প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
ভোররাতে এক বন্ধুকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন ভালো বোধ করছেন না। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই থেমে গেল ভারতীয় সিনেমার অন্যতম স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর নানা পাটেকরের জীবন। বৃহস্পতিবার গোয়ার ডোনা পাওলার বাসায় অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় তাঁকে। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় সিপিআর দিয়েও বাঁচানো যায়নি ৭৫ বছর বয়সী এই অভিনেতাকে। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হয়েছে; চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, তিনি হৃদ্যন্ত্রের গুরুতর সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।
ভারতীয় সিনেমায় নানা পাটেকর এমন একজন অভিনেতা, যাঁকে শুধু পর্দায় উপস্থিত থাকলেই আলাদা করে চেনা যেত। সংলাপ বলার নিজস্ব ছন্দ, চাপা রাগ, বিস্ফোরক আবেগ, চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সব মিলিয়ে তাঁর অভিনয়ের একটি স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি হয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন অভিনেতা, পরিচালক, লেখক এবং সমাজকর্মী।
নানা পাটেকরের জন্ম ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে। তাঁর আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। অভিনয়জীবনের শুরু থিয়েটারে। সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রে আসেন তিনি। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী প্রায় পাঁচ দশকে হিন্দি ও মারাঠি দুই ভাষার সিনেমাতেই নিজস্ব জায়গা তৈরি করেন তিনি।
‘পরিন্দা’ বদলে দেয় পরিচয়
আশির দশকের শেষভাগে নানা পাটেকরের ক্যারিয়ারে বড় মোড় আসে। মীরা নায়ারের ‘সালাম বোম্বে!’ তাঁকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও পরিচিত করে তোলে। এরপর ১৯৮৯ সালের ‘পরিন্দা’য় তাঁর অভিনয় তাঁকে ভারতীয় সিনেমার প্রথম সারির শক্তিশালী চরিত্রাভিনেতাদের একজন করে দেয়।
‘পরিন্দা’য় আন্না চরিত্রে তাঁর ভয়ংকর অথচ জটিল উপস্থিতি ব্যাপক প্রশংসা পায়। এই ছবির জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।
সেখান থেকে নব্বইয়ের দশকে একের পর এক স্মরণীয় চরিত্র আসে তাঁর হাতে। ‘অঙ্গার’, ‘তিরঙ্গা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ প্রতিটি ছবিতেই কখনো ক্রুদ্ধ, কখনো ভঙ্গুর, কখনো নির্মম, কখনো গভীর মানবিক চরিত্রে নিজেকে ভেঙেছেন তিনি।
১৯৯৪ সালের ‘ক্রান্তিবীর’ নানা পাটেকরের ক্যারিয়ারের আরেকটি মাইলফলক। ছবিটির জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেতার সম্মান পান। পরে ‘অগ্নিসাক্ষী’র জন্য আবারও সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন। সব মিলিয়ে তাঁর ঝুলিতে ছিল তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
অভিনেতার পাশাপাশি পরিচালক
অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনাতেও হাত দিয়েছিলেন নানা পাটেকর। ১৯৯১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ পরিচালনা করেন তিনি নিজেই। ছবিটিতে তিনি একজন কঠোর সেনা কর্মকর্তার চরিত্রেও অভিনয় করেন।
‘প্রহার’-এর প্রস্তুতির সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রির সঙ্গে দীর্ঘ সময় প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন নানা। সামরিক জীবনকে বাস্তবসম্মতভাবে বুঝতে এই প্রস্তুতি তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
সেনাবাহিনীর সঙ্গে সেই সম্পর্ক পর্দার বাইরেও ছিল। নানা পরে জানিয়েছিলেন, ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় বিশেষ অনুমতি নিয়ে তিনি সেনাদের সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় সময় কাটিয়েছিলেন এবং কুইক রিঅ্যাকশন টিমের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
‘আব তক ছাপ্পান’ থেকে ‘ওয়েলকাম’
নব্বইয়ের দশকের পরও নানা পাটেকরের অভিনয়ের ধার কমেনি। ২০০০-এর দশকে ‘শক্তি: দ্য পাওয়ার’, ‘আব তক ছাপ্পান’, ‘অপহরণ’ ও ‘ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১’-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় আবারও সমালোচকদের নজর কাড়ে।
বিশেষ করে ‘আব তক ছাপ্পান’-এ এনকাউন্টার বিশেষজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা সাধু আগাশে চরিত্রে তাঁর সংযত অভিনয় প্রশংসিত হয়। আর ‘অপহরণ’-এ নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান তিনি।
তবে নানা যে শুধু কঠোর বা অন্ধকার চরিত্রেই সফল ছিলেন, তা নয়। ২০০৭ সালের ‘ওয়েলকাম’-এ গ্যাংস্টার উদয় শেঠির চরিত্রে তাঁর কমেডি নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। পরে ‘ওয়েলকাম ব্যাক’-এও একই চরিত্রে ফিরে আসেন তিনি।
‘রাজনীতি’ ছবিতে রাজনৈতিক চরিত্র, আবার মারাঠি সিনেমায় ‘ড. প্রকাশ বাবা আমটে: দ্য রিয়েল হিরো’, ‘নটসম্রাট’ ও ‘আপলা মানুষ’-এর মতো ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নিজের অভিনয়জীবনের নতুন অধ্যায় তৈরি করেন নানা।
মারাঠি চলচ্চিত্র ‘নটসম্রাট’-এ একজন বৃদ্ধ মঞ্চ অভিনেতার চরিত্রে নানা পাটেকরের অভিনয় বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছিল। বয়স, স্মৃতি, পরিবার, শিল্পীর নিঃসঙ্গতা ও আত্মমর্যাদার সংঘাত সবকিছুকে একসঙ্গে ধারণ করেছিলেন তিনি।
এই চরিত্রের মাধ্যমে অনেক দর্শকের কাছে প্রমাণ করেছিলেন, তাঁর অভিনয়ের শক্তি শুধু উচ্চস্বরে সংলাপ কিংবা ক্রোধে নয়; নিঃশব্দ ভাঙন ও অসহায়তাও তিনি সমান শক্তিতে ফুটিয়ে তুলতে পারেন।
চলচ্চিত্রে দীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পাশাপাশি তিনি একাধিক ফিল্মফেয়ারসহ বিভিন্ন পুরস্কারও পেয়েছেন।
পর্দার বাইরেও কৃষকদের পাশে
নানা পাটেকরের পরিচয় শুধু সিনেমায় সীমাবদ্ধ ছিল না। মহারাষ্ট্রের খরা ও কৃষক আত্মহত্যার সংকট তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
২০১৫ সালে অভিনেতা মকরন্দ আনাসপুরের সঙ্গে তিনি ‘নাম ফাউন্ডেশন’ গড়ে তোলেন। খরাপ্রবণ অঞ্চলগুলোর কৃষক পরিবারকে সহায়তা, পানি সংরক্ষণ, গ্রামীণ অবকাঠামো পুনর্গঠন ও কৃষকদের জীবিকা উন্নয়নে কাজ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
অভিনেতা হিসেবে খ্যাতির বাইরে সাধারণ জীবনযাপন ও সামাজিক কাজে তাঁর সক্রিয়তার কথাও বারবার আলোচনায় এসেছে। কৃষক পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি গ্রাম ও পানিসংকটকবলিত এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
শেষ সময় পর্যন্ত অভিনয়ে
বয়স বাড়লেও অভিনয় থেকে পুরোপুরি সরে যাননি নানা পাটেকর। জীবনের শেষ দিকেও বিভিন্ন হিন্দি ও মারাঠি ছবিতে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি কোনো চরিত্রকে শুধু ‘নায়ক’ বা ‘খলনায়ক’-এর সহজ সংজ্ঞার মধ্যে রাখতেন না।
পর্দায় তাঁর চরিত্রগুলো প্রায়ই রাগী, নৈতিকভাবে দ্বিধাগ্রস্ত, ত্রুটিপূর্ণ কিন্তু গভীর মানবিক ছিল। সেই কারণেই নানা পাটেকরের সংলাপ বা দৃশ্য কেবল জনপ্রিয় হয়নি, অনেক ক্ষেত্রে চরিত্রের বাইরেও সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে।
তাঁর মৃত্যুর পর ভারতের চলচ্চিত্র ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বহু মানুষ শোক জানিয়েছেন। অভিনেতা অক্ষয় কুমার থেকে শুরু করে বিভিন্ন সহকর্মী তাঁর অভিনয়ের স্বাতন্ত্র্য, সততা ও দীর্ঘ প্রভাবের কথা স্মরণ করেছেন।
পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারে নানা পাটেকর বারবার নিজেকে বদলেছেন, কিন্তু একটি বিষয় বদলায়নি পর্দায় তাঁর উপস্থিতির তীব্রতা। কখনো গ্যাংস্টার, কখনো পুলিশ কর্মকর্তা, কখনো রাজনীতিক, কখনো সেনা কর্মকর্তা, আবার কখনো বৃদ্ধ মঞ্চশিল্পী প্রতিটি চরিত্রে তিনি রেখে গেছেন নিজের আলাদা ছাপ।
ভোররাতে বন্ধুকে পাঠানো অসুস্থতার ছোট্ট বার্তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে গেল সেই দীর্ঘ যাত্রা। রয়ে গেল তাঁর সংলাপ, চরিত্র, পুরস্কার, সমাজের জন্য কাজ এবং ভারতীয় সিনেমায় এক সহজে অনুকরণ না করা অভিনয়ভাষা।

