Logo
Logo
×
যুদ্ধের মধ্যেও ৩ শতাংশ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির আভাস দিল আইএমএফ

আইএমএফের লোগো। গ্রাফিক্স: বাংলাবাজার

অর্থনীতি ।  বিশ্ব অর্থনীতি

যুদ্ধের মধ্যেও ৩ শতাংশ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির আভাস দিল আইএমএফ

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৫:২৫ পিএম

আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ১৭:২৬ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও বিশ্ববাজারে জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দামের মধ্যেও চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রায় ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঝুঁকি এখনো উচ্চমাত্রায় রয়েছে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, সরকারি ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আইএমএফের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এসব ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

যুদ্ধের ধাক্কা সামলাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি

ওয়াশিংটনে আইএমএফের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির মুখপাত্র জুলি কোজাক বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে যুদ্ধ চললেও এখন পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতি প্রত্যাশার তুলনায় ভালোভাবেই ধাক্কাটি সামলেছে। তবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজার এখনো ঊর্ধ্বমুখী থাকায় যুদ্ধের কারণে তৈরি জ্বালানি সংকট পুরোপুরি কাটেনি।

যুদ্ধের শুরুতে বিভিন্ন দেশ নিজেদের জরুরি জ্বালানি মজুদ ও কৌশলগত তেল রিজার্ভ ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। পাশাপাশি অনেক দেশ বিকল্প জ্বালানি উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নেয়। এসব উদ্যোগ যুদ্ধের তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক অভিঘাত কিছুটা কমাতে সহায়তা করলেও সামগ্রিক বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে শ্লথ রয়েছে।

২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ

আইএমএফের জুলাইয়ে প্রকাশিত পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ হতে পারে। তবে এ হার ২০২৪ ও ২০২৫ সালের গড় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় কম।

চলতি বছরের প্রথমার্ধে আইএমএফ ধারণা করেছিল, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলা এবং ইয়েমেনে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধির ফলে সংঘাতের পরিধি বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ ও পণ্যের বাজারে।

জ্বালানি সংকট নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

বিশ্ব অর্থনীতির সামনে বর্তমানে দুটি বিপরীতমুখী চাপ কাজ করছে বলে মনে করছে আইএমএফ। একদিকে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে টান পড়ছে। এতে তেল, গ্যাস, সার ও খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে, যা বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করছে।

অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিকে ঘিরে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ ও চাহিদা তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তি খাতের এই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অন্যান্য খাতে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির একটি অংশ পুষিয়ে দিতে সহায়তা করছে।

তবে জ্বালানি বাজার নিয়ে আইএমএফের উদ্বেগ রয়েছে। অনেক দেশকে তাদের জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ পুনরায় পূরণ করতে হবে। একই সময়ে উত্তর গোলার্ধে শীত মৌসুম এগিয়ে আসায় জ্বালানির চাহিদাও বাড়তে পারে। ফলে আগামী কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

থমকে গেছে মূল্যস্ফীতি কমানোর গতি

মূল্যস্ফীতি নিয়েও সতর্ক করেছে আইএমএফ। ২০২২ সালের জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের পর বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা বর্তমানে অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে।

দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকার সম্ভাবনা থাকলেও স্বল্পমেয়াদে পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় ফের অস্থির হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে মূল্য স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

বাড়ছে সরকারি ঋণের চাপ

বিশ্ব অর্থনীতির আরেকটি বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে সরকারি ঋণ। আইএমএফের হিসাবে, বিশ্বব্যাপী সরকারি ঋণ এখন বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১০০ শতাংশের কাছাকাছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি এবং সামনে ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোয় জিডিপির তুলনায় সরকারি ঋণের হার দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে দ্বিপক্ষীয় বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ায় আফ্রিকাসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে তারল্য সংকট তীব্র হচ্ছে।

এ অবস্থায় মাঝারি মেয়াদে বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ঋণ কমানোর পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। তবে সংস্থাটির মতে, এর জন্য হঠাৎ করে বড় ধরনের ব্যয় সংকোচনের প্রয়োজন নেই। বরং ঘাটতি ও ঋণ কীভাবে ধীরে ধীরে কমানো হবে, সে বিষয়ে সরকারের একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকা জরুরি।

ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাবও নজরে

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাবও পর্যবেক্ষণ করছে আইএমএফ। এসব নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরানকে সহায়তা করা তৃতীয় কোনো দেশের প্রতিষ্ঠানও পড়তে পারে।

জুলি কোজাক জানিয়েছেন, এসব নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি বাজারে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে আইএমএফ। আগামী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে এ বিষয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন তুলে ধরা হতে পারে।

সামনে নতুন বৈশ্বিক পূর্বাভাস

এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অভিঘাত বিশ্ব অর্থনীতি আশঙ্কার তুলনায় ভালোভাবেই সামলালেও সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলে মনে করছে আইএমএফ। বিশেষ করে শীত মৌসুমে জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধি, উচ্চ সরকারি ঋণ, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক দুর্বলতা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে থাকছে।

আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সভায় বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন পূর্বাভাস প্রকাশ করতে পারে আইএমএফ। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি বাজার, মূল্যস্ফীতি ও ঋণের চাপ বিশ্ব অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলছে, তার আরও বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যেতে পারে।

আরও পড়ুন

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে