬ মেগাপ্যাসকেল পরীক্ষা সফল হলেও আরও উচ্চ চাপে নিরাপত্তাব্যবস্থার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে ১৮ মেগাপ্যাসকেলে আরেকটি পরীক্ষা হওয়ার কথা রয়েছে।
পারমাণবিক চুল্লির স্বাভাবিক পরিচালন চাপ প্রায় ১৬ মেগাপ্যাসকেল। ফলে এই পর্যায়ের পরীক্ষা সফল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্বাভাবিক সীমার চেয়ে বেশি চাপ তৈরি হলেও নিরাপত্তাব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করে কি না, সেটি নিশ্চিত করতেই আরও উচ্চচাপের পরীক্ষা প্রয়োজন।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রথম ইউনিটকে ‘ক্রিটিক্যালিটি’ বা নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর পর্যায়ে নেওয়ার আগে আরও কয়েকটি বড় পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে।
জ্বালানি পরিবহনেও তৈরি হয়েছিল জটিলতা
এর আগে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। কিন্তু জ্বালানিবাহী উড়োজাহাজের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না মেলায় নির্ধারিত সময়ে চালানটি আসেনি।
পরে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক সমস্যার পরিবর্তে কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এরপর নতুন করে জ্বালানি পরিবহনের সূচি নির্ধারণ করা হয়।
রাশিয়ার পক্ষ থেকেও জানানো হয়, দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথম ইউনিটের অতিরিক্ত জ্বালানি পৌঁছেছে
রূপপুরের প্রথম ইউনিটের মূল পারমাণবিক জ্বালানি ২০২৩ সালেই দেশে আসে। চলতি বছরের মে মাসে সেই জ্বালানি চুল্লিপাত্রে প্রবেশ করানোর কাজ শেষ হয়।
এর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রয়োজনে অতিরিক্ত জ্বালানি মজুত রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ২ অক্টোবর রাতে প্রথম ইউনিটের জন্য অতিরিক্ত জ্বালানির একটি চালান ঢাকায় পৌঁছায়। পরদিন ৩ অক্টোবর বিশেষ নিরাপত্তায় সেটি সড়কপথে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রয়োজনের মুহূর্তে সাধারণ জ্বালানির মতো দ্রুত নতুন জ্বালানি সংগ্রহ করা যায় না। তাই কোনো ফুয়েল অ্যাসেম্বলি পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে যাতে কার্যক্রম ব্যাহত না হয়, সে জন্য অতিরিক্ত জ্বালানি আগেই সংরক্ষণ করা হয়।
আসছে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি
দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় পারমাণবিক জ্বালানিও প্রস্তুত রয়েছে। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিটের প্রথম চালান ৮ অক্টোবর দেশে পৌঁছাতে পারে।
সব মিলিয়ে এ দফায় প্রথম ইউনিটের অতিরিক্ত জ্বালানি এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি নিয়ে মোট নয়টি চালান আসার কথা রয়েছে। ডিসেম্বরের আগেই দ্বিতীয় ইউনিটের প্রয়োজনীয় জ্বালানি রূপপুরে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
গ্রিডে বিদ্যুৎ আসবে যেভাবে
চূড়ান্ত নিরাপত্তা ও কারিগরি পরীক্ষাগুলো সফলভাবে শেষ হলে প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিভাজন বিক্রিয়া শুরু করা হবে। এতে তৈরি হবে তাপশক্তি।
সেই তাপ ব্যবহার করে পানি থেকে বাষ্প তৈরি হবে। বাষ্পের চাপ দিয়ে টারবাইন ঘুরবে এবং টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটর থেকে উৎপাদিত হবে বিদ্যুৎ।
চুল্লির শক্তি উৎপাদন প্রথমে খুব কম মাত্রায় শুরু হবে। পরে ধাপে ধাপে তা বাড়ানো হবে। শক্তি উৎপাদনের মাত্রা প্রয়োজনীয় পর্যায়ে পৌঁছালে কেন্দ্রটিকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর বিভিন্ন ক্ষমতায় ইউনিট চালিয়ে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং যন্ত্রপাতির কর্মক্ষমতা পরীক্ষা করা হবে।
৭–৮ মাস চলতে পারে পরীক্ষামূলক উৎপাদন
গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়া শুরু করলেই প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়ে যাবে—বিষয়টি এমন নয়। এরপরও দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন মাত্রায় ইউনিটটি পরীক্ষা করা হবে।
প্রকল্প কর্মকর্তাদের হিসাবে, পরীক্ষামূলক উৎপাদনের এই পর্যায় ৭ থেকে ৮ মাস পর্যন্ত চলতে পারে। প্রতিটি ধাপে চুল্লি, টারবাইন, জেনারেটর, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কর্মক্ষমতা যাচাই করা হবে।
রূপপুর থেকে প্রথমবার জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হবে।
দুই ইউনিটে সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট
রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট নির্মাণ করা হচ্ছে। দুই ইউনিটের সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট প্রকল্পটির মূল নির্মাণকাজ করছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে এবং ভবিষ্যতে পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড।
প্রকল্পটির মেয়াদ দুই দফায় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। মোট প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো প্রথম ইউনিটের বাকি নিরাপত্তা ও কমিশনিং পরীক্ষা সফলভাবে শেষ করা। সেগুলো পরিকল্পনামতো এগোলে ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে প্রথমবারের মতো রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


