প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম
৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ, ৭২ শতাংশই ১০ ব্যাংকে
ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণ বেড়েই চলেছ। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৮:০৫ পিএম
আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ২০:৪১ পিএম
দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের বড় অংশই কেন্দ্রীভূত রয়েছে মাত্র কয়েকটি ব্যাংকে। ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১০টি ব্যাংকে রয়েছে মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন শেষে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে ব্যাংকিং খাতের এ চিত্র উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে।
তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা
চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে জুন শেষে এই অঙ্ক বেড়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।
জুন শেষে খেলাপি ঋণের শীর্ষে থাকা ১০টি ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ পুরো ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই রয়েছে মাত্র ১০টি ব্যাংকে।
এতে বোঝা যাচ্ছে, দেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট সব ব্যাংকে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। বরং কয়েকটি ব্যাংকে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, প্রভাবশালী গ্রাহকদের ঋণ সুবিধা দেওয়া, ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারা এবং ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার কারণে পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে উঠেছে।
বড় ঋণগ্রহীতাদের ঋণে বাড়ছে ঝুঁকি
বিশেষ করে বড় করপোরেট ঋণের একটি অংশ বছরের পর বছর আদায় না হওয়ায় কয়েকটি ব্যাংকের সম্পদের মান দ্রুত অবনতি হয়েছে। অনেক ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন করা হলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলোর একটি অংশ আবার খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে।
ফলে কাগজে-কলমে ঋণের মান ধরে রাখার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি সংকট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
সম্পদের মানেও বড় অবনতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও ব্যাংকিং খাতের সম্পদের মানের বড় ধরনের অবনতির বিষয়টি উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০২৫’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে। এক বছর আগে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এ হার ছিল ২০ দশমিক ২০ শতাংশ।
এরপর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়েছে। জুন শেষে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর মূলধন, প্রভিশন সংরক্ষণ এবং মুনাফার ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
দুর্বল ব্যাংক সংস্কারে উদ্যোগ
খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ঋণ আদায় জোরদার, ঋণ ব্যবস্থাপনায় কঠোর তদারকি এবং ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাইয়ের মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
একই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার, একীভূতকরণ ও পুনর্গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় বাংলাদেশের চিত্র উদ্বেগজনক
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংকও। সংস্থাটির জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স, নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার মতো বিষয়গুলোকে ব্যাংকিং খাতের চাপের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ। বিপরীতে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় খেলাপি ঋণের হার ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশের মোট আর্থিক খাতের প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পদের প্রতিনিধিত্ব করে ব্যাংকিং খাত। ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতার প্রভাব শুধু ব্যাংক বা আমানতকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও পড়তে পারে।
খেলাপি ঋণে শীর্ষ ১০ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে গত জুনে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ ব্যাংকে ছিল ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশ।
সর্বোচ্চ ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংকে, যা তাদের মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের বড় অংশই সাইফুল আলম বা এস আলমের নামে, যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপে এ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন পর্যন্ত গ্রুপটির নেওয়া ঋণের বড় অংশই এখন খেলাপি।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংকে, যা তাদের দেওয়া মোট ঋণের ৭৫ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। ব্যাংকটির শীর্ষ খেলাপি হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ। এ ছাড়া এস আলম গ্রুপ ও এননটেক্সও বড় খেলাপি।
খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে একীভূত ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭৮ দশমিক ১৫ শতাংশ ও এক্সিম ব্যাংকের ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ ঋণ এখন খেলাপি। এসব ব্যাংকের বড় খেলাপিদের মধ্যে রয়েছে এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা, সিকদারসহ কয়েকটি গ্রুপ।
ন্যাশনাল ব্যাংকের ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংকের ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ ও এবি ব্যাংকের ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ ঋণ খেলাপি। এসব ব্যাংকের বড় খেলাপিদের মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো, উত্তরা গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বেঙ্গল গ্রুপ, মাইশা গ্রুপ, বিল্ডট্রেড গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, আশিয়ান সিটি, মাহিন গ্রুপ, আমান গ্রুপ, এরশাদ ব্রাদার্স ও মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
এ ছাড়া রাষ্ট্রমালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ ঋণ এখন খেলাপি। ব্যাংকটির শীর্ষ খেলাপিদের মধ্যে রয়েছে জজ ভূঁইয়া গ্রুপ, জাকিয়া গ্রুপ, মুহিব স্টিল অ্যান্ড শিপ রিসাইক্লিং, মুন গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
শুধু পুনঃতফসিল করে সংকট সমাধান সম্ভব নয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক বলেন, শুধু নতুন করে ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়।
তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী ঋণের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং দ্রুত ঋণ আদায়ের কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।
একই সঙ্গে নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই, ঋণের ব্যবহার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
অন্যথায় কয়েকটি ব্যাংকের চলমান সংকট ধীরে ধীরে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আরও বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।





