প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
রুশ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিরোধে বিপর্যস্ত দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬। ০১:১৬ পিএম
- শেয়ার
- Messenger
- Telegram
- Threads
ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় বড় ধরনের অচলাবস্থার প্রতীকী চিত্র। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ
নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা একটি রুশ প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিরোধের জেরে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোয় বড় ধরনের বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। রোববার রাত থেকে লাখ লাখ ব্যবহারকারীর কার্ড ম্যানেজমেন্ট ও আন্তঃব্যাংক লেনদেনের বিভিন্ন সেবা বন্ধ হয়ে গেছে।
সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী স্থানীয় পেমেন্ট প্রসেসর ইনফরমেশন টেকনোলজি কনসালট্যান্টস লিমিটেড বা আইটিসিএল এবং রুশ প্রতিষ্ঠান কম্পাস প্লাসের মধ্যে সফটওয়্যার মাইগ্রেশন নিয়ে বিরোধ।
আইটিসিএলের দাবি, তাদের বিদ্যমান প্ল্যাটফর্ম বাদ দিয়ে ব্রাসেলসভিত্তিক ওপেনওয়ের ‘ওয়ে৪’ এন্টারপ্রাইজ পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পর কম্পাস প্লাস তাদের সার্ভারে ক্ষতিকর একটি স্ক্রিপ্ট বসিয়ে দেয়।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, ওই স্ক্রিপ্ট প্রতি আট ঘণ্টা পরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সার্ভার রিস্টার্ট করে। এতে রাউটিং টেবিল মুছে গিয়ে নেটওয়ার্কজুড়ে ডেটা প্রক্রিয়াকরণ ব্যাহত হয়। তবে কম্পাস প্লাসের পক্ষ থেকে এই অভিযোগের বিষয়ে কোনো বক্তব্য এখানে পাওয়া যায়নি।
আইটিসিএল জানিয়েছে, সমস্যা শনাক্তের পর অংশীদার ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। গ্রাহকদের তথ্য নিরাপদ রয়েছে বলেও দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এই বিরোধের সূত্রপাত আরও আগে। গত আগস্টে আইটিসিএল ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে কম্পাস প্লাসের প্ল্যাটফর্ম পর্যায়ক্রমে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। এরপর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, কম্পাস প্লাস কারিগরি সহায়তা বন্ধের হুমকি দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ১৫ লাখ ডলার মাইগ্রেশন ফি দাবি করে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সমর্থনযুক্ত আগাম পেমেন্ট গ্যারান্টিও চেয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।
হস্তক্ষেপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক
ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার অচলাবস্থা কাটাতে সোমবার আইটিসিএল ও সংশ্লিষ্ট ভেন্ডরকে নিয়ে আলোচনায় বসে বাংলাদেশ ব্যাংক।
তবে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ পেমেন্ট সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, এটি কারিগরি সমস্যা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারায় কার্ডধারীদের বড় ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
হঠাৎ সেবা বন্ধের ঘটনায় সদস্য ব্যাংকগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার কথাও জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণের আগে গ্রাহকদের পর্যাপ্ত সময় দিয়ে জাতীয় গণমাধ্যম, টেলিভিশন ও সরাসরি এসএমএসের মাধ্যমে জানানো বাধ্যতামূলক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আইটিসিএলের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ মূলত অক্টোবরের শেষদিকে করার কথা ছিল। কিন্তু রোববার সন্ধ্যায় আইটিসিএল জরুরি ভিত্তিতে সিস্টেম অফলাইনে নেওয়ার কথা জানায়।
আইটিসিএলের যুক্তি ছিল, জরুরি পরিস্থিতি তাদের এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এত গুরুত্বপূর্ণ পেমেন্ট অবকাঠামো পূর্বঘোষণা ছাড়া বন্ধ করে দেওয়া নিয়ন্ত্রক কাঠামোর পরিপন্থী।
৩৩ ব্যাংকের সেবায় প্রভাব
আইটিসিএল দেশের ৩৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে পেমেন্ট প্রসেসিং ও গেটওয়ে অবকাঠামো সরবরাহ করে।
প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ, এটিএম, পয়েন্ট অব সেল টার্মিনাল, ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং ফান্ড ট্রান্সফারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা পরিচালিত হয়।
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশের ব্যাংকিং কার্ড লেনদেনের প্রায় ৭০ শতাংশ আইটিসিএলের অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেওয়া বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রোববার রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কিন্তু হঠাৎ সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে বিপাকে পড়েন লাখ লাখ গ্রাহক। দোকান, রেস্তোরাঁ ও এটিএম বুথে কার্ড ব্যবহার করতে না পারার পাশাপাশি অনেকে মোবাইল অ্যাপ থেকে সাধারণ লেনদেন কিংবা অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্সও দেখতে পারেননি।
সদস্য ব্যাংকগুলোও এ পরিস্থিতিতে অসন্তোষ জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, সেবা বন্ধের বিষয়ে আগাম যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়নি, ফলে গ্রাহকদের আগে থেকে জানানো সম্ভব হয়নি।
ট্রাস্ট ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তাদের ডেবিট কার্ড আন্তর্জাতিক ভিসা ও দেশীয় এনপিএসবি নেটওয়ার্কে সচল থাকলেও ক্রেডিট কার্ড, প্রিপেইড কার্ড এবং কিউ-ক্যাশ এটিএম সেবা অচল হয়ে পড়ে।
এই ঘটনার মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোয় একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তি সরবরাহকারী ও প্রসেসরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অবকাঠামোয় সাইবার নিরাপত্তা, ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতা এবং বিকল্প প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।






