Logo
Logo
×
কারাবন্দি ইমরান খানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিচ্ছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, তার দুই ছেলে কাসিম ও সুলাইমান এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। গ্রাফিক্স: বাংলাবাজার

খবর ।  বিদেশ

দুই ছেলের গুরুতর অভিযোগ

কারাবন্দি ইমরান খানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিচ্ছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৮:৫২ পিএম

কারাবন্দি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা’ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর দুই ছেলে কাসিম খান ও সুলাইমান খান। একই সঙ্গে তাঁদের আশঙ্কা, কারাগারে ইমরানকে ‘ধীরে ধীরে মেরে ফেলার চেষ্টা’ করা হচ্ছে।

ইমরানের কারাবাসের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ বাড়ার মধ্যেই এমন অভিযোগ তুলেছেন ২৭ বছর বয়সী কাসিম ও ২৯ বছর বয়সী সুলাইমান।

২০২৩ সালে গ্রেপ্তারের পর থেকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি আছেন ইমরান খান। দুর্নীতির মামলায় তিনি ১৪ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

ইমরানের দুই ছেলে জানিয়েছেন, ছয় মাসের বেশি সময় ধরে তাঁরা বাবার সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। তাঁর মুক্তির দাবিতে প্রচার চালাতে যুক্তরাজ্য থেকে পাকিস্তানে যাওয়ার চেষ্টাও তাঁরা করেছেন, কিন্তু সেটিও সম্ভব হয়নি।

চিকিৎসা ও সাক্ষাৎ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি

বুধবার পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে এমন একটি মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে—সরকার আদালতের নির্দেশ অমান্য করে ইমরানকে চোখের সমস্যার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ দেয়নি। পাশাপাশি ছয় মাসের বেশি সময় ধরে তাঁর পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎ ও ফোনে কথা বলার সুযোগও দেওয়া হয়নি।

ইমরানকে কারাগারে একাকী রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁর সেলের আয়তন মাত্র ছয় বাই আট ফুট বলে দাবি করেছেন পরিবারের সদস্যরা।

লন্ডন থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দুই ভাই বলেন, বাবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে তাঁরা ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’। তাঁদের ভাষ্য, কারাগারে যেভাবে ইমরানকে রাখা হয়েছে, তা ‘মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের’ শামিল।

সুলাইমান বলেন, তাঁর বাবা একটি ছোট সেলে মানবিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। কয়েক মাস ধরে তাঁকে নতুন বই দেওয়া হয়নি, পরিবারের সদস্য বা স্বাধীন চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা বা কথা বলার সুযোগও নেই।

তাঁর দাবি, ইমরানের চোখের একটি সমস্যা দীর্ঘদিন চিকিৎসা না পাওয়ায় ডান চোখের দৃষ্টিশক্তির বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

টিভি সাক্ষাৎকার নিয়ে আপত্তি, পাকিস্তান দলেরও প্রতিবাদ

গত মাসের শেষ দিকে ইংল্যান্ড-পাকিস্তান টেস্ট ম্যাচের সম্প্রচারের সময় ইমরানের দুই ছেলের একটি সাক্ষাৎকার দেখানো হয়। এরপর পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানায়।

এক পর্যায়ে পাকিস্তান ক্রিকেট দলও মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর মাঠে না ফেরার হুমকি দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সুলাইমানের অভিযোগ, ঘটনাটি দেখিয়েছে পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে দেশের ভেতরের মতো নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল।

জাতিসংঘেরও উদ্বেগ

ইমরান খানের দীর্ঘদিনের বন্দিত্ব আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে বলে এর আগে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

জাতিসংঘের নির্যাতনবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদকও মন্তব্য করেছেন, ইমরানকে দীর্ঘদিন একাকী আটকে রাখা এবং তাঁর কারাবাসের পরিস্থিতি মানসিক নির্যাতনের পর্যায়ে পড়তে পারে।

সুলাইমান জানিয়েছেন, পরিবারকে বলা হয়েছে, ৭৩ বছর বয়সী ইমরানের উচ্চ রক্তচাপও ধরা পড়েছে।

তিনি বলেন, তাঁদের সবচেয়ে বড় চাওয়া এখন বাবার সঙ্গে কথা বলা এবং তিনি কেমন আছেন, সেটি নিশ্চিত হওয়া।

আসিম মুনিরের বিরুদ্ধে ‘ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার’ অভিযোগ

ইমরানের দুই ছেলে বিশেষভাবে অভিযোগ করেছেন, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনী ও সেনাবাহিনীর প্রধান আসিম মুনির ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকেই তাঁদের বাবার প্রতি কঠোর আচরণ করছেন।

ইমরান প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় আসিম মুনিরকে পদাবনতি দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিল না বলেও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।

মুনির ২০২৩ সালে সেনাপ্রধান হওয়ার পর ইমরানের বিরুদ্ধে চাপ ও দমন আরও বেড়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁর ছেলেরা।

সুলাইমান বলেন, তাঁদের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট যে ব্যক্তিগত বিরোধের কারণেই ইমরানের প্রতি এত কঠোর আচরণ করা হচ্ছে এবং এর পেছনে আসিম মুনিরের নির্দেশ রয়েছে।

গত এক বছরে আসিম মুনিরের ক্ষমতা আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্প তাঁকে এক সময় নিজের ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলেও উল্লেখ করেন।

ডান চোখের ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি ক্ষতির আশঙ্কা

গত মাসে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন, ইমরানকে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে তাঁর চোখের চিকিৎসা করাতে হবে।

তাঁর রেটিনার শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা ধরা পড়ে। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না পাওয়ায় ডান চোখের প্রায় ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে তাঁকে বেসরকারি হাসপাতালে না নিয়ে অল্প সময়ের জন্য একটি সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কয়েকটি ইনজেকশন দেওয়ার পর তাঁকে আবার কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়।

এ ঘটনায় তাঁর পরিবার ও রাজনৈতিক দল তীব্র ক্ষোভ জানায়।

কাসিম বলেন, নিরপেক্ষ কোনো চিকিৎসকের কাছ থেকে এখনো তাঁর বাবার প্রকৃত শারীরিক অবস্থার বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায়নি।

তিনি অভিযোগ করেন, চাপ কমে গেলে তাঁর বাবার ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে এবং তাঁকে ‘শেষ করে দেওয়ার’ চেষ্টা করা হতে পারে।

সরকারের প্রত্যাখ্যান

ইমরানের পরিবার ও সমর্থকদের এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তান সরকার।

সরকারের ভাষ্য, ইমরানকে যথাযথ পরিবেশে রাখা হয়েছে। তাঁকে ঘরে রান্না করা খাবার, বাদাম, বোতলজাত পানি, ব্যায়ামের সরঞ্জাম, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং নিয়মিত চিকিৎসা পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

সরকার বলেছে, ইমরানকে শাস্তিমূলক একাকী বন্দিত্বে রাখা, নির্যাতন করা কিংবা মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন প্রচারণা’।

সেনাবাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতায়, পরে সম্পর্কের অবনতি

২০১৮ সালে ইমরান খান ক্ষমতায় আসার সময় পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সমর্থন পেয়েছিলেন বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়।

ক্ষমতায় এসে তিনি ‘নয়া পাকিস্তান’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন, যেখানে দুর্নীতি বন্ধ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল।

তবে তাঁর শাসনামলেও দুর্নীতি, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের অভিযোগ ওঠে।

২০২২ সালে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির পর ক্ষমতা হারান ইমরান। এরপর তিনি রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি জোরালো করেন।

২০২৩ সালের দিকে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ আরও তীব্র হওয়ার পর ইমরানের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়।

দুর্নীতি ও রাষ্ট্রদ্রোহসহ শতাধিক মামলায় তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ইমরানের দাবি, তাঁকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই এসব মামলা সাজানো হয়েছে।

কারাবন্দি থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানে তাঁর জনপ্রিয়তা এখনো রয়েছে।

কাসিম বলেন, তাঁর বাবাকে জনজীবন থেকে সরিয়ে দিতে এবং মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

পাকিস্তানে যেতে পারছেন না দুই ছেলে

ইমরানের দুই ছেলে জানিয়েছেন, পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য নয় মাসেরও বেশি আগে ভিসার আবেদন করলেও এখনো তা মঞ্জুর হয়নি।

তবে তাঁরা স্পষ্ট করেছেন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে যুক্ত হওয়া বা বাবার অনুপস্থিতিতে তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের নেতৃত্ব নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাঁদের নেই।

সুলাইমান বলেন, পাকিস্তানের রাজনীতির বড় সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে পারিবারিক উত্তরাধিকারভিত্তিক রাজনীতি—এ কথা তাঁদের বাবা সব সময়ই বলতেন। গত চার দশকে দুটি পরিবারের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকাকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতা হিসেবেই দেখেন তাঁরা।

মুক্তির জন্য সমঝোতা করবেন কি ইমরান?

ইমরান খান সেনাবাহিনীর সঙ্গে কোনো সমঝোতায় গিয়ে মুক্তি পেতে পারেন কি না, তা নিয়েও পাকিস্তানে আলোচনা চলছে।

তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী জুলফি বুখারির ভাষ্য, ইমরান কেবল এমন সমঝোতা মেনে নেবেন, যেখানে গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং জনগণের নির্বাচনী ম্যান্ডেট পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

ইমরানের দুই ছেলেও মনে করেন না, মুক্তির বিনিময়ে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দিতে রাজি হবেন।

কাসিম বলেন, তাঁর বাবা অত্যন্ত একরোখা ও লক্ষ্যনিষ্ঠ মানুষ। নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

আরও পড়ুন

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে