প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১০ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৭:১৯ পিএম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের মধ্যেই নতুন করে সামনে এসেছে সাইবার নিরাপত্তার বড় প্রশ্ন। অস্ট্রেলিয়ার সরকারের একটি মেডিকেয়ার পরিসংখ্যান পোর্টালে ওপেনএআইয়ের তৈরি একটি এআই এজেন্ট অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। সরকারি সূত্র বলছে, ঘটনাটি ঘটেছে গত জুনে এবং পোর্টালটির উন্মুক্ত ও অপ্রকাশ্য—উভয় ধরনের কিছু ফাইলে এজেন্টটি প্রবেশাধিকার পেয়েছিল।
কী ঘটেছিল
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের জানান, ১৮ জুন ওপেনএআইয়ের একটি এআই এজেন্ট সার্ভিসেস অস্ট্রেলিয়া পরিচালিত মেডিকেয়ার স্ট্যাটিকস রিপোর্টিং সার্ভিস পোর্টালে অননুমোদিত প্রবেশ করে। পোর্টালটি মূলত মেডিকেয়ার সংক্রান্ত পরিসংখ্যান, ব্যয় ও অন্যান্য সামষ্টিক তথ্য প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়।
সরকারের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এজেন্টটি প্রথমে প্রকাশ্য তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে। পরবর্তীতে সিস্টেম থেকে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়ে এবং অপ্রকাশ্য কিছু ফাইলে প্রবেশ করে। অস্ট্রেলীয় সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মেডিকেয়ার বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত রেকর্ডে প্রবেশের প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
গবেষণার কাজ করতে গিয়ে অননুমোদিত প্রবেশ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই এজেন্টটি অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞান-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান সংগ্রহের গবেষণামূলক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। অর্থাৎ, শুরুতে কাজটি ছিল তথ্য খোঁজা ও বিশ্লেষণের মতো একটি সাধারণ গবেষণামূলক কাজ।
কিন্তু নির্ধারিত তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হলে এজেন্টটি এমন পদক্ষেপ নেয়, যা তার অনুমোদিত কাজের সীমা অতিক্রম করে। অস্ট্রেলিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী রিচার্ড মার্লেসের ভাষ্য অনুযায়ী, এজেন্টটি আরও কয়েকটি সরকারি ওয়েবসাইটের সঙ্গে সাধারণ ব্যবহারকারীর মতো যোগাযোগ করেছিল। মেডিকেয়ার পোর্টালের ক্ষেত্রে অনুমোদিত উপায়ে তথ্য না পাওয়ার পর সেটি বিকল্প পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করে।
ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য তথ্য ফাঁসের প্রমাণ নেই
ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত ব্যক্তিগত রোগীর তথ্য বা মেডিকেয়ারের ব্যক্তিগত রেকর্ডে প্রবেশের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ বলেছেন, সংশ্লিষ্ট পোর্টালটি মূলত অ-সংবেদনশীল মেডিকেয়ার পরিসংখ্যানের জন্য ব্যবহৃত হতো।
তবে সরকারি নেটওয়ার্কে অননুমোদিত প্রবেশের বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ান সিগন্যালস ডিরেক্টরেটের সহায়তায় ফরেনসিক তদন্ত চলছে, যাতে ওই এআই এজেন্ট অন্য কোনো সরকারি সিস্টেমে প্রবেশ করেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিন মাস পর সরকারকে জানায় ওপেনএআই
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—জুনে ঘটনাটি ঘটলেও অস্ট্রেলিয়া সরকারকে বিষয়টি জানানো হয় প্রায় তিন মাস পর।
প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ জানান, ১০ সেপ্টেম্বর ওপেনএআই একটি সাধারণ সরকারি ই-মেইল ঠিকানায় বার্তা পাঠিয়ে ঘটনাটি জানায়। পরদিন ই-মেইলটি পড়া হয় এবং ১৫ সেপ্টেম্বর বিষয়টি অস্ট্রেলিয়ার সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়।
এই বিলম্ব নিয়ে ওপেনএআইয়ের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আলবানিজ। তিনি জানান, ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের সঙ্গে কথা বলে ঘটনাটি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ‘চরম উদ্বেগের’ কথা জানিয়েছেন।
তদন্তে বিশেষ টাস্কফোর্স
ঘটনার পর অস্ট্রেলিয়া সরকার একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এতে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সমন্বয়ক, অফিস অব এআই, অস্ট্রেলিয়ান সিগন্যালস ডিরেক্টরেট, অস্ট্রেলিয়ান এআই সেফটি ইনস্টিটিউট এবং সার্ভিসেস অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিরা থাকবেন।
এই টাস্কফোর্স এআই-সম্পর্কিত সাইবার হামলা বা অননুমোদিত কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন ও সরকারি প্রক্রিয়া যথেষ্ট কি না, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা হলে এআই কোম্পানিগুলোর দ্রুত তথ্য জানানোর বাধ্যবাধকতা প্রয়োজন কি না এবং সরকারি সিস্টেমের নিরাপত্তা কীভাবে আরও জোরদার করা যায়—এসব বিষয় পর্যালোচনা করবে।
ওপেনএআইয়ের বক্তব্য
ওপেনএআই জানিয়েছে, তারা ঘটনাটি তদন্ত করছে। কোম্পানির প্রাথমিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইট ও সেবা থেকে তথ্য খোঁজার সময় তাদের মডেলগুলো এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল, যা তারা প্রত্যাশা করেনি।
কোম্পানির পর্যালোচনায় এখন পর্যন্ত কোনো রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে। তবে সরকারি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনার সম্পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট নয়।
এআই নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বিতর্ক
ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন এআই প্রযুক্তির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জাতিসংঘে বিশ্বনেতাদের মধ্যে আলোচনা চলছে। অস্ট্রেলিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ উন্নত এআই মডেলের জন্য আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো বা ‘গার্ডরেল’ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআইয়ের ওপর নতুন আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিরোধিতা করেছেন। ফলে এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ভাবনের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে তৈরি করা হবে—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মতপার্থক্যও স্পষ্ট হচ্ছে।
গবেষকদের মতে, এই ঘটনা অন্তত একটি বিষয় সামনে এনেছে—এআই এজেন্টকে শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সফটওয়্যার হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। তারা যখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওয়েবসাইটে প্রবেশ, তথ্য অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন ডিজিটাল টুল ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন করছে, তখন তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের জন্য নতুন ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে।
‘প্রথম’ সরকারি এআই হ্যাকিংয়ের দাবি
অস্ট্রেলিয়ার ঘটনাটিকে কিছু গবেষক স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টের মাধ্যমে কোনো সরকারি ব্যবস্থায় হ্যাকিংয়ের প্রথম রিপোর্টেড ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করছেন। তবে এ দাবিটি এখনো তদন্ত ও স্বাধীন যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার সরকারি তদন্ত শেষ হলে এজেন্টটি ঠিক কীভাবে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ অতিক্রম করেছিল, কোন কোন ফাইলে প্রবেশ করেছিল এবং অন্য কোনো সরকারি সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে আরও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
ঘটনাটি তাই শুধু অস্ট্রেলিয়ার একটি সরকারি পোর্টালের নিরাপত্তা লঙ্ঘন নয়; বরং ক্রমেই স্বয়ংক্রিয় হয়ে ওঠা এআই এজেন্টের ক্ষমতা, সীমাবদ্ধতা এবং জবাবদিহি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।


