প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৪ এএম
রহস্যময় ‘যন্তর মন্তর’: যেখানে সময় থমকে থাকে না
এই সেই বিখ্যাত সম্রাট ইয়ন্ত্র। ছবিঃ সংগৃহীত
বাংলাবাজার পত্রিকা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬। ০৫:০৯ পিএম
আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২৬। ১৮:১৫ পিএম
সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত 'হীরক রাজার দেশে' সিনেমার কথা মনে আছে? অত্যাচারী রাজার আদেশে যেখানে বিদ্রোহীদের পাঠানো হতো ‘যন্তর মন্তর’ কক্ষে, আর তাদের মগজ ধোলাই করে মুখস্থ করানো হতো— “যাবে যদি যাক প্রাণ, হীরকের রাজা ভগবান!”
তবে না, কোন বৈজ্ঞানিকের তৈরি সেই মগজ ধোলাইয়ের কারখানার কথা এখানে হচ্ছে না। বাস্তবের ‘যন্তর মন্তর’ হলো এক বিশাল মানমন্দির, যেখানে রয়েছে এক নিখুঁত সূর্যঘড়ি। পৃথিবীর অক্ষের সাথে অতিভুজীয় সমান্তরালে তৈরি এই ঘড়িটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দিনরাতের একদম সঠিক সময় জানান দিয়ে আসছে।
ভারতে ছড়িয়ে থাকা পাঁচটি জ্যোতির্বিজ্ঞান কেন্দ্র

নয়াদিল্লীর যন্তর মন্তর। ছবি : সংগৃহীত
সমগ্র ভারতজুড়ে মোট পাঁচটি যন্তর মন্তর রয়েছে— জয়পুর, নয়া দিল্লি, উজ্জয়িনী, মথুরা এবং বারাণসীতে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও বিস্ময়কর মানমন্দিরটি রাজস্থানের জয়পুরে অবস্থিত। জয়পুরের এই মানমন্দিরে ২০টিরও বেশি পর্যবেক্ষণ যন্ত্র বা স্থাপত্য রয়েছে। যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় সূর্যঘড়িটি, যা ‘বৃহৎ সম্রাট যন্ত্র’ নামে পরিচিত। সময় নিরূপণের ক্ষেত্রে এই ঘড়িটি মাত্র দুই সেকেন্ডের বেশি হেরফের করে না! চমৎকার এই স্থাপত্যরীতির কারণে ইউনেস্কো একে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ বা বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে।

জয়পুরের যন্তর মন্তর এর অভ্যন্তরীণ দৃশ্য ।
আধুনিকতা ও বিজ্ঞানের এক অপূর্ব মেলবন্ধন
প্রতি বছর অজস্র পর্যটক ভারতের এই যন্তর মন্তর মানমন্দিরগুলো দেখতে আসেন। বিশেষ করে জয়পুর ও নয়া দিল্লির কেন্দ্রগুলোতে ভিড় থাকে সবচেয়ে বেশি। যারা জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত আধুনিক ও ডিজিটাল প্রযুক্তির যন্ত্রপাতিতে অভ্যস্ত, খোলা আকাশের নিচে পাথরের তৈরি এমন বিশালাকার স্থাপত্যকে মানমন্দির হিসেবে মেনে নেওয়া তাদের জন্য কিছুটা কঠিনই বটে।

এই মানমন্দিরটি ১৭৩৪ সালে রাজপুত রাজা মহারাজা সওয়াই জয় সিং নির্মাণ করেন। ভারতের ঐতিহাসিক মানমন্দিরগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে বড়।
কিন্তু সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ১৮ শতকের শুরুর দিকে (১৭২৪ থেকে ১৭৩৫ সালের মধ্যে) নির্মিত এই বিস্ময়কর স্থাপত্যগুলোর মূল গঠনে আজও কোনো পরিবর্তন আসেনি। ইউরোপে তখন সবেমাত্র দূরবীক্ষণ যন্ত্রসহ নানাবিধ আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। অথচ সেসব আধুনিক যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই নির্মিত এই মানমন্দিরগুলো প্রায় ৩০০ বছর ধরে গ্রহ-নক্ষত্র ও মহাকাশ সম্পর্কে নিখুঁত ও নির্ভুল তথ্য দিয়ে আসছে।
‘যন্তর মন্তর’ নামের নেপথ্যে ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য
রাজপুত শাসক মহারাজা দ্বিতীয় সওয়াই জয় সিং নির্মিত এই পাঁচটি মানমন্দিরের মধ্যে তিনটিই মূলত ‘যন্তর মন্তর’ নামে পরিচিত।
• যন্তর: সংস্কৃত শব্দ ‘যন্ত্র’ থেকে এসেছে, যার অর্থ 'যন্ত্রপাতি' বা 'সরঞ্জাম'।
• মন্তর: সংস্কৃত শব্দ ‘মন্ত্র’ থেকে এসেছে, যার অর্থ 'সূত্র' বা 'গণনা'।

চক্র ইয়ন্ত্র
সহজে মনে রাখা যায় এবং শুনতে ছন্দময় লাগে বলেই এই মানমন্দিরগুলোর নাম রাখা হয়েছিল ‘যন্তর মন্তর’। প্রায় ২০০ বছর আগে এই নামকরণের রহস্য উন্মোচিত হয় ১৮০৩ সালে উদ্ধার হওয়া একটি পোড়ামাটির ফলক থেকে।
জ্ঞানের আলো ও বিজ্ঞানের জয়যাত্রা
রাজপুত রাজা জয় সিং এমন এক যুগে বাস করতেন, যখন সামাজিক অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামি মানুষের চিন্তাভাবনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। সেই কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের প্রগাঢ় জ্ঞানপিপাসা ও দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রেখে তৈরি করেছিলেন এই কালজয়ী ‘যন্তর মন্তর’।

যন্তর মন্তরের অভ্যন্তরীণ নকশা
প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের এই ব্যবধান দূর করে ভারতীয় subcontinent বা উপমহাদেশে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারে মহারাজা জয় সিং যে অদম্য উদ্যোগ দেখিয়েছিলেন, তা নিঃসন্দেহে পুরো বিশ্বের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। আর তাই ‘যন্তর মন্তর’ কেবল কোনো নিছক পাথরের ভাস্কর্য বা প্রাচীন স্থাপত্য নয়; বরং একজন মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও বৈজ্ঞানিক ভাবনা বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রাকে কতটা উঁচুতে নিয়ে যেতে পারে—এটি তারই এক অনন্য ঐতিহাসিক নিদর্শন।
