প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫১ এএম
১৪ দিনেই ব্যবসা শুরু, আসছে ইউনিক বিজনেস আইডি
দেশে ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করতে উদ্যোক্তাদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ‘ইউনিক বিজনেস আইডি’ চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬। ১২:৩৩ পিএম
আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬। ১৫:৪৭ পিএম
দেশে ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করতে উদ্যোক্তাদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ‘ইউনিক বিজনেস আইডি’ চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। এই আইডির মাধ্যমে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকেই বিভিন্ন লাইসেন্স, ছাড়পত্র ও অনুমোদনের আবেদন করা যাবে। পুরো প্রক্রিয়ার সময় ৩৫৫ দিন থেকে কমিয়ে ১৪ দিনে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সংস্কার উদ্যোগটি নিয়ে যৌথভাবে কাজ করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইনভেস্ট বাংলাদেশ। ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সেবার একক প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাবিজ’ এর আওতায় ১৪ দিনের একটি ‘বিজনেস রেডিনেস প্যাকেজ’ তৈরির কাজ চলছে।
বর্তমানে একটি কোম্পানি নিবন্ধনের পর ব্যবসা শুরু করতে উদ্যোক্তাদের ট্রেড লাইসেন্স, করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন, ব্যাংক হিসাব, অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র, পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ বিভিন্ন অনুমোদন নিতে হয়। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী আরও একাধিক শর্তও পূরণ করতে হয়।
এসব অনুমোদনের মধ্যে অনেকগুলো আবার আমদানি নিবন্ধন সনদ বা আইআরসি পাওয়ার পূর্বশর্ত। ফলে যন্ত্রপাতি বা কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খুলতেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, কোম্পানি নিবন্ধন থেকে এলসি খোলার পর্যায় পর্যন্ত কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৮০ থেকে ৩৫৫ দিন সময় লাগে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য নাহিয়ান রহমান রচি জানিয়েছেন, একটি অনুমোদনের সঙ্গে আরেকটি অনুমোদনের নির্ভরতা থাকায় পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় সব কমপ্লায়েন্স তুলে দেওয়া হবে না; বরং এলসি খোলার আগে বাধ্যতামূলক কিছু পূর্বশর্ত কমানো হবে। কিছু কমপ্লায়েন্স ব্যবসা শুরুর পর সম্পন্ন করার সুযোগ রাখা হতে পারে এবং একাধিক প্রক্রিয়া একই সময়ে চালানো হবে।
নতুন ব্যবস্থায় কোম্পানি নিবন্ধনের আবেদন করার সময়ই উদ্যোক্তার জন্য একটি ইউনিক বিজনেস আইডি তৈরি হবে। ওই আইডি ব্যবহার করে একটি প্ল্যাটফর্ম থেকেই সংশ্লিষ্ট সরকারি সেবাগুলোর জন্য আবেদন করা যাবে।
একই কাগজপত্র কোম্পানি নিবন্ধন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর বা অন্য কোনো সংস্থায় বারবার জমা দেওয়ার প্রয়োজনও কমবে। একবার জমা দেওয়া তথ্য বিজনেস আইডির সঙ্গে সংরক্ষিত থাকবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা তা ব্যবহার করতে পারবে।
এই আইডির মাধ্যমে একজন উদ্যোক্তার ব্যবসা শুরুর পুরো প্রক্রিয়ার একটি ডিজিটাল রেকর্ডও তৈরি হবে। কোন অনুমোদন পাওয়া গেছে, কোনটি এখনো বাকি এবং কোনো আবেদন কোন পর্যায়ে আটকে আছে; একটি ড্যাশবোর্ড থেকেই তা দেখা যাবে।
কমপ্লায়েন্স থাকবে, বদলাবে প্রক্রিয়া
সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনটি মূলনীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। কমপ্লায়েন্স বা আইনি বাধ্যবাধকতা বাদ না দেওয়া, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা এবং ব্যবসা শুরুর আগে প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত যৌক্তিকভাবে কমিয়ে কিছু শর্ত পরবর্তী পর্যায়ে নেওয়া; এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কোনো উদ্যোক্তা প্রাথমিক অনুমোদনের ভিত্তিতে ব্যবসা শুরুর পর নির্ধারিত সময়ে পরবর্তী কমপ্লায়েন্স সম্পন্ন না করলে ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাও তা জানতে পারবে। প্রয়োজন হলে পরিদর্শন বা যৌথ পরিদর্শনের মাধ্যমে নিয়ম মানা নিশ্চিত করা হবে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ব্যবসা শুরু করার প্রয়োজনীয় ধাপ এবং কোন পর্যায়ে কী পরিবর্তন দরকার, তার ম্যাপিং শেষ করেছে। কিছু ক্ষেত্রে বিধিমালা সংশোধনের কাজও শুরু হয়েছে।
একই সঙ্গে কোম্পানি নিবন্ধনের পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে নেওয়া, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা এবং বিভিন্ন লাইসেন্স পাওয়ার ধাপ সহজ করার কাজ চলছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরাও ১৪ দিনে ব্যবসা শুরুর উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে তাদের মতে, পরিকল্পনাটি কেবল নীতিমালায় সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না; ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর করাও জরুরি।
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খানের মতে, অন্য অনেক দেশে কোম্পানি নিবন্ধন থেকে ব্যবসা পরিচালনার বিভিন্ন ধাপ একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থা দরকার, যেখানে উদ্যোক্তা নিজের আবেদনের অগ্রগতি ও পরবর্তী ধাপ অনলাইনে দেখতে পারবেন।
তার মতে, সার্ভার ধীর হয়ে যাওয়া বা বারবার সেবা বন্ধ থাকার মতো সমস্যা থাকলে ডিজিটাল সংস্কারের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।
ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থাও নতুন করে পর্যালোচনার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, বিভিন্ন কাজে আলাদা আলাদা নম্বর ও লাইসেন্স ব্যবহারের পরিবর্তে একটি একক বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর দিয়েই অনলাইন ব্যবসা, আমদানি-রপ্তানি, ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য আর্থিক সেবা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
২০২১ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশের সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে একটি ইউনিক বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন ব্যবস্থায় আনার সুপারিশ করেছিল। তবে সে সময় উদ্যোগটি আর এগোয়নি। পরে ২০২২ সালে ই-কমার্স ব্যবসার জন্য ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা ডিবিআইডি চালু করা হয়।
ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের মতে, কয়েক দশক আগে চালু হওয়া অনেক লাইসেন্স ও অনুমোদন বর্তমান ডিজিটাল অর্থনীতিতে এখনো প্রয়োজনীয় কি না, তা পর্যালোচনা করা দরকার। বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে যেসব অনুমোদন ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি জটিলতা তৈরি করছে, সেগুলো চিহ্নিত করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানিয়েছে, ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সংস্কারের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের পর খাতভিত্তিক লাইসেন্সিং ব্যবস্থাও সহজ করার কাজ শুরু হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি ইতোমধ্যে কয়েকটি অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করেছে।
কর্মকর্তাদের লক্ষ্য, আগামী এক মাসের মধ্যে সংস্কারের কিছু প্রাথমিক ফল দৃশ্যমান করা। ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যে বড় একটি অংশ বাস্তবায়ন এবং প্রায় এক বছরের মধ্যে পুরো ব্যবস্থাকে কার্যকর রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
