প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের ধারাবাহিক কর্মসূচি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ঘিরে রাজনৈতিক চাপ এবং আওয়ামী লীগের তৎপরতা নিয়ে দলীয় উদ্বেগের মধ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়াচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দলীয় সূত্রের ভাষ্য, রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় মাঠের উপস্থিতি বাড়ানোর পাশাপাশি জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নেতাদেরও আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিএনপিও সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যক্রম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতার ভাষ্য, অর্থনৈতিক চাপ ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি দলটির জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এর আগেই জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ কয়েকটি বিরোধী দল বিভিন্ন দাবিতে কর্মসূচি পালন করছিল। জ্বালানির দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পর সেই আন্দোলনে নতুন ইস্যু যুক্ত হয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল ১৩৫, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে।
দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে জামায়াত, এনসিপি, খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে। তাদের বক্তব্য, জ্বালানির বাড়তি ব্যয় পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও নিত্যপণ্যের খরচে প্রভাব ফেলবে।
এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তৎপরতা নিয়েও বিএনপির ভেতরে উদ্বেগ রয়েছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পেছনে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করছেন বিএনপি নেতারা। তবে এসব ঘটনার দায় নিয়ে বিএনপির বক্তব্য রাজনৈতিক অভিযোগ; সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ঘটনায় দলীয় সংশ্লিষ্টতা বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন দাবি করা হচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির ভাষ্য, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নানা চাপে সরকারের জনভাবমূর্তি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ মনে করছেন, এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পদ হয়ে আছে।
সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও মাঠের কর্মসূচি
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক দিনে বিএনপির বিক্ষোভ, সমাবেশ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম বেড়েছে। দলীয় সূত্রের দাবি, বিরোধীদের কর্মসূচির রাজনৈতিক জবাব দেওয়া, আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য তৎপরতার বিরুদ্ধে অবস্থান জানানো এবং নিজেদের বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এসব কার্যক্রমের লক্ষ্য।
এর আগেও দলের কেন্দ্রীয় বৈঠক থেকে নেতাকর্মীদের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী কর্মসূচি নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন ইউনিটকেও দলীয় কার্যালয় সক্রিয় রাখা ও সাংগঠনিক বৈঠক বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগের নেতাদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল বৈঠকও হয়েছে। সামনে ঢাকা বিভাগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব তৎপরতা থেকে বোঝা যাচ্ছে, সরকার পরিচালনার পাশাপাশি রাজনৈতিক মাঠেও দৃশ্যমান উপস্থিতি ধরে রাখাকে গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি।
বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচিও এর মধ্যে ধারাবাহিকভাবে চলছে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চ করে। পরে ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখেও একই ধরনের কর্মসূচি পালন করে জোটটি। তাদের দাবির মধ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বন্ধের বিষয় ছিল।
জোটের সমন্বয়ক এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ দাবি করেছেন, এসব কর্মসূচির কারণে সরকার মানুষের দাবির বিষয়ে চাপ অনুভব করছে। বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে এই বক্তব্য প্রকাশ্যে দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যেই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বিরোধীদের আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সরকার বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, পরিবহন ও বিমা খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশে মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান ও সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকির কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ মনে করছে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতিতে কিছু মূল্য সমন্বয় অনিবার্য হলেও একবারে বেশি দাম বাড়ানোর কারণে সাধারণ মানুষ ও শিল্পের ওপর চাপ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দ্রুত দেশীয় মূল্য সমন্বয়ের দাবিও উঠেছে।
‘চাপের কারণে নয়’, দাবি বিএনপির
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বিরোধীদের সমালোচনার জবাবে বলে আসছেন, দেশের জ্বালানি সংকট মূলত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বক্তব্য, বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচি বা রাজনৈতিক চাপের কারণে বিএনপি মাঠে নামছে না; বরং সরকারের বিরুদ্ধে যেসব বক্তব্যকে দলটি ‘বিভ্রান্তিকর’ মনে করছে, সেগুলোর রাজনৈতিক জবাব দেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য।
আওয়ামী লীগ পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে বলেও বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেছেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে দলটি নেতাকর্মীদের সতর্ক ও সক্রিয় থাকতে বলছে। বিএনপির আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক নির্দেশনাতেও দেশকে অস্থিতিশীল করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াত নেতাদের বক্তব্য, তাদের কর্মসূচি সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির উদ্দেশ্যে নয়; বরং জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্য ও জনদুর্ভোগের মতো ইস্যুতে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখাই বিরোধী দলের দায়িত্ব।
সব মিলিয়ে বিরোধীদের ধারাবাহিক আন্দোলন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে বিএনপি সাংগঠনিক ও মাঠের উপস্থিতি আরও বাড়াচ্ছে। দলটির নেতারা একে বিরোধীদের চাপে নেওয়া পদক্ষেপ হিসেবে দেখতে নারাজ; তাঁদের ভাষ্য, রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব দেওয়া এবং নিজেদের অবস্থান মানুষের কাছে তুলে ধরাই এই তৎপরতার মূল লক্ষ্য।





