প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৭ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬। ০৫:২৩ পিএম
ভারতের জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি আবারও আলোচনায় এসেছেন। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার কর্ণাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরুতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি। তাঁর উপস্থিতি তরুণদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করে।
কর্মসূচিতে ধ্রুব রাঠি ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব রয়েছে।
তবে ধ্রুব রাঠি বলেন, ‘আমি এখানে সরকার পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে আসিনি।’ তাঁর এই বক্তব্যের পরও সিজেপির কর্মসূচিতে সরাসরি অংশগ্রহণ ভারতের রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তথ্যভিত্তিক ভিডিও তৈরি করে পরিচিতি পেয়েছেন ধ্রুব রাঠি। ইউটিউবের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও রয়েছে তাঁর বিপুলসংখ্যক অনুসারী। কিন্তু কীভাবে সাধারণ একটি ইউটিউব চ্যানেল থেকে ভারতের অন্যতম পরিচিত কনটেন্ট নির্মাতায় পরিণত হলেন তিনি?

ধ্রুব রাঠির জন্ম ১৯৯৪ সালে। ছবি: ধ্রুব রাঠির ওয়েবসাইট থেকে
জন্ম, বেড়ে ওঠা ও শিক্ষা
ধ্রুব রাঠির জন্ম ১৯৯৪ সালের ৮ অক্টোবর।
ধ্রুব রাঠির জন্ম ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের রোহতকে, একটি হিন্দু জাট পরিবারে। তাঁর বাবা মহাবীর রাঠি এবং মা ঊর্মিলা রাঠি। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আগ্রহ ছিল তাঁর।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ১৭ বছর বয়সে উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানিতে যান ধ্রুব রাঠি। সেখানে কার্লসরুহে ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (কেআইটি) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে একই প্রতিষ্ঠানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করেন।
প্রকৌশল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে পড়াশোনা তাঁর জ্ঞানভিত্তিক কনটেন্ট তৈরিতে ভূমিকা রাখে। জটিল বিষয় বিশ্লেষণ এবং সেগুলো সহজ ভাষায় উপস্থাপনের দক্ষতা পরবর্তী সময়ে তাঁর ভিডিওগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।
বর্তমানে জার্মানিতে বসবাস করলেও ভারতের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ধ্রুব রাঠি। তাঁর বক্তব্য, কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন বিষয় ও উন্নয়ন নিয়ে যুক্ত থাকার চেষ্টা করেন তিনি।

ইউটিউবের জগতে ধ্রুব রাঠির পথচলা শুরু হয় ২০১৩ সালে। ছবি: ধ্রুব রাঠির ওয়েবসাইট থেকে
ইউটিউবে যাত্রা
২০১৩ সালে ইউটিউবে যাত্রা শুরু করেন ধ্রুব রাঠি।
জার্মানিতে পড়াশোনার সময় ২০১৩ সালে ইউটিউবে ভিডিও তৈরি শুরু করেন ধ্রুব রাঠি। শুরুতে প্রযুক্তি ও পরিবেশবিষয়ক নানা বিষয় নিয়ে ভিডিও বানাতেন তিনি। জ্ঞান ভাগাভাগি করার আগ্রহ থেকেই মূলত তাঁর এই যাত্রার সূচনা।
২০১৪ সালে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের কার্যক্রম ও নীতি নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী একটি ভিডিও তৈরি করেন তিনি। ভিডিওটি ব্যাপক সাড়া ফেললে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর পরিচিতি বাড়তে শুরু করে।
এরপর সামাজিক সমস্যা, ইতিহাস, বিজ্ঞান, রাজনীতি ও সমসাময়িক নানা ঘটনা নিয়ে ভিডিও প্রকাশ করতে থাকেন ধ্রুব রাঠি। তথ্য, যুক্তি ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে জটিল বিষয় দর্শকদের কাছে সহজবোধ্য করে তোলার চেষ্টা তাঁর কনটেন্টকে আলাদা পরিচিতি দেয়।
সময়ের সঙ্গে তাঁর ভিডিওর বিষয়বস্তুও বিস্তৃত হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়, বিভিন্ন সামাজিক ও আন্তর্জাতিক ঘটনা নিয়েও নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি করেন তিনি।
জনপ্রিয়তার পেছনে কী
ধ্রুব রাঠির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ তাঁর উপস্থাপনার ধরন। জটিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়কে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন তিনি। ভিডিওতে তথ্য, পরিসংখ্যান, গ্রাফিকস ও বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপট ব্যবহার করে দর্শকদের বিষয়গুলো বুঝতে সহায়তা করেন।
তাঁর ভিডিওর বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে ভারতের রাজনীতি ও সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিশ্লেষণ। এসব ভিডিও যেমন দর্শকদের আগ্রহ তৈরি করেছে, তেমনি তাঁর বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনাও হয়েছে।
তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনা ও সরাসরি বক্তব্যের কারণে তরুণ দর্শকদের মধ্যে তাঁর পরিচিতি বেড়েছে। তবে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্লেষণকে ঘিরে মতভেদও রয়েছে। ফলে ধ্রুব রাঠি শুধু একজন ইউটিউবার নন, ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনারও পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন।
ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য মাইলফলক
ধ্রুব রাঠির ইউটিউব যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ধাপ—
২০১৩: প্রযুক্তি ও পরিবেশবিষয়ক ভিডিও দিয়ে ইউটিউবে যাত্রা শুরু।
২০১৪: বিজেপি সরকারের কার্যক্রম নিয়ে তৈরি ভিডিওর মাধ্যমে রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে পরিচিতি বাড়ে।
২০১৮: ভ্রমণ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে ‘ধ্রুব রাঠি ভ্লগস’ নামে দ্বিতীয় ইউটিউব চ্যানেল চালু করেন।
২০২২: বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে তাঁর অনুসারী ও সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা এক কোটি ছাড়ায়।
২০২৩: নাস একাডেমির সঙ্গে যৌথভাবে ‘ধ্রুব রাঠি একাডেমি’ চালু করেন। সেখানে সময় ব্যবস্থাপনাবিষয়ক কোর্স নিয়ে আসেন।
বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অনুসারী
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ধ্রুব রাঠির প্রধান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর অনুসারী ও সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
ইউটিউব (@DhruvRathee): প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ সাবস্ক্রাইবার।
ইউটিউব (@DhruvRatheeVlogs): প্রায় ৩৫ লাখ ৩০ হাজার সাবস্ক্রাইবার।
ইনস্টাগ্রাম (@dhruvrathee): প্রায় ১ কোটি ৯১ লাখ অনুসারী।
ফেসবুক (@DhruvRathee): প্রায় ৭৬ লাখ অনুসারী।
এক্স (@dhruv_rathee): প্রায় ৩৩ লাখ অনুসারী।
সংখ্যাগুলো পরিবর্তনশীল; এখানে দেওয়া হিসাব মূল লেখায় উল্লেখিত তথ্যের ভিত্তিতে সাজানো হয়েছে।
ইউটিউবার থেকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে
ধ্রুব রাঠির যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রযুক্তি ও পরিবেশবিষয়ক ভিডিও দিয়ে। সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, সামাজিক সমস্যা ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি তাঁর কনটেন্টের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। তথ্য উপস্থাপনের ধরন, নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্তৃত উপস্থিতি তাঁকে বিপুল দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
বেঙ্গালুরুর সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে তাঁর অংশগ্রহণ আবারও দেখিয়েছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরিচিতি পাওয়া কনটেন্ট নির্মাতারাও রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারেন। তবে সেই প্রভাব কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে তাঁর বক্তব্য, কাজ ও জনসম্পৃক্ততার ওপর।


