প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
ট্রাম্পের এআই চুক্তিতে কী আছে, কী নেই
এআই নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর আইন করার চাপের মধ্যে গত ২৯ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসে মেটা, এনভিডিয়া, এক্সএআই, ওপেনএআই, গুগল ও অ্যানথ্রপিকের শীর্ষ কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ছবি: রয়টার্স
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬। ০৬:৫৮ পিএম
আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৬। ১৯:৩৪ পিএম
নিয়মকানুনের দাবির মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বড় কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল ‘হোয়াইট হাউস অ্যাকর্ড অন সুপার ইন্টেলিজেন্স’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী চুক্তি চালু করা।
মেটা, এনভিডিয়া, গুগল, ওপেনএআই, এক্সএআই আর অ্যানথ্রপিকের শীর্ষ কর্তারা গত মঙ্গলবার এই চুক্তিতে সই করেছেন। এতে কোম্পানিগুলোকে বলা হয়েছে, নিরাপত্তার ঝুঁকি সামাল দিতে তারা যেন নিজেদের ভেতরেই চার স্তরের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বা গার্ডরেল গড়ে তোলে।
চুক্তিতে কী আছে, আর কী নেই
চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানিগুলোকে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে, তা দেখভালের জন্য একটি টিম গড়তে হবে, বাইরের স্বাধীন অডিটরদের সঙ্গে কাজ করতে হবে এবং ফলাফল পর্যালোচনার জন্য একটি স্বাধীন বোর্ড কমিটি তৈরি করতে হবে।
তবে চুক্তিটি পুরোপুরি স্বেচ্ছাসেবী, এর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। যারা নিয়ম মানবে না, তাদের জন্য কোনো শাস্তির ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। কোম্পানিগুলোকে অডিটের ফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে, কিংবা সরকারকে কোনো নজরদারির ক্ষমতা দিতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতাও এতে নেই। গার্ডরেল কীভাবে বসানো হবে, সেই নিয়ন্ত্রণও কোম্পানিগুলোর নিজের হাতেই রাখা হয়েছে।
তবে ভবিষ্যতে এই নিয়মগুলো বাধ্যতামূলক হওয়ার সুযোগ খোলা রাখা হয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, সময়ের সঙ্গে এই পদক্ষেপগুলোকে আইন বা বিধিতে রূপ দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, এখানে “সেলফ-পোলিসিং”-এর একটা বড় ভূমিকা থাকবে। সঙ্গে যোগ করেন, এটি সামাজিক ও নৈতিকভাবে অত্যন্ত জোরালো। হোয়াইট হাউসের লনে শীর্ষ কর্তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি দাবি করেন, নিজেদের সামলানোর ক্ষেত্রে এআই কোম্পানিগুলো দারুণ দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে।
গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাইও সোশ্যাল মিডিয়ায় চুক্তির প্রশংসা করেছেন। এক পোস্টে তিনি লেখেন, “আমরা অন্যান্য শিল্পনেতাদের সঙ্গে মিলে সুনির্দিষ্ট মান দাঁড় করাতে এবং মানুষের মনে ভরসা জোগাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আজ হোয়াইট হাউস অ্যাকর্ড এবং জয়েন্ট কমিটমেন্ট অন ফ্রন্টিয়ার রেসপন্সিবিলিটিতে যে সই হলো, সেটি সামনে এগোনোর শক্ত ভিত। এই প্রযুক্তির বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি নিরাপদ বিকাশ নিশ্চিত করার মতো বাস্তব কাজের কথা এতে আছে।”

হোয়াইট হাউসের আলোচনায় হাসোজ্জ্বল মেটা সিইও মার্ক জাকারবার্গ। ছবি: এপি

এক্সএআই প্রধান ইলন মাস্ক কথা বলছেন, পাশে ট্রাম্প ও এআইয়ের বড় কর্মকর্তারা। ছবি: এপি
নিয়ম চাইছে খোদ এআই কোম্পানিগুলোও
সরকার-নির্ধারিত নিরাপত্তার মানের দাবি যখন খোদ এই কোম্পানিগুলোর মুখ থেকেই উঠছিল, ঠিক তখনই এল এই চুক্তি।
গত সেপ্টেম্বরে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইয়ের গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সপ্রধান ক্রিস লেহানে কংগ্রেসে বাধ্যতামূলক জাতীয় এআই সুরক্ষা মানের দাবি তুলেছিলেন। এক পোস্টে তিনি বলেন, ইন্ডাস্ট্রির নিজস্ব মান কখনোই বাধ্যতামূলক ফেডারেল সুরক্ষা বা গণতান্ত্রিক নজরদারির বিকল্প হবে না, বরং সেগুলোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
গত জুনে অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী ডারিও আমোডেই আরও জোরালো ও বাধ্যতামূলক এআই নিয়মের দাবি জানান। জুলাইয়ে গুগল ডিপমাইন্ডের প্রধান নির্বাহী ডেমিস হাসাবিস যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি এআই ওয়াচডগ বা নজরদারি সংস্থা গড়ার কথা বলেন।
গার্ডরেলের এসব দাবি উঠছে এমন সময়ে, যখন খবর বেরিয়েছে যে এই কোম্পানিগুলোরই কিছু কর্মী প্রশ্ন তুলেছেন, দ্রুত জটিল হয়ে ওঠা এআই সিস্টেমগুলোর ওপর যথাযথ নজর রাখা হচ্ছে কি না।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবর অনুযায়ী, ওপেনএআইয়ের দুই কর্মী কোম্পানির শীর্ষ কর্তাদের সতর্ক করেছিলেন, নতুন মডেলগুলো ঠিকমতো পরীক্ষা করা হচ্ছে না। কিন্তু কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগে সেই সতর্কবার্তায় কেউ কান দেয়নি, আর এর মধ্যেই মডেলগুলো অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করে।

এআই নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর আইন করার চাপের মধ্যে গত ২৯ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসে মেটা, এনভিডিয়া, এক্সএআই, ওপেনএআই, গুগল ও অ্যানথ্রপিকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে এআই অ্যাকোর্ড করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
আইনি বাধ্যবাধকতার দাবি আসছে কংগ্রেস থেকে
বাধ্যতামূলক নিয়মের তাগিদ আসছে হোয়াইট হাউস থেকে নয়, কংগ্রেসের দিক থেকে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে অ্যানথ্রপিকের সাবেক এআই গবেষক জ্যাকব কক্সন সতর্ক করেন, আগামী দশ বছরের মধ্যে এআই মানবজাতির অস্তিত্বের জন্যই বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এই বক্তব্য আইনপ্রণেতাদের নজর আবার এআইয়ের দিকে ফিরিয়ে এনেছে।
সবচেয়ে বড় ও গোছানো প্রস্তাবগুলোর একটি এসেছে ভারমন্টের স্বতন্ত্র সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এবং টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি গ্রেগ কাসারের কাছ থেকে। তারা ‘ব্যান আর্টিফিশিয়াল সুপারইন্টেলিজেন্স অ্যাক্ট’ নামে একটি বিল এনেছেন। বিলটি পাস হলে কৃত্রিম সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরি ও ব্যবহার চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। তা ছাড়া কোনো ফেডারেল নিয়ন্ত্রক সংস্থা সুরক্ষার নিয়ম না বানানো পর্যন্ত উন্নত এআই তৈরির কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে।
বিলে কেবিনেট মর্যাদার একটি ‘ডিপার্টমেন্ট অফ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ গঠনের কথাও বলা হয়েছে। এই বিভাগ ফ্রন্টিয়ার এআই সিস্টেমের (সবচেয়ে আধুনিক এআই সিস্টেম বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়) ওপর নজর রাখবে, বিপজ্জনক ক্ষমতা সামলাবে এবং প্রয়োজনে কৃত্রিম সুপারইন্টেলিজেন্স ধ্বংসের তদারকি করবে। আইন অমান্য করলে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে, যার মধ্যে কোনো ব্যক্তির জন্য ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডও থাকতে পারে।
এর পাশাপাশি গত সপ্তাহে ডেলাওয়ারের ডেমোক্র্যাট সেনেটর ক্রিস কুন্স, হাওয়াইয়ের ডেমোক্র্যাট সেনেটর ব্রায়ান শাৎজ, আলাবামার রিপাবলিকান সেনেটর ক্যাটি ব্রিটস এবং ওকলাহোমার রিপাবলিকান সেনেটর জেমস ল্যাংফোর্ড একটি দ্বিদলীয় বিল এনেছেন।
‘এআই সিস্টেমস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ নামের এই বিল পাস হলে এআই কোম্পানিগুলোকে জানাতে হবে, তারা কী ধরনের ডেটা জমা করছে এবং সিস্টেম নষ্ট হওয়া বা অপব্যবহার ঠেকাতে কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে।

এআই নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর আইন করার চাপের মধ্যে গত ২৯ সেপ্টেম্বর এআই অ্যাকোর্ড করার পর মেটা, এনভিডিয়া, এক্সএআই, ওপেনএআই, গুগল ও অ্যানথ্রপিকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের সামনে হাজির হন। ছবি: এপি
সুপারইন্টেলিজেন্স মানে কী
সরকারি কাগজপত্রে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ নামটি বদলে ফেলার ট্রাম্পের চেষ্টার মধ্যেই হোয়াইট হাউস এই চুক্তির নাম দিয়েছে ‘হোয়াইট হাউস অ্যাকর্ড অন সুপার ইন্টেলিজেন্স’। প্রযুক্তি দুনিয়ায় ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ বলতে এমন এআইকে বোঝানো হয়, যা মানুষের বুদ্ধিমত্তাকেও ছাড়িয়ে যায়।
ট্রাম্প নির্বাহী বিভাগের সব সংস্থাকে সরকারি যোগাযোগে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআইয়ের জায়গায় ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ বা ‘এসআই’ ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। গত মঙ্গলবার তিনি একটি নতুন নির্বাহী আদেশও সামনে এনেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, সুপার ইন্টেলিজেন্স বলতে এমন সব প্রযুক্তি ও সিস্টেমকে বোঝানো হবে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান আইনি সংজ্ঞার ভেতরে পড়ে। একই সঙ্গে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে নতুন একটি ফেডারেল সংজ্ঞা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।




