প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০২:১৪ পিএম
আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ১৯:৫৭ পিএম
নরেন্দ্র মোদি, শি চিনপিং ও ভ্লাদিমির পুতিনের হাসিমুখে পরস্পরের হাত চেপে ধরে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি ব্রিকসের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তবে সম্মেলনের ফাঁকে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের আরেকটি ছবি জোটটির কূটনৈতিক সক্ষমতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
কীভাবে শক্তিশালী হলো ব্রিকস
২০০৬ সালে জি-২০ সম্মেলনের ফাঁকে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে ‘ব্রিক’ জোটের যাত্রা শুরু হয়। পরে দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত হলে এর নাম হয় ব্রিকস।
এরপর ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, ইথিওপিয়া, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া যুক্ত হওয়ায় সদস্যসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১-তে। পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর প্রভাব বাড়ানোই জোটটির অন্যতম লক্ষ্য।
তবে নেটো বা জি৭-এর মতো ব্রিকসের নির্দিষ্ট কোনো আদর্শিক ভিত্তি নেই। ফলে সদস্য দেশগুলোর জাতীয় স্বার্থের পার্থক্য এবং পরস্পরবিরোধী অবস্থান প্রায়ই জোটটির সামনে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের নেতারা। ছবি: ফেসবুকের সৌজন্যে
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে বিভাজন
পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাত ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে আরও সামনে এনেছে। ইরান একদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউজের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক চিতিগ বাজপেয়ির মতে, ব্রিকসের ভেতরে স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। ভারত ও ব্রাজিল জোটটিকে মূলত অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখতে চায়। বিপরীতে রাশিয়া ও চীন এটিকে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারে আগ্রহী।
মোদির বড় কূটনৈতিক সাফল্য
এই মতপার্থক্যের মধ্যেও ১৪০ দফার একটি সর্বসম্মত যৌথ ঘোষণা অনুমোদন করাতে সক্ষম হয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে এটি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও সম্মেলন থেকে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছেন। যৌথ ঘোষণায় আফ্রিকার ৫০টির বেশি দেশের জন্য চীনের শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধার বিষয়টি স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শির বৈঠকের কয়েক দিন আগে গ্লোবাল সাউথে চীনের বাণিজ্যিক নেতৃত্ব আরও দৃঢ় করার এই সুযোগকে বেইজিংয়ের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পুতিনের পশ্চিমবিরোধী বার্তা
ব্রিকস বিজনেস ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিশ্ব অর্থনীতিতে পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের আরোপ করা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।
ফোরামে উপস্থিতদের করতালি ও উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করার পশ্চিমা প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতাকেও সামনে এনেছে।
অন্যদিকে একই অনুষ্ঠানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামোয় হামলার অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
ইরান-আমিরাত বৈঠকে নতুন বার্তা
তবে এবারের ব্রিকস সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মুহূর্ত ছিল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদের বৈঠক।
পশ্চিম এশিয়ায় ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর এটিই ছিল দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রথম আলোচনা। সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক সূচিতে না থাকলেও বৈঠকটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
আলোচনাটি তুলনামূলক শীতল পরিবেশে হলেও এর পর ব্রিকসের যৌথ ঘোষণায় পশ্চিম এশিয়ায় ‘সর্বোচ্চ সংযম’ বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়।
ভিন্নমতের দেশগুলোকে এক টেবিলে আনার শক্তি
গবেষক চিতিগ বাজপেয়ির মতে, ব্রিকসের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ভিন্নমুখী অবস্থানের দেশগুলোকে একই টেবিলে বসানোর সক্ষমতা। জোটটির কঠোর ও বাধ্যতামূলক কাঠামো না থাকায় জাতীয় স্বার্থে দ্বন্দ্ব থাকা দেশগুলোর পক্ষেও একই প্ল্যাটফর্মে আলোচনা করা সম্ভব হয়।
এর ফলে সদস্য ও অংশীদার দেশগুলো নিজেদের অভিন্ন স্বার্থের জায়গাগুলো চিহ্নিত করার সুযোগ পায়। পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা যখন নতুন করে বাড়ছে, তখন এমন একটি মঞ্চে সীমিত হলেও কোনো ঐকমত্য তৈরি হওয়াকে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এবারের ব্রিকস সম্মেলন শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার মঞ্চ হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংঘাত নিয়ে আলোচনার একটি ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে জোটটির অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে। সূত্র: এবিসি নিউজ



