প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৮ এএম
কী ঘটছে খাইবার পাখতুনখোয়ায়, কেন ক্ষমতা নিল কেন্দ্র
২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের পেশোয়ারে রেড জোনে যাওয়ার একটি সড়কে পাহারা দিচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। ছবি: রয়টার্স
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬। ০৫:১২ পিএম
আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২৬। ১৭:২৬ পিএম
কয়েকদিন ধরেই উত্তপ্ত পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে রবিবার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অজুহাতে প্রদেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করেছে দেশটির সরকার। আর এর ফলে কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দলের নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের কার্যত অবসান ঘটেছে।
জরুরি অবস্থা জারি হলে নিরাপত্তা সংকট বা সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থায় ভাঙন দেখা দিলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার কোনো প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী ও আইন প্রণয়ন ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিতে পারে।
প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি সংবিধানের ২৩২(১) ও ২৩৪(১) অনুচ্ছেদের অধীনে এ সংক্রান্ত ঘোষণা জারি করেছেন। প্রেসিডেন্টের ঘোষণায় বলা হয়েছে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশটিতে সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে যাওয়া এবং সাংবিধানিক প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ঘোষণা অনুযায়ী; মুখ্যমন্ত্রী, প্রাদেশিক মন্ত্রী, উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী ও অ্যাডভোকেট জেনারেলকে অবিলম্বে পদ ছাড়তে হবে।
এমন এক সময়ে এই সিদ্ধান্ত এলো, যখন খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল চলছে। তার দাবি, ইমরান খানকে মুক্তি ও তাকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।
৪ অক্টোবর লাক্কি মারওয়াত থেকে এই মিছিল শুরু হয় এবং এরই মধ্যে প্রদেশের কয়েকটি জেলা অতিক্রম করেছে। ১০ অক্টোবর আফ্রিদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন এবং প্রদেশের সমস্যার সমাধান হিসেবে সামরিক অভিযান প্রত্যাখ্যান করেন।
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআই প্রথমে মিছিলটি ইসলামাবাদে নিয়ে গিয়ে অবস্থান কর্মসূচির পরিকল্পনা করেছিল। তবে কেন্দ্রীয় সরকার জানায়, বিক্ষোভকারীদের রাজধানীতে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
রোববার প্রেসিডেন্টের ঘোষণায় বলা হয়েছে, সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রদেশে গুরুতর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
ঘোষণায় বলা হয়, “সন্ত্রাসী ঘটনার অস্বাভাবিক তীব্রতা সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে।”
সেখানে সরকারি স্থাপনা, অবকাঠামো এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা বৃদ্ধির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, সন্ত্রাস দমনে প্রয়োজনীয় দৃঢ়তা দেখাতে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।
ঘোষণায় আরও বলা হয়েছে, খাইবার পাখতুনখোয়ার গভর্নরের দেওয়া একটি প্রতিবেদনে সাংবিধানিক প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়া এবং সংবিধান অনুযায়ী প্রাদেশিক সরকারের কাজ চালিয়ে যেতে না পারার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
জরুরি অবস্থার ঘোষণার অধীনে কেন্দ্রীয় সরকার প্রাদেশিক গভর্নরকে প্রাদেশিক সরকারের সব অথবা কিছু দায়িত্ব গ্রহণের নির্দেশ দিতে পারবে।
কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী গভর্নর প্রাদেশিক পরিষদসহ অন্যান্য প্রাদেশিক প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের ক্ষমতাও প্রয়োগ করতে পারবেন।
ঘোষণা অনুযায়ী, খাইবার পাখতুনখোয়া প্রাদেশিক পরিষদের ক্ষমতা এখন পাকিস্তানের পার্লামেন্ট বা পার্লামেন্টের কর্তৃত্বে প্রয়োগ করা হবে।
ঘোষণাটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে।
এর আগে রোববার প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে খাইবার পাখতুনখোয়ার ক্রমাবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা জরুরি অবস্থা জারির প্রস্তাব অনুমোদন করে।
মন্ত্রিসভার বক্তব্য, প্রাদেশিক সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রীকে প্রেসিডেন্টের কাছে জরুরি অবস্থা জারির পরামর্শ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
এক সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, “পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় মন্ত্রিসভা সুপারিশ করেছে যে প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানের সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদের অধীনে প্রেসিডেন্টকে তার সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা জারির পরামর্শ দিন।”
সূত্রগুলো বলেছে, অন্য বিকল্পগুলো বিবেচনা করার পর মন্ত্রিসভা এই পথে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয়।
এর মধ্যে শেষ মুহূর্তে প্রাদেশিক সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা হিসেবে জমিয়ত উলেমা-ই-ইসলাম-ফজলের বা জেইউআই-এফ প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্ত করার উদ্যোগও ছিল। তবে ওই চেষ্টা কোনো অগ্রগতি আনতে পারেনি বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
আগে শাহবাজ শরিফ মন্ত্রিসভাকে বলেন, খাইবার পাখতুনখোয়া সরকার সন্ত্রাস মোকাবিলায় যথেষ্ট কিছু করছে না এবং এখন সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।
তিনি বলেন, “কেপি সরকার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলছে না... এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে, কারণ আমরা ‘এখন নয়তো কখনোই নয়’ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি।”
শরিফ বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে এবং ইমরান খানের দলের নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার এই হুমকি মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গত ১০ বছরে সন্ত্রাস মোকাবিলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত করতে কেন্দ্রীয় সরকার প্রদেশটিকে অন্তত ৮০০ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি দিয়েছে, কিন্তু তারপরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
পিটিআইয়ের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে; ইমরান খানের সঙ্গে অবিলম্বে সাক্ষাতের সুযোগ, তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের প্রবেশাধিকার, বিক্ষোভের আগে আটক তার বোনদের ও সমর্থকদের মুক্তি, তার স্ত্রী বুশরা বিবির যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং তাদের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর শুনানি হস্তক্ষেপ ছাড়া পরিচালনা করা।
৭৩ বছর বয়সী সাবেক ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিক হওয়া ইমরান খান ২০২৩ সাল থেকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দী রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সহিংসতায় উসকানির অভিযোগসহ ১০০টির বেশি মামলা রয়েছে।
ইমরান খানের দল ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে দুই দফা আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এই লং মার্চ শুরু হয়। বিক্ষোভ প্রত্যাহারের আগে ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়ার দাবিতে অনড় ছিল পিটিআই। অন্যদিকে সরকার বলেছিল, আগে বিক্ষোভ শেষ করতে হবে। এই বিরোধের কারণেই আলোচনা ভেস্তে যায়।
কেন্দ্রীয় সরকার আগেই সতর্ক করেছিল, বিক্ষোভকারীদের ইসলামাবাদে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার এবং সম্ভাব্য মিছিলের পথের সড়কগুলো শিপিং কনটেইনার দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়।



