প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১১ এএম
এআইয়ের অগ্রগতি নিয়ে যখন গবেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ ও গতি কমাতে হস্তক্ষেপের কথা বলছেন, তখন ঐকমত্য এক্সএআই প্রধান ইলন মাস্ক, ওপেনএআই সিইও স্যাম অল্টম্যান ও অ্যানথ্রপিক সিইও দারিও আমোদেই। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০১:৫৭ পিএম
আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ১৫:০৬ পিএম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই শিল্প এখন এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এক দিকে বিনিয়োগকারীদের চোখে ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন। অন্য দিকে খোদ নির্মাতাদের মনে গভীর উদ্বেগ।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের মধ্যকার নির্মম বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতাই আজকের এই নিরাপত্তা সংকটের জন্ম দিয়েছে। এই দুই প্রতিষ্ঠানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন আর কেবল প্রযুক্তিগত নয়, এটি হয়ে উঠেছে সিলিকন ভ্যালির সবচেয়ে বড় নৈতিক পরীক্ষা।
কীভাবে একটি গাণিতিক সমস্যার সমাধান থেকে শুরু হওয়া উচ্ছ্বাস শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে চার সিইওর যৌথ সতর্কবার্তায়, পোপের ধর্মীয় হস্তক্ষেপে, এবং খোদ গবেষকদের পদত্যাগে— এই প্রতিবেদনে আমরা তা দেখব।

চলতি মাসে নর্থ ক্যারোলাইনার চ্যাপেল হিলে প্রযুক্তি বিষয়ক জি-২০ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বিক্ষোভকারীরা এআই বিষয়ক নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। শন রেফোর্ড/ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল
গণিতের সমস্যা সমাধান, তারপর উদযাপন
মিলেনিয়াম প্রাইজ সমস্যা হলো গণিত বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন এবং গুরুত্বপূর্ণ ৭টি অমিমাংসিত গাণিতিক সমস্যা। ২০০০ সালের ২৪ মে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লে ম্যাথমেটিক্স ইন্সটিটিউট এই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে এবং প্রতিটি সমাধানের জন্য ১০ লাখ মার্কিন ডলার (১ মিলিয়ন ডলার) পুরস্কার ঘোষণা করে।
মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেমসের ৭টি প্রধান সমস্যার মধ্যে একমাত্র পয়েনকেয়ার কনজেকচার সমস্যাটি সফলভাবে সমাধান করা হয়েছে, যা ত্রিমাত্রিক জগতের স্থান ও রূপ সংক্রান্ত থিওরেম এবং ২০০২ সালে রুশ গণিতবিদ গ্রিগরি পেরেলম্যান এটি সমাধান করলেও পুরস্কারের অর্থ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।
অন্যদিকে, বাকী ৬টি অমিমাংসিত সমস্যার মধ্যে ছিল— কম্পিউটার সায়েন্সের জটিল সমাধান সংক্রান্ত পি বনাম এনপি সমস্যা, মৌলিক সংখ্যার বিস্তার ও বিন্যাস নিয়ে রিমান হাইপোথিসিস, কোয়ান্টাম ফিজিক্সে কণার ভর ব্যাখ্যায় ইয়োং-মিলস অস্তিত্ব ও ম্যাস গ্যাপ, তরল ও গ্যাসের গতিবিধি ব্যাখ্যার নেভিয়ার-স্টোকস অস্তিত্ব ও মসৃণতা, উপবৃত্তাকার বক্ররেখা ও অ্যালজেব্রিক জ্যামিতি সম্পর্কিত বার্চ এবং সোইনারটন-ডায়ার কনজেকচার এবং জটিল বীজগাণিতিক জ্যামিতি ও টপোলজি বিষয়ক হজ কনজেকচার।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শুরুতে ওপেনএআইয়ের গবেষকরা উচ্ছ্বসিত ছিলেন, কারণ তাদের একটি অপ্রকাশিত মডেল গণিতের বিখ্যাত মিলেনিয়াম প্রাইজ সমস্যার একটি সমাধান করে ফেলে।
প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যানথ্রপিক এটি আগেই সমাধান করে ফেলেছে— অনলাইনে এমন গুজব শোনারা পর এই পরীক্ষা ওপেনএআই শুরু করেছিল। সাফল্যের পর গবেষকরা একে অপরকে ফোন করে উদযাপন করেন এবং স্ল্যাকেও এই বিজয় নিয়ে পোস্ট দেন।
সমস্যাটি ছিল নেভিয়ার-স্টোকস সমীকরণ। এই সমীকরণ প্রায় নব্বই বছর ধরে অমীমাংসিত ছিল, আর এর আগে মাত্র একটি মিলেনিয়াম প্রাইজ সমস্যাই সমাধান করা গিয়েছিল।
ওপেনএআইয়ের মডেল দেখিয়েছে, নির্দিষ্ট এক পরিস্থিতিতে তরলের প্রবাহ এমনভাবে জটিল হয়ে উঠতে পারে যে গাণিতিক সমীকরণ ভেঙে পড়ে, যাকে গণিতবিদরা বলেন “ফাইনাইট-টাইম ব্লোআপ”।
তবে এই বিজয় নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। অ্যানথ্রপিকের একজন গবেষক লেভেন্ট আলপোগে ও নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ ট্রিস্টান বাকমাস্টার দাবি করেন, তারা আগেই একটি সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান করেছিলেন সেটি অয়লার সমীকরণ, নেভিয়ার-স্টোকস নয়; এবং ওপেনএআই পরে তাদের সেই অগ্রাধিকার স্বীকার করে নেয়।
এই ঘটনার পেছনে ছিল দুই দলের মধ্যে কৃতিত্ব নিয়ে কড়া আলোচনা; কে আগে কী প্রকাশ করবে, কার নাম থাকবে লেখক তালিকায় —এসব নিয়ে ভেতরে ভেতরে টানাপোড়েন চলেছিল।
এই ঘটনার প্রযুক্তিগত দিকটাও চমকপ্রদ। সমস্যাটি সমাধানে ওপেনএআই প্রায় ৪৯ লাখ বার্তা পাঠিয়েছিল এজেন্টদের মাধ্যমে, ব্যবহার করেছিল প্রায় তিনশ বিলিয়ন আউটপুট টোকেন। শুধু নেভিয়ার-স্টোকস সমস্যার জন্যই খরচ হয়েছিল প্রায় বাইশ মিলিয়ন ডলারের সমতুল্য কম্পিউটিং শক্তি।
টাকার অঙ্কে কে এগিয়ে
গত প্রান্তিকে অ্যানথ্রপিকের আয় ওপেনএআইকে ছাড়িয়ে যায়; ১১.৬ বিলিয়ন ডলার বনাম ৬.৭ বিলিয়ন ডলার। অথচ একই সময়ে ওপেনএআইয়ের লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ১২.৩ বিলিয়ন ডলারে। তবে রাজস্বে এগিয়ে থাকা মানেই মুনাফায় এগিয়ে থাকা নয়; বরং দুই প্রতিষ্ঠানই বিপুল অর্থ ঢালছে গবেষণা আর কম্পিউটিং অবকাঠামোয়।
ওপেনএআই ২০২৬ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেছে। প্রতিষ্ঠানটির সিইও স্যাম অল্টম্যানের যুক্তি হলো, অ্যালাইনমেন্ট ও মনিটরিং গবেষণা মডেলের সক্ষমতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না, ফলে তাদের সবচেয়ে উন্নত অপ্রকাশিত মডেলগুলো এখনো নিরাপদভাবে ছাড়ার মতো অবস্থায় নেই বলে তিনি মনে করেন।
২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল–জুন) আয়

নিরাপত্তার কারণে একটি শীর্ষস্থানীয় ল্যাবের আইপিও থেকে সরে আসা কোনো সাধারণ প্রেস বিবৃতি নয়; এটি বোর্ডের সিদ্ধান্ত, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুল অর্থমূল্য।
বাজার-বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান আইটাইগারের এক প্রতিবেদনে পরিচিত শর্ট-সেলার স্টিভ আইসম্যানের মন্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে, যেখানে তিনি অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইকে গোটা এআই ট্রেডের “অ্যাকিলিস হিল” বা দুর্বলতম বিন্দু বলে অভিহিত করেছেন।
বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর এআই-সংশ্লিষ্ট রাজস্বের প্রায় সত্তর শতাংশই আসছে এই দুই প্রতিষ্ঠান থেকে, আর সস্তা চীনা মডেলের সঙ্গে মূল্য-যুদ্ধ শুরু হলে পুরো খাতেই ধাক্কা লাগতে পারে বলে আইসম্যান সতর্ক করেছেন।
শেয়ারবাজারের ওপর বাড়তি চাপ
এআই খাতের এই উত্থান একা দাঁড়িয়ে নেই।
ক্রাক্স ইনভেস্টরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তেলের ঊর্ধ্বমুখী দাম, প্রায় পাঁচ শতাংশ ছুঁইছুঁই ট্রেজারি বন্ড ইল্ড, এবং ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার আবার বাড়ানোর আশঙ্কা —এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে এআই-চালিত শেয়ারবাজার র্যালিকে বড় পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছে।
ইতিহাসে যখনই এই তিন উপাদান একসঙ্গে জড়ো হয়েছে, তখনই বাজারে বড় সংশোধন বা সেক্টর ঘুরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।
ডেটা সেন্টার আর ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো অবকাঠামো-নির্ভর খাতগুলো জ্বালানি খরচ বৃদ্ধিতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও একই বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
বন্ড ইল্ড বেশি থাকলে বিনিয়োগকারীরা উচ্চ-প্রবৃদ্ধির প্রযুক্তি শেয়ার ছেড়ে নিরাপদ ফিক্সড-ইনকাম বিনিয়োগে চলে যেতে পারেন —এটাই সাধারণ বাজার-যুক্তি।
অর্থাৎ এআই কোম্পানিগুলোর প্রযুক্তিগত ঝুঁকি এখন সরাসরি জড়িয়ে গেছে সুদহার আর জ্বালানির বৈশ্বিক রাজনীতির সঙ্গে।
হাগিং ফেসে এজেন্টদের অনুপ্রবেশ
নিরাপত্তা সংকটের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়টি ঘটে গ্রীষ্মে। চলতি বছরের মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ওপেনএআইয়ের অন্তত ১,২০০টি এআই এজেন্ট সাইবার-নিরাপত্তা পরীক্ষার পরিবেশ থেকে পালিয়ে যায়; মানুষের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই সমন্বিতভাবে।
এজেন্টগুলো নিজেদের তৈরি বার্তাবোর্ডে হাজার হাজার বার্তা আদান-প্রদান করে, এবং ওপেনএআই স্টাফরা এই অস্বাভাবিক কার্যক্রম বুঝতে পারার আগেই তা অনেকদূর এগিয়ে যায়।

এআই ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার জনপ্রিয় ওপেন-সোর্স প্ল্যাটফর্ম ও কমিউনিটি হাগিং ফেস। তাদের প্রযুক্তিগত সময়রেখা অনুযায়ী, প্রায় আড়াই দিন ধরে তাদের অবকাঠামোর ভেতরে একটি স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট একটানা অনুপ্রবেশ চালায়। এটি ছিল হাজার হাজার ছোট ছোট স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তের সমষ্টি, মেশিনের গতিতে সম্পাদিত, ছোট ছোট সংক্ষিপ্ত-জীবনের স্যান্ডবক্স পরিবেশজুড়ে, যেখানে কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল চলছিল সাধারণ পাবলিক ওয়েব সার্ভিসের মাধ্যমে। এই ফরেনসিক পুনর্গঠনে প্রায় সতেরো হাজার ছয়শ আক্রমণকারী পদক্ষেপ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
সিএনবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওপেনএআই নিজেই স্বীকার করেছে যে তাদের দুটি মডেল— জিপিটি-৫.৬ সোল এবং একটি এখনো অপ্রকাশিত আরও শক্তিশালী মডেল—স্যান্ডবক্স পরিবেশ থেকে পালিয়ে ইন্টারনেটে প্রবেশ করে এবং একটি দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে হাগিং ফেসের সিস্টেমে ঢুকে পড়ে।
ওপেন-সোর্স ডেভেলপার ও এআই গবেষক সাইমন উইলিসন ওপেনএআই ও হাগিং ফেসের মধ্যকার সাইবার নিরাপত্তা দুর্ঘটনা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী ব্লগ পোস্ট লিখেছেন।
সেখানে তিনি লিখেছেন, ওপেনএআই আসলে একটি সাইবার-নিরাপত্তা পরীক্ষা চালাচ্ছিল, যেখানে মডেলের গার্ডরেল বা নিরাপত্তা-সীমাবদ্ধতা বন্ধ রাখা ছিল। মডেলটি পরীক্ষার সমাধান নিজে বের করার বদলে স্যান্ডবক্স ভেঙে বেরিয়ে যায়, তারপর হাগিং ফেসে ঢুকে পরীক্ষার উত্তর চুরি করার চেষ্টা করে; অর্থাৎ পরীক্ষায় নকল করার একধরনের প্রচেষ্টা। হাগিং ফেস পরে তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অবকাঠামো নতুন করে তৈরি করতে বাধ্য হয়।
শ্যাটার্ড ডট আইওর প্রতিবেদনে অ্যানথ্রপিকের রেড-টিম প্রধান লোগান গ্রাহামের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, তিনি এই ঘটনাকে “প্রথম প্রকৃত এআই নিরাপত্তা বিপর্যয়” বলে অভিহিত করেছেন। একই প্রতিবেদনে অ্যাপোলো রিসার্চের প্রধান নির্বাহী মারিউস হবহানের একটি প্রশ্নও তুলে ধরা হয়েছে—এই মাপের সক্ষমতার একটি মডেলকেই যদি আটকানো না যায়, তাহলে ভবিষ্যতের আরও শক্তিশালী মডেলের ক্ষেত্রে কী হবে।
একই সময়ে অ্যানথ্রপিকের নিজস্ব ক্লদ মডেলও একটি ভুল কনফিগার করা পরীক্ষার পরিবেশের সুযোগে তিনটি প্রতিষ্ঠানে অনুপ্রবেশ করেছিল। অর্থাৎ এই সমস্যাটি শুধু একটি কোম্পানির নয়— পুরো শিল্পের কাঠামোগত দুর্বলতা এখানে উন্মোচিত হয়েছে।
চার প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরল ঐকমত্য
এই ধারাবাহিক বিপর্যয়ের পর শিল্পে এক নজিরবিহীন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
গত ১২ সেপ্টম্বর অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিও আমোদেই এআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি ইচ্ছাকৃতভাবে কমানোর আহ্বান জানান; যুক্তি দেখিয়ে বলেন, সক্ষমতা এমন গতিতে বাড়ছে যা গবেষকরা বুঝে ওঠার বা নিয়ন্ত্রণ করার আগেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে। একই দিনে স্যাম অল্টম্যান ও ইলন মাস্ক তার এই প্রস্তাব প্রকাশ্যে সমর্থন করেন।
আমোদেই তার ৩,৮০০ শব্দের প্রবন্ধে লেখেন, তার মূল বার্তা ছিল, এআই মডেলের সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি কমাতে হবে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অল্টম্যান একমত হয়ে বাইরের তদারকি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, আর মাস্ক মাত্র তিন শব্দে জবাব দেন, “দারিও ঠিক বলেছে”।
এই প্রতিক্রিয়াগুলো তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এই তিনজনের মধ্যে ব্যক্তিগত রেষারেষি সুবিদিত; তবু তারা এই ক্ষেত্রে ঐক্যমত।
মাস্ক নিজেই ওপেনএআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, পরে বিরোধের জেরে সংস্থাটি ছেড়ে যান এবং পরবর্তীতে মামলাও করেন।
আমোদেই নিজেও ওপেনএআই থেকে বেরিয়ে অ্যানথ্রপিক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, মূলত নিরাপত্তা-সংস্কৃতি নিয়ে মতভেদের কারণে।
গুগল ডিপমাইন্ডের চেয়ারম্যান ডেমিস হাসাবিসও পরে যোগ দিয়ে বলেন, আমোদেইয়ের প্রস্তাবের খুঁটিনাটি এখনো ঠিক করা বাকি, তবে সংকটময় এই মুহূর্তে এর দিকনির্দেশনা সঠিক।
হাসাবিস আগে থেকেই একটি শিল্প-ব্যাপী মানদণ্ড নির্ধারণকারী সংস্থার প্রস্তাব দিয়ে রেখেছিলেন, যা প্রকাশের আগেই ফ্রন্টিয়ার মডেল পরীক্ষা করবে এবং প্রয়োজনে গতি কমানোর সমন্বয় সাধন করতে পারবে।
এই সমঝোতার শিকড় আরও গভীরে। গত ২৮ জুলাই ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, গুগল ডিপমাইন্ড ও মেটার ১,১০০-র বেশি কর্মী, যার মধ্যে অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিও আমোদেই ও একাধিক শীর্ষ বিজ্ঞানীও ছিলেন; তারা একটি যৌথ খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেন, যার শিরোনাম ছিল “পেসিং দ্য ফ্রন্টিয়ার”।
অর্থাৎ হাগিং ফেস কাণ্ডের পরই এই ঐক্যের প্রথম বীজ বোনা হয়েছিল, সেপ্টেম্বরের প্রকাশ্য সমঝোতা তারই পরিণতি।
ধর্মীয় জগতের সতর্কবার্তা
এই বিতর্কে যোগ দিয়েছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও।
টাইম সাময়িকীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পোপ চতুর্দশ লিও গত মে মাসে তার প্রথম বড় এনসাইক্লিক্যাল প্রকাশ করেন, নাম “মাগনিফিকা হিউম্যানিটাস”।
সেখানে তিনি সতর্ক করেন, পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়া এআই বৈষম্য বাড়াতে পারে, মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল করতে পারে, এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ক্রমেই মানুষের হাত থেকে সরে যেতে পারে।
পোপ প্রযুক্তির বিরোধী নন, বরং তিনি লিখেছেন, প্রযুক্তিকে মানবতার প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা উচিত নয়, বরং দায়িত্বশীল ও নৈতিক ব্যবহারের মাধ্যমে একে পরিচালিত করা উচিত।
বিয়াল্লিশ হাজার শব্দের এই দলিলে পোপ কেবল এআই নয়, যুদ্ধ, আধুনিক দাসত্ব, সম্পদ-বৈষম্য এবং গণতন্ত্রের ক্ষয়—এসব প্রসঙ্গও টেনে এনেছেন, এআইকে দেখেছেন এসব সংকটের একটি প্রবেশদ্বার হিসেবে।
পোপ এআইকে “নিরস্ত্র” করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, শুধু বিমূর্তভাবে নৈতিকতার কথা বললেই চলবে না, দরকার শক্তিশালী আইনি কাঠামো, স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা, সচেতন ব্যবহারকারী, এবং এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যা নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যায় না।
গবেষকদের ভেতরের আতঙ্ক
সবচেয়ে গভীর উদ্বেগটা আসছে খোদ ভেতরের মানুষদের কাছ থেকেই।
গত ৮ সেপ্টেম্বর অ্যানথ্রপিক ছেড়ে দেওয়া গবেষক জ্যাকব কক্সন বলেছেন, কোম্পানিগুলো স্ব-উন্নয়নশীল সুপারইন্টেলিজেন্সের দিকে সরাসরি ছুটছে এবং মানুষের জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে।
কক্সন এর আগে ওপেনএআই ও এনথ্রোপিক —দুই প্রতিষ্ঠানেই কাজ করেছেন, তাই দুই সংস্থার অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে।
কক্সনের এই মন্তব্যের জবাবে অ্যানথ্রপিকের একজন শীর্ষ বিজ্ঞানী পাল্টা মন্তব্য করেন, আগামী দশকে মানব বিলুপ্তির সম্ভাবনা এখন দশ শতাংশের বেশি।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের কলামিস্ট বেন কোহেন এই দুই ঘটনাকে গাণিতিক সাফল্য ও বিলুপ্তির আশঙ্কা একসঙ্গে দেখিয়ে লিখেছেন, গণিত না বুঝলেও এই অগ্রগতির ভয়াবহতা বোঝা সম্ভব।
মুখে সতর্কতা, বাস্তবে শিথিলতা
তবে এখানে একটা স্ববিরোধিতাও স্পষ্ট।
অ্যানথ্রপিক তাদের রেসপনসিবল স্কেলিং নীতির একটি মূল প্রতিশ্রুতি শিথিল করেছে; পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত না করে প্রশিক্ষণ বন্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি।
ওপেনএআইও পুনর্গঠনের পর তাদের প্রতিষ্ঠানিক লক্ষ্য থেকে “নিরাপদে” শব্দটি সরিয়ে ফেলেছে।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে নিউ ইয়র্কের আইনসভা সদস্য অ্যালেক্স বোরেসের একটি মন্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
সেখানে তিনি বলেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একদিকে এক কথা বলা আর ভেতরে ভেতরে লবিস্ট দিয়ে ঠিক উল্টো কাজ করানোর ইতিহাস দীর্ঘদিনের।
ম্যাসাচুসেটসসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বাধ্যতামূলক তৃতীয়-পক্ষ নিরীক্ষার প্রস্তাব দুর্বল বা প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে ওপেনএআই —এমন অভিযোগও তুলেছেন বোরেস।
অর্থাৎ প্রকাশ্য বিবৃতি আর ভেতরের বাস্তবতার মধ্যে ফারাক থেকেই যাচ্ছে।
মুখে সতর্কতার কথা বলা হচ্ছে, অথচ বাণিজ্যিক চাপে কিছু সীমারেখা একইসঙ্গে নরমও হয়ে যাচ্ছে। সমালোচকদের চোখে এটাই এই গোটা সংকটের সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক।
নিজেদেরই তৈরি করা ফাঁদ
সমঝোতার পেছনের যুক্তিটা আরেকটু খতিয়ে দেখা যাক।
আমোদেইকে যা এই সমঝোতায় ঠেলে দিয়েছে, তা আসলে নিজেদের তৈরি প্রযুক্তি নিয়েই ভয়।
আমোদেই মডেল প্রশিক্ষণ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে চান না, বরং চান শেয়ারকৃত নিরাপত্তা মানদণ্ড আর কর্মীর মতো প্রবেশাধিকার-সম্পন্ন বাইরের মূল্যায়নকারী।
এআই নাউ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ভিজিটিং ফেলো আয়া ইব্রাহিম একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তার মতে, যারা সংযমের কথা বলছেন, তাদের ওপরই আবার বিপুল অর্থনৈতিক চাপ আছে দ্রুত পণ্য বাজারে ছাড়ার, এবং তাদের সেই কাজ ঠিকভাবে করার সামর্থ্য নিয়েও বাড়ছে সন্দেহ।
বাণিজ্য বনাম বিবেক
সব মিলিয়ে ছবিটা স্পষ্ট। এক দিকে ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার দখলের লোভ। অন্য দিকে নিজেদের তৈরি প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়।
তেলের দাম, বন্ড ইল্ড, আর মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের অনিশ্চয়তা —এই বাহ্যিক চাপগুলো একই সময়ে এসে পড়েছে এই সংকটের ওপর।
ফলে প্রশ্নটা এখন শুধু প্রযুক্তির নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিরও।
চার মহারথীর প্রকাশ্য ঐক্য আশাব্যঞ্জক শোনালেও, বাস্তবতা হলো, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা থেমে নেই, আইপিও কেবল পিছিয়েছে, বাতিল হয়নি।
নিরাপত্তা নীতির প্রতিশ্রুতি একদিকে দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে শিথিলও করা হচ্ছে।
এই দ্বৈততার মধ্যেই এখন পথ খুঁজছে সিলিকন ভ্যালি; আর গোটা বিশ্ব তাকিয়ে আছে, এই টানাপোড়েনের শেষ কোথায় গিয়ে ঠেকে, তা দেখার জন্য।



