প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৯ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৪:৩২ পিএম
আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ২০:১০ পিএম
নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামকে নিয়োগ দিতে চায় ঢাকা। তবে প্রস্তাব পাঠানোর এক মাসেরও বেশি সময় পার হলেও এখনো ভারতের সম্মতি মেলেনি। দুই দেশের সম্পর্কে চলমান টানাপড়েনের মধ্যেই এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়া আটকে আছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট।
বাংলাদেশ গত জুলাইয়ে বিভিন্ন দেশে নতুন হাইকমিশনার ও রাষ্ট্রদূত নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করে। এর অংশ হিসেবে দিল্লিতে সিয়ামকে পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে পাঠাতে এক মাসেরও বেশি সময় আগে ভারতের কাছে সম্মতি চাওয়া হয়।
কূটনৈতিক রীতি অনুযায়ী, কাউকে অন্য দেশে রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট স্বাগতিক দেশের সম্মতি বা ‘অ্যাগ্রিমঁ’ নিতে হয়।
ভারত এখনো সেই সম্মতি না দেওয়ায় সিয়ামের নিয়োগ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে পারছে না বাংলাদেশ।
বর্তমানে ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ। আগামী অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে জেনেভায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর নতুন দায়িত্ব নেওয়ার কথা রয়েছে।
ফলে ভারতের সম্মতি না আসা পর্যন্ত নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টিও অনিশ্চিত থাকছে।
সম্মতি না দেওয়ার কারণ জানাতে বাধ্য নয় ভারত
কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো দেশ অন্য রাষ্ট্রে মিশনপ্রধান হিসেবে যাকে পাঠাতে চায়, তার জন্য আগেই স্বাগতিক দেশের সম্মতি নিতে হয়।
তবে প্রস্তাবিত ব্যক্তিকে গ্রহণ না করলে সেই সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা স্বাগতিক রাষ্ট্রের নেই।
এ ধরনের নিয়োগ নিয়ে প্রকাশ্য কূটনৈতিক বিরোধ এড়াতে সাধারণত পুরো প্রক্রিয়াটি গোপন রাখা হয়।
বর্তমানে পররাষ্ট্র সচিব সিয়াম
আসাদ আলম সিয়াম বর্তমানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকদের একজন।
গত বছর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব দেয়। এর আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেছেন।
প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন এক সময়ে সিয়ামকে দিল্লিতে পাঠানোর প্রক্রিয়া থমকে আছে, যখন ঢাকা ও নয়া দিল্লির রাজনৈতিক সম্পর্কে শীতলতা চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরও ঝুলে আছে
গত অগাস্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়।
গত সপ্তাহের শেষে নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস নেতাদের সম্মেলনেও তিনি অংশ নেননি। বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে তাঁকে সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
বাংলাদেশ ওই সম্মেলনে কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের বর্তমান হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহও সম্মেলনে অংশ নেননি।
ব্রিকস সম্মেলনের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্যও তারেক রহমানকে ভারত আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে সেই সফরের বিষয়টিও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি।
টানাপড়েনের মধ্যেও যোগাযোগ চলছে
রাজনৈতিক সম্পর্কে শীতলতা থাকলেও দুই দেশের সরকারি ও কারিগরি পর্যায়ের যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
গত সপ্তাহে ঢাকায় দুই দিনের আন্তঃসরকার রেলওয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে দুই দেশের রেল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আন্তঃসীমান্ত ট্রেন চলাচলসহ রেল যোগাযোগের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
তারেক রহমানের সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত সাত মাসে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি পর্যায়ের যোগাযোগও পুনরায় সক্রিয় করা হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক পর্যায়ের টানাপড়েন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সামগ্রিক গতিকে প্রভাবিত করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থানের বিষয়ও আলোচনায়
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের বিষয়টিও প্রভাব ফেলছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান এবং এখনো দিল্লিতে অবস্থান করছেন।
ঢাকার পক্ষ থেকে তাঁকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ করা হলেও দিল্লির পক্ষ থেকে তাতে সাড়া মেলেনি।
রাষ্ট্রীয় সফর নিয়ে আলোচনার মধ্যে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের বিষয়টিও দুই দেশের সম্পর্কের সমীকরণ আরও জটিল করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্পর্ক সচল রাখতে দুই পক্ষের চেষ্টা
টানাপড়েন সত্ত্বেও কূটনৈতিক যোগাযোগ ধরে রাখতে ঢাকা ও নয়া দিল্লি বিভিন্ন পথে কাজ করছে।
চলতি বছরের শুরুতে ভারত সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। জুনের শেষ দিকে তিনি দায়িত্ব নেন।
ভারত সরকার তাঁকে মন্ত্রীর মর্যাদায় দায়িত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে নয়া দিল্লি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে—এই নিয়োগকে তার একটি ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তারেক রহমানের সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কয়েক মাস দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা ইতিবাচক গতি তৈরি হলেও গত এক মাসে সেই অগ্রগতি আবার থমকে গেছে বলে প্রতিবেদনের ভাষ্য।
নয়া দিল্লির প্রত্যাশা ছিল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর দুই দেশের সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার পথে বড় ভূমিকা রাখবে। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা এগোনোর সময় বারবার নতুন জটিলতা সামনে আসছে।
এর মধ্যেই আসাদ আলম সিয়ামকে দিল্লিতে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব ভারতের সম্মতির অপেক্ষায় রয়েছে।






