প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
আইএমএফের পূর্বাভাস
৩৮ বছরের সর্বনিম্নে নামতে পারে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি
২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬। ১২:৩৪ পিএম
আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৬। ১৩:২৪ পিএম
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার প্রকাশিত আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক (ডব্লিউইও) প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির এই পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়েছে।
আইএমএফের নতুন হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ। এই হার বাস্তবায়িত হলে তা হবে প্রায় ৩৮ বছরের মধ্যে দেশের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির একটি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি এতটা কম ছিল। ওই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ১১ শতাংশ।
এমনকি করোনাভাইরাস মহামারির সময়েও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আইএমএফের নতুন পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি ছিল। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
আইএমএফ এর আগে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে তুলনামূলক আশাবাদী ছিল। গত এপ্রিলে প্রকাশিত পূর্বাভাসে সংস্থাটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলেছিল। নতুন পূর্বাভাসে তা ১ দশমিক ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে।
এর মধ্যবর্তী সময়ে জুলাইয়ে আইএমএফ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করেছিল। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে সংস্থাটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে প্রত্যাশা ধারাবাহিকভাবে কমিয়েছে।
মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসেও বড় পরিবর্তন
শুধু প্রবৃদ্ধিই নয়, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি নিয়েও আগের তুলনায় অনেক বেশি উদ্বেগ দেখিয়েছে আইএমএফ।
গত এপ্রিলে সংস্থাটির পূর্বাভাস ছিল, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে। নতুন প্রতিবেদনে সেই পূর্বাভাস বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ করা হয়েছে।
অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
একদিকে কম প্রবৃদ্ধি, অন্যদিকে দুই অঙ্কের কাছাকাছি বা তার বেশি মূল্যস্ফীতি; দুইয়ের সমন্বয় বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় এবং ঋণের খরচ বাড়লে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংক-এডিবির চেয়েও কম আইএমএফের পূর্বাভাস
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাস অন্য দুই বড় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার পূর্বাভাসের চেয়েও কম।
বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পূর্বাভাস আরও কিছুটা বেশি; ৪ শতাংশ।
এর বিপরীতে আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস ৩ দশমিক ২ শতাংশ।
আইএমএফের হিসাবে, এর আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। তার আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
অর্থাৎ নতুন পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে টানা কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৩ শতাংশের আশপাশে বা তার নিচে অবস্থান করবে।
প্রতিবেশীদের তুলনায়ও পিছিয়ে বাংলাদেশ
আইএমএফের একই পূর্বাভাসে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে।
সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭ শতাংশ। ভুটানের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।
এর তুলনায় বাংলাদেশের ৩ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আঞ্চলিক অর্থনৈতিক গতির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
ব্যাংককে চলছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বৈঠক
আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যখন ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠক চলছে।
এই বৈঠকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন অর্থায়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে উন্নয়ন সহযোগীদের, বিশেষ করে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী আইএমএফের নিরাপত্তা পরিচালক উরজিত প্যাটেল এবং বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনা বিয়ের্দের সঙ্গে বৈঠক করেন।
তবে আইএমএফের ৩ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও ১০ দশমিক ৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতির নতুন পূর্বাভাস নিয়ে অর্থমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
আইএমএফের নতুন হিসাব বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে একসঙ্গে দুটি বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমে যাওয়া এবং একই সময়ে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের শেষ পর্যন্ত এই পূর্বাভাস কতটা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়, তা নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কার, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর ওপর।




