প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫০ এএম
ফ্রান্সিস হালজেন, আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরির প্রধান গবেষক। অ্যান্টার্কটিকার বরফকে কণা শনাক্তকারী যন্ত্র বানানোর ভাবনা তারই। ২০২৬ সালে আইসকিউবে নির্ণায়ক অবদান আর মহাজাগতিক উৎসের উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য তিনি পদার্থে নোবেল পেয়েছেন। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬। ১০:৫৮ এএম
আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২৬। ১৩:৫৬ পিএম
২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফ্রান্সিস হালজেন। আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে নির্ণায়ক অবদান আর মহাজাগতিক উৎসের উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য এই স্বীকৃতি। ঘোষণা এসেছে ৬ অক্টোবর, সুইডিশ রয়্যাল একাডেমি অব সায়েন্সেস থেকে।

ফ্রান্সিস হালজেন। ছবি: নোবেলপ্রাইজ ডট ওআরজি
কে এই হালজেন?
হালজেনের জন্ম ১৯৪৪ সালে, বেলজিয়ামের টিনেন শহরে। পিএইচডি করেছেন কেইউ লভেন থেকে। এখন পড়ান যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ে। আইসকিউব প্রকল্পের শুরুটা তার হাত ধরেই, ১৯৮০-র দশকের শেষে। ২০০১ সাল থেকে তিনি এর প্রধান গবেষক।
ঘোষণার সময় তিনি ছিলেন ইতালিতে। ফোনে বলেছেন, খবরটা তার কাছে ‘বড় চমক’। সেখানে একটা বিজ্ঞান উৎসবে তিনি নতুন এক প্রকল্পের প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছিলেন। মজা করে বলেছেন, নোবেল হয়তো প্রকল্পের অর্থ জোগাড়ে সাহায্য করবে।
পুরস্কারের অর্থ ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, প্রায় ১২ লাখ ডলার। বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রীর হিসাবে হালজেন দেশটির ১১তম নোবেলজয়ী। ফিজিক্স টুডের সম্পাদক বলেছেন, বহুদিন পর পদার্থের নোবেল গেল একজনের হাতে। নোবেল কমিটির প্রধান মার্ক পিয়ার্স বলেছেন, হালজেনের দৃঢ়তা আর বৈজ্ঞানিক দূরদৃষ্টি জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন পথ খুলে দিয়েছে। তবে পুরস্কার একজনের নামে হলেও আইসকিউব আন্তর্জাতিক এক গবেষক দলের তৈরি যন্ত্র।
অ্যান্টার্কটিকার বরফে অদ্ভুত এক মানমন্দির
অ্যান্টার্কটিকার বরফের ওপরে দাঁড়ালে শুধু সাদা আর নীরবতা। কিন্তু নিচে লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানের এক বিস্ময়। নাম আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি।
এটা সাধারণ টেলিস্কোপ নয়। এতে কাচের লেন্স নেই। এটা তারা বা গ্রহ দেখে না। এটা খোঁজে নিউট্রিনো নামের এক রহস্যময় কণা।

নিউট্রিনো সব কিছুই ভেদ করে যায়! ছবি: রয়েল সুইডিস একাডেমি অব সায়েন্স
নিউট্রিনো কেন ‘ভৌতিক কণা’?
বিজ্ঞানীরা আদর করে নিউট্রিনোকে ডাকেন ‘ঘোস্ট পার্টিকেল’। কারণ প্রথমত, এর ভর প্রায় নেই বললেই চলে। ইলেকট্রনের চেয়ে কয়েক লক্ষ গুণ হালকা। দ্বিতীয়ত, এর কোনো বিদ্যুৎ-চার্জ নেই। তাই চুম্বক বা বিদ্যুৎ দিয়ে একে টেনে ধরা যায় না।
তৃতীয় কারণটাই সবচেয়ে অদ্ভুত। নিউট্রিনো প্রায় কারও সঙ্গে ধাক্কা খায় না। আলো দেয়াল ভেদ করতে পারে না। নিউট্রিনো পুরো পৃথিবী ফুঁড়ে চলে যায়। প্রতি সেকেন্ডে লক্ষ কোটি নিউট্রিনো আমাদের শরীরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। আমরা কিছুই টের পাই না।
দেড় থেকে আড়াই কিলোমিটার বরফের নিচে ফাঁদ
এই কণা ধরতে দরকার ঘুটঘুটে অন্ধকার আর নিখুঁত স্বচ্ছ জায়গা। অ্যান্টার্কটিকার পুরনো বরফ ঠিক তেমন।
কাজটা সহজ ছিল না। সাধারণ ড্রিলে এত শক্ত বরফ কাটা যায় না। তাই গবেষকেরা ব্যবহার করলেন গরম পানির ড্রিল। ড্রিলের মুখে পানির তাপমাত্রা ৮৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একেকটা কুয়ো খুঁড়তে লাগত প্রায় ৩০ ঘণ্টা।
মোট কুয়ো ৮৬টা। প্রতিটা তারে ঝোলানো ৬০টা করে সেন্সর। সব মিলিয়ে ৫,১৬০টা। সেন্সরগুলো আছে বরফের নিচে ১,৪৫০ থেকে ২,৪৫০ মিটার গভীরে। কাজ শেষে ঠান্ডায় কুয়োর পানি আবার জমে গেল। পুরো যন্ত্রটা আটকা পড়ল বরফের ভেতর। চিরদিনের জন্য। নির্মাণ শেষ হয় ২০১০ সালের ডিসেম্বরে। পূর্ণ গতিতে কাজ শুরু ২০১১ সালের মে মাসে।

২০১৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আইসকিউবের রিয়েল-টাইম সতর্কবার্তা আসে। কণাটা ছিল একটা মিউওন নিউট্রিনো, শক্তি প্রায় ২৯০ টেরা-ইলেকট্রনভোল্ট। এর আসার দিক ০.০৬ ডিগ্রির মধ্যে মিলে গেল টিএক্সএস ০৫০৬+০৫৬ নামের সক্রিয় গ্যালাক্সির সঙ্গে। গ্যালাক্সিটা পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে। ছবি: আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি রিসার্চ সেন্টার
অন্ধকারে নীল আলোর ঝলক
প্রশ্ন হলো, যে কণা কাউকে পাত্তাই দেয় না, তাকে ধরা হয় কীভাবে? উত্তর: চেরেনকভ বিকিরণ।
কোটি কোটি নিউট্রিনো বরফ পেরিয়ে চলে যায়। কদাচিৎ একটা কণা বরফের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে ধাক্কা খায়। তখন তৈরি হয় নতুন এক কণা, যেমন মিউওন। সেটা বরফের ভেতর ছোটে আলোর চেয়েও দ্রুত। আর অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়ে হালকা নীল আলো।
এতে আইনস্টাইনের নিয়ম ভাঙে না। শূন্যস্থানে আলোর গতি সেকেন্ডে ৩ লাখ কিলোমিটার। বরফের ভেতর আলো কিছুটা ধীর হয়ে যায়। কণাটা তখন সেই ধীর আলোকে ছাড়িয়ে যায়। যুদ্ধবিমান শব্দকে ছাড়িয়ে গেলে যেমন ‘সনিক বুম’ হয়, এটা তার আলোর সংস্করণ। বলা যায় ‘অপটিক্যাল বুম’।
সেন্সরগুলো ওই আলো ধরে ফেলে। কোন দিক থেকে কোন দিকে আলো গেল, কম্পিউটার তা মেপে একটা রেখা আঁকে। সেই রেখা উল্টো দিকে ধরে বিজ্ঞানীরা পৌঁছে যান মহাকাশের উৎসে।
সূর্যের বুলেট বনাম ব্ল্যাকহোলের কামান
সূর্যের ভেতরের ফিউশন থেকেও নিউট্রিনো আসে। শক্তিতে সেগুলো সাধারণ, যেন খেলনা বুলেট।
আইসকিউব খোঁজে অন্য জিনিস। উচ্চশক্তির নিউট্রিনো। এগুলো আসে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের দানব ব্ল্যাকহোল, ব্লাজার আর গ্যালাক্সির মহাজাগতিক সংঘর্ষ থেকে। এদের শক্তি যেন জ্বলন্ত কামানের গোলা।

কী কী পেল আইসকিউব?
২০১৩ সালে আইসকিউব উচ্চশক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনো প্রথমবার পর্যবেক্ষণ করে। ফিজিক্স ওয়ার্ল্ড সেটাকে বছরের সেরা সাফল্য বলেছিল।
২০১৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আইসকিউব একটা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো ধরল। শক্তি প্রায় ২৯০ টেরা-ইলেকট্রনভোল্ট। সেটা এল টিএক্সএস ০৫০৬+০৫৬ নামের এক ব্লাজারের দিক থেকে। ওই সময় ব্লাজারটা গামা রশ্মির ঝলক ছড়াচ্ছিল। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে সায়েন্স জার্নালে দুটো গবেষণাপত্র ছাপা হয়। সেগুলো প্রথমবার দেখাল, একটা চেনা ব্লাজার উচ্চশক্তির নিউট্রিনোর উৎস।
২০২২ সালে এল সক্রিয় গ্যালাক্সি মেসিয়ার ৭৭ (এনজিসি ১০৬৮) থেকে নিউট্রিনোর প্রমাণ। গ্যালাক্সিটা আমাদের থেকে প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ আলোকবর্ষ দূরে। ২০২৩ সালে এল আমাদের নিজেদের মিল্কিওয়ে থেকে উচ্চশক্তির নিউট্রিনোর প্রমাণ। ৩৫০ জনের বেশি বিজ্ঞানীর দল ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে ফল প্রকাশ করে সায়েন্স জার্নালে।
হালজেনের ভাষায় আইসকিউবের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার ‘নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞান’ এখন বাস্তব।
কাচের গোলক ভাঙে না কেন?
বরফের নিচে বিশাল চাপ। সাধারণ কাচ গুঁড়ো হয়ে যেত। তাই সেন্সর বানানো হয়েছে অন্যভাবে। প্রতিটা সেন্সর একটা ফাঁপা কাচের গোলক। ব্যাস প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার, সাধারণ ফুটবলের চেয়ে বেশ বড়। ভেতরে আছে একটা ১০ ইঞ্চির আলো-সংবেদী টিউব আর ডিজিটাল যন্ত্রপাতি।
গোলকের দেয়াল আধা ইঞ্চি পুরু বোরোসিলিকেট কাচের। সেটা ৭০ মেগাপাস্কাল চাপ পর্যন্ত সইতে পারে। কুয়োর পানি জমার সময় চাপ ওঠে প্রায় ৪০০ বায়ুমণ্ডলে। আকারটা গোল বলে বাইরের চাপ সমানভাবে ছড়িয়ে যায়, কোথাও জমে না। আর আলো-সংবেদী টিউব কাচের গায়ে লাগানো হয়েছে স্বচ্ছ জেল দিয়ে, যাতে আলো ঠিকঠাক ভেতরে ঢোকে।
নকশাটা কাজে দিয়েছে। একটা গবেষণাপত্র অনুযায়ী পূর্ণ কাজ শুরুর পর প্রথম কয়েক বছরে বিকল হয়েছিল মাত্র ৬টা সেন্সর। আইসকিউব আজও পূর্ণ গতিতে কাজ করছে।
এখন চলছে ‘আপগ্রেড’, আসছে জেন২
২০২৬ সালে আইসকিউব আপগ্রেডের কাজ শেষ হয়েছে। বসানো হয়েছে ৫টা নতুন তার, তাতে ৬০০-র বেশি নতুন সেন্সর ও ক্যালিব্রেশন যন্ত্র। মোট কুয়ো এখন ৯১টা। নতুন সেন্সরে কম শক্তির নিউট্রিনো আরও ভালো মাপা যাবে।
আরও বড় পরিকল্পনা আইসকিউব-জেন২। প্রস্তাবিত নকশায় থাকবে ৮ ঘনকিলোমিটার বরফ, প্রায় ১০ হাজার সেন্সর আর ৫০০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে ছড়ানো রেডিও অ্যান্টেনা। বর্তমানে আইসকিউব কাজ করছে ১ ঘনকিলোমিটার বরফ নিয়ে। অতি-উচ্চশক্তির নিউট্রিনো বরফে ধাক্কা খেয়ে রেডিও তরঙ্গ ছড়ায়। অ্যান্টেনাগুলো সেটাই ধরবে। জেন২ এখনো পরিকল্পনার পর্যায়ে। হালজেনের অর্থ জোগাড়ের রসিকতাটা তাই খুব হালকা কথা নয়।
নতুন এক জানালা
সাধারণ টেলিস্কোপে আমরা মহাকাশের বাইরের রূপ দেখি। নিউট্রিনো আসে ব্ল্যাকহোলের গভীর থেকে, সোজা আমাদের কাছে। আইসকিউব সেই বার্তা পড়তে শিখিয়েছে। নোবেল এল সেই শেখারই স্বীকৃতি হিসেবে।


