Logo
Logo
×

অর্থনীতি ।  অর্থ ও ব্যাংকিং

খেলাপি ঠেকাতে একক ঋণসীমা, নজরদারিতে শীর্ষ খেলাপিরা

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬। ০২:১৬ পিএম

আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৬। ১৬:০৭ পিএম

খেলাপি ঠেকাতে একক ঋণসীমা, নজরদারিতে শীর্ষ খেলাপিরা

দেশের ব্যাংকিং খাত সংস্কারে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি বিস্তৃত রোডম্যাপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৩ দফার এই পরিকল্পনায় খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ, একক গ্রাহকের সর্বোচ্চ ঋণসীমা নির্ধারণ এবং আইনি সংস্কারসহ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপিত এ পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই খেলাপি হয়ে গেছে। চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট বকেয়া ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, তাদের সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে প্রতি প্রান্তিকে পর্যালোচনা সভা করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব বৈঠকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে আদায়ের অগ্রগতিও নিবিড়ভাবে তদারকি করা হবে।

পাশাপাশি উচ্চ খেলাপি ঋণগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণ আদায় কৌশলবিষয়ক গাইডলাইন জারি এবং ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার নির্দেশিকা হালনাগাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

মধ্যমেয়াদে, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি’ ভিত্তিক খেলাপি ঋণ ও প্রভিশনিং নীতিমালা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

আইনি জটিলতা ও প্রভাব পর্যালোচনা সাপেক্ষে সাধারণ ঋণখেলাপি এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করতে বিশেষ ভাতার নীতিমালা করা হবে। একই সঙ্গে ভালো ঋণগ্রহীতাদের প্রণোদনা দেওয়ার বিদ্যমান নীতিমালাও সংশোধন করা হবে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, পুরো ব্যাংকিং খাত থেকে একজন ঋণগ্রহীতা সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ নিতে পারবেন, তার একটি সীমা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে নেওয়া কিছু ব্যবস্থা সাধারণ খেলাপিদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যায় কি না, সে জন্য আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

খেলাপিরা যাতে রিট করে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া স্থবির করতে না পারেন, সে জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ১ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে ব্যাংকঋণের বদলে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি খাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তাও দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করেছে। এ ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি, সুশাসন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি প্রশমন সক্ষমতা মূল্যায়ন করে একটি সামগ্রিক ঝুঁকি রেটিং করা হবে।

একই সঙ্গে ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট ২০২৬’, অর্থঋণ আদালত আইনের সংশোধন, ১৯৯৭ সালের দেউলিয়া আইন প্রতিস্থাপন করে নতুন ইনসলভেন্সি ও ব্যাংক্রাপসি আইন এবং ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধনের কাজও এগোচ্ছে।

ব্যাংক খাতের আর্থিক চাপের চিত্রও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকার প্রভিশন রাখার কথা থাকলেও, তারা রাখতে পেরেছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকায়।

চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা ছিল ৭৮৯ কোটি টাকা, কিন্তু নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকায়। একই সময়ে রিটার্ন অন অ্যাসেটস ঋণাত্মক ১ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং রিটার্ন অন ইকুইটি ঋণাত্মক ৪৪ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে আসে।

গত বছরের ডিসেম্বরে ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ, যা চলতি বছরের মার্চে আরও কমে ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি ব্যাসেল-৩ মানদণ্ড অনুযায়ী ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশের তুলনায় অনেক নিচে। দেশের ৪০টি ব্যাংক ন্যূনতম মূলধন শর্ত পূরণ করতে পারলেও ১৫টি ব্যাংক তা পারেনি। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা সবচেয়ে নাজুক; তাদের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ঋণাত্মক ৪৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে ২২টি ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা। বিপুল খেলাপি ঋণ, তার বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন, মূলধন ঘাটতি ও দুর্বল সম্পদমানের কারণে এই লোকসান তৈরি হয়েছে। তালিকায় রয়েছে কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত, বেসরকারি ও একটি বিদেশি ব্যাংক।

সংকটে থাকা ১২টি ব্যাংককে গত ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৮৪ হাজার ৯৪৫ দশমিক ৭১ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সহায়তা পেয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকও বড় অঙ্কের সহায়তা পেয়েছে। বর্তমানে এসব ব্যাংক মূল ঋণ পরিশোধ করছে না; কেবল সুদ দিচ্ছে, আর মূল অর্থ ডিমান্ড লোন হিসেবে নবায়ন করা হচ্ছে।

তবে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংবিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ২ লাখ ৫৪ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকার সম্পদ রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে রয়েছে ৭ লাখ ৩ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা। ফলে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংক সংকটে থাকলেও সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য ঘাটতি নেই। তবে দুর্বল মূলধন, বিপুল খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি ও লোকসানের চাপ কাটাতে দ্রুত সংস্কার অপরিহার্য।

আরও পড়ুন

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে