প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
বড় বাজেট ঘাটতির মুখে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলো, কী বলছে আইএমএফ
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬। ০২:০২ পিএম
আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৬। ১৩:০৯ পিএম
- শেয়ার
- Messenger
- Telegram
- Threads
যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ সরকারি খাতে নিট ঋণগ্রহণ চলতি বছর জিডিপির ৮ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাবে। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ
বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলোকে সরকারি অর্থব্যবস্থা পুনর্গঠনে ‘জরুরি’ পদক্ষেপ নিতে হবে, এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির নতুন পূর্বাভাস বলছে, চলতি বছর উন্নত অর্থনীতিগুলোর বাজেট ঘাটতি কোভিড-১৯ মহামারির ধসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে যাচ্ছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি বছর উন্নত অর্থনীতিগুলোর নিট ঋণগ্রহণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছাবে।
২০২১ সালের পর এটিই হবে সর্বোচ্চ হার। তৎকালীন সময় বিশ্বজুড়ে মহামারিজনিত লকডাউন চলছিল।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র; দুই দেশেরই বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৮ শতাংশে পৌঁছাবে বা তা ছাড়িয়ে যাবে। আইএমএফের এই হিসাব কিছু জাতীয় সূচকের তুলনায় সরকারি ঋণগ্রহণের আরও বিস্তৃত পরিসর অন্তর্ভুক্ত করে।
আইএমএফের এপ্রিলের প্রতিবেদনের তুলনায় নতুন পূর্বাভাসে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে কয়েক মাস ধরে বৈশ্বিক ঋণবাজারেও অস্থিরতা চলছে। সরকারি ঋণ দ্রুত বাড়া, মূল্যস্ফীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগের কারণে সরকারি বন্ডের সুদ বা রিটার্ন বেড়েছে।
আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ সিলভানা টেনরেইরো এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “বিশ্ব অর্থনীতি স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে, কিন্তু সেই স্থিতিস্থাপকতা এখন সীমার কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআইয়ে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তেলের ধাক্কা কিছুটা সামলে নিতে পেরেছে। তবে একই সময়ে সার্বভৌম ঋণের ঝুঁকি বাড়ছে। কারণ চলতি দশকের শেষ দিকে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ১০০ শতাংশের দিকে এগোচ্ছে।
আইএমএফ বলছে, “উচ্চ ঋণ, বাড়তি ঋণগ্রহণ ব্যয়, সরকারি বাজেটের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এবং বাড়তি অনিশ্চয়তার কারণে আর্থিক নীতিতে আবারও সক্ষমতার জায়গা তৈরি করার ওপর নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।”
সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বহু দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোজোন এবং জাপানসহ কয়েকটি অঞ্চলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছর সুদের হার বাড়িয়েছে।
আইএমএফ সতর্ক করে বলেছে, “প্রধান উন্নত অর্থনীতিগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণগ্রহণ ব্যয় বাড়তে থাকায় উচ্চ সরকারি ঋণ এবং বড় পুনঃঅর্থায়ন চাহিদা সার্বভৌম ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক অবস্থার আকস্মিক পরিবর্তনের সামনে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।”
সেপ্টেম্বরে বন্ডবাজারে বিক্রি আরও বেড়ে যায়। এর ফলে সুদ ব্যয় বাড়ে এবং সরকারি বাজেটের ওপরও চাপ বৃদ্ধি পায়।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ সরকারি খাতে নিট ঋণগ্রহণ চলতি বছর জিডিপির ৮ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাবে। ২০২৫ সালে এটি ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। আর মহামারির আগের সময়ে ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।
আইএমএফের এই পরিমাপে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয়ের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকারের ঋণগ্রহণও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ কারণে এই হিসাব অন্যান্য পূর্বাভাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের স্বাধীন আর্থিক নজরদারি সংস্থা কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস ফেব্রুয়ারিতে পূর্বাভাস দিয়েছিল, চলতি বছর কেন্দ্রীয় বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ দশমিক ৮ শতাংশ হবে।
অন্যদিকে থিঙ্কট্যাঙ্ক কমিটি ফর আ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের হিসাব ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ।
আইএমএফ আরও বলেছে, আর্থিক ব্যয় বাড়া এবং অনেক দেশে নির্বাচনী চাপ তীব্র হওয়ার ফলে “কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আবারও বেশি সরকারি ঋণগ্রহণকে সহায়তা করা কিংবা লক্ষ্যমাত্রার ওপরে মূল্যস্ফীতি সহ্য করার আহ্বানের মুখে পড়তে পারে।”
প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল
আইএমএফ বলেছে, চলতি বছর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকবে। সংস্থাটি বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ০ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট বাড়িয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ করেছে। ২০২৭ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আর এর একটি ব্যাখ্যা হলো এআই নির্ভর বিনিয়োগের উত্থান।
তবে আইএমএফ সতর্ক করেছে, “এআইয়ের এই গতি সব অর্থনীতিকে সমানভাবে টেনে তুলবে না।” সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল মনে হলেও তা ক্রমেই কমসংখ্যক অর্থনীতির মধ্যে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এপ্রিলে ৫৪টি অর্থনীতি বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ৯৫ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল। এরপর থেকে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৩২টিতে। কারণ ক্রমাগত আরও অনেক দেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, “বিশ্ব অর্থনীতি শুধু ধীর বা দ্রুত হচ্ছে না; বরং যুদ্ধজনিত সরবরাহ ধাক্কার প্রভাব এবং এআই-সম্পর্কিত চাহিদার শক্তির ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধি দেশভেদে পুনর্বণ্টিত হচ্ছে।”
যুক্তরাষ্ট্র চালকের আসনে, জার্মানির উন্নতি
বিশ্ব অর্থনীতিকে চালনা করে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রবৃদ্ধি চলতি ও আগামী বছর ২ দশমিক ৩ শতাংশে স্থিতিশীল থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ায় জার্মানির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ০ দশমিক ৬ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে চলতি বছর জার্মানির প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ১ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে।
চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চলতি বছর আগের ৫ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নামতে পারে। ২০২৭ সালে তা আরও কমে ৪ শতাংশে দাঁড়াবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ভারত উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হিসেবে উঠে এসেছে। দেশটির অর্থনীতি চলতি ও আগামী; দুই বছরই ৭ শতাংশ হারে বাড়তে পারে।
আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর নতুন ঝুঁকি
মঙ্গলবার পরে প্রকাশিত আইএমএফের গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টে অবনতিশীল বাজেট ভারসাম্যের ঝুঁকির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, সাইবার হামলা এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা একসঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি ধাক্কাকে আরও গুরুতর করে তুলছে; প্রতিবেদনে এমন আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি তিনটি বড় ঝুঁকির ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এআই-সম্পর্কিত সম্পদের দামে সংশোধন বা বড় পতন এবং সাইবার হামলা থেকে বাড়তে থাকা পদ্ধতিগত ঝুঁকি।
আইএমএফের মতে, এসব ঝুঁকি আর্থিক পরিস্থিতি হঠাৎ কঠোর হয়ে যাওয়া এবং বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “মূল্যস্ফীতির পুনরুত্থান বা সরকারি অর্থব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ সার্বভৌম বন্ডের ইয়েল্ড হঠাৎ বাড়িয়ে দিতে পারে এবং আরও বিস্তৃত বাজার অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। কারণ সার্বভৌম বন্ড বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি।”


