প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৮ এএম
পাকিস্তানে জরুরি অবস্থা নতুন নয়, ইতিহাস কী বলে
পাকিস্তানে একাধিকবার দেশজুড়েও জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে সামরিক আইনও রয়েছে। ছবি: ডন
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬। ০৭:১৭ পিএম
আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬। ১৯:৩২ পিএম
কেন্দ্রিয় মন্ত্রিসভার সুপারিশ প্রেসিডেন্ট অনুমোদন করার পর রোববার খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসন জারি করেছে পাকিস্তানের সরকার।
প্রেসিডেন্ট হাউস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদের অধীনে এই ব্যবস্থা অনুমোদন করা হয়েছে। এই দুই অনুচ্ছেদ যথাক্রমে জরুরি অবস্থা ঘোষণা ও গভর্নর শাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সংবিধানের ২৩২ অনুচ্ছেদে “যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে জরুরি অবস্থা ঘোষণা” করার বিধান রয়েছে। আর ২৩৪ অনুচ্ছেদ, যা সাধারণত “গভর্নর শাসন” নামে পরিচিত, কোনো প্রদেশে “সাংবিধানিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা” ঘটলে কেন্দ্রীয় সরকারকে সেই প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষমতা দেয়।
কোনো প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি করা বা সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য কেন্দ্র তার ক্ষমতা ব্যবহার করছে; এটি পাকিস্তানে প্রথম নয়।
জানুয়ারি ১৯৪৯ থেকে এপ্রিল ১৯৫১; পাঞ্জাব
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই প্রথম গভর্নর শাসন জারি করা হয় দেশটির রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পাঞ্জাব প্রদেশে।
১৯৪৯ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান লাহোর সফর করেন। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী নবাব মামদোত তাকে জানান, প্রাদেশিক পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থা তিনি অর্জন করেছেন। মামদোত ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মুমতাজ দৌলতানার মধ্যে বিরোধের পর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
তবে মামদোত যে নথি দেখিয়েছিলেন, তাতে তথ্যগত অসঙ্গতি দেখতে পান লিয়াকত আলী খান। এরপর তিনি মামদোত সরকারকে বরখাস্ত করেন, প্রাদেশিক পরিষদ ভেঙে দিয়ে পাঞ্জাবে গভর্নর শাসন জারি করেন।
ডিসেম্বর ১৯৫১ থেকে মে ১৯৫৩; সিন্ধু
মুখ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ আইয়ুব খুহরোকে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগে বরখাস্ত করার পর সিন্ধুতে এক বছর ১৪৪ দিন গভর্নর শাসন জারি ছিল। গভর্নর শাসনের অধীনে মিয়া আমিনুদ্দিন সরাসরি প্রদেশের প্রশাসন পরিচালনা করেন।
১৯৫৩ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের পর গভর্নর শাসনের অবসান হয় এবং পাকিস্তান মুসলিম লীগের পীরজাদা আবদুস সাত্তার দায়িত্ব নেন।
ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল ১৯৭৩; বেলুচিস্তান
১৯৭৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো মুখ্যমন্ত্রী সরদার আতাউল্লাহ মেঙ্গলের নেতৃত্বাধীন বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার বরখাস্ত করেন। একই সঙ্গে গভর্নর মীর গাউস বখশ বিজেঞ্জোকেও সরিয়ে দেওয়া হয়।
এর কারণ হিসেবে প্রদেশে অস্থিরতায় কথিত সম্পৃক্ততা এবং ইসলামাবাদে ইরাকি দূতাবাসে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছিল। পরদিন নবাব আকবর খান বুগতিকে বেলুচিস্তানের নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয় এবং সরাসরি কেন্দ্রীয় বা গভর্নর শাসন কার্যকর করা হয়।
পরে কেন্দ্রীয় সরকার জেনারেল টিক্কা খানের অধীনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী মোতায়েন করে। পার্বত্য ও আদিবাসী অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। বিশেষ করে লাসবেলা ও মারি এলাকার মতো জায়গায় অভিযান চালানো হয়।
একই বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে গভর্নর শাসনের অবসান ঘটে। এরপর জাম গোলাম কাদির খান নতুন প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা গঠন করেন।
ফেব্রুয়ারি-মে ১৯৭৫; খাইবার পাখতুনখোয়া
তৎকালীন নর্থ-ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স বা এনডব্লিউএফপি নামে পরিচিত খাইবার পাখতুনখোয়ায় ১৯৭৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ মে পর্যন্ত মোট ৭৬ দিন গভর্নর শাসন জারি ছিল। ১৯৭৩ সালে সংবিধানের ২৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে জরুরি পরিস্থিতির কারণে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
কর্মকর্তারা তখন এর পেছনে স্থানীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বহিরাগত অস্থিরতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার সে সময় গভর্নরকে প্রাদেশিক সরকারের সব ক্ষমতা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। এর ফলে মুখ্যমন্ত্রী সরদার ইনায়েতুল্লাহ খান গন্ডাপুরের মন্ত্রিসভার অবসান ঘটে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ গাওয়াসের তত্ত্বাবধানে প্রদেশ পরিচালিত হয়। ১৯৭৫ সালের ৩ মে সরাসরি শাসনের অবসান হলে নাসরুল্লাহ খান খট্টক মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।
জুন-আগস্ট ১৯৮৮; সিন্ধু
সিন্ধুর ইতিহাসে দ্বিতীয়বার গভর্নর শাসন জারি ছিল ৬৮ দিন। ১৯৮৮ সালের ২৪ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এটি বহাল ছিল।
ইসলামি জামহুরি ইত্তেহাদের মুখ্যমন্ত্রী আখতার আলী গোলাম কাজীর তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বরখাস্ত করা হয়। তার জায়গায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চার তারকা জেনারেল রহিমউদ্দিন খানকে গভর্নর করা হয়। এর অল্প সময় আগেই ১৯৮৮ সালের ২৯ মে প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ খান জুনেজোর কেন্দ্রীয় সরকার এবং সব প্রাদেশিক পরিষদ ভেঙে দিয়েছিলেন।
ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল ১৯৯৪; খাইবার পাখতুনখোয়া
পাকিস্তানের অন্যতম বিতর্কিত রাজনৈতিক অধ্যায়ের একটি ছিল ১৯৯৪ সালে খাইবার পাখতুনখোয়ায় গভর্নর শাসন জারি। ১৯৯৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত এই শাসন বহাল ছিল।
প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো সাবির শাহের নেতৃত্বাধীন পিএমএল-এন প্রাদেশিক সরকার স্থগিত করার পর এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নির্বাহী ক্ষমতা সাময়িকভাবে সরাসরি প্রাদেশিক গভর্নর মেজর জেনারেল (অব.) খুরশিদ আলী খানের হাতে চলে যায়।
গভর্নর শাসন প্রত্যাহারের পর পিপিপির আফতাব আহমদ খান শেরপাও নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
ফেব্রুয়ারি-মার্চ ২০০৯; পাঞ্জাব
২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি পাঞ্জাবে দুই মাসের জন্য গভর্নর শাসন জারি করেন। সুপ্রিম কোর্ট নওয়াজ শরিফ ও শাহবাজ শরিফকে অযোগ্য ঘোষণা করার পর পিএমএল-এন সরকারকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
জারদারি সালমান তাসিরকে পাঞ্জাবের গভর্নর নিয়োগ দেন। প্রাদেশিক পরিষদ স্থগিত করা হয়নি, তবে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া হয়। তবে এক মাস পরই গভর্নর শাসন প্রত্যাহার করা হয়।
জানুয়ারি-মার্চ ২০১৩; বেলুচিস্তান
দেশজুড়ে বিক্ষোভের মুখে পিপিপির প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফ বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার বরখাস্ত করেন। কোয়েটার আলমদার রোডে হাজার হাজার হাজারা শিয়া প্রচণ্ড শীতের মধ্যে তিন দিন ধরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করার পর তিনি এই ঘোষণা দেন। তাদের পাশে রাখা ছিল জোড়া বোমা হামলায় নিহত বহু মানুষের মরদেহ।
ওই হামলায় ৯০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রী নবাব আসলাম রাইসানির নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারকে বরখাস্ত করা হয়। এরপর গভর্নর নবাব জুলফিকার আলী মাগসি প্রদেশের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নেন।
দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা
পাকিস্তানে একাধিকবার দেশজুড়েও জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে সামরিক আইনও রয়েছে। দেশ প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক বছর পর, ১৯৫৪ সালেই প্রথম এমন পরিস্থিতি দেখা যায়।
দেশটির ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ধরে জাতীয় সংসদ অকার্যকর বা বিলুপ্ত থাকার দুটি বড় অধ্যায় ছিল সামরিক শাসনের সময়। একটি ছিল জেনারেল জিয়াউল হকের অধীনে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত। অন্যটি ছিল জেনারেল পারভেজ মোশাররফের অধীনে ১৯৯৯ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত।



