প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম
অনুমোদনহীন ২২ অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম শনাক্ত, ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন নিয়ে সতর্কবার্তা
লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত ২২টি অনলাইন পেমেন্ট অ্যাগ্রিগেটর শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ছবি: এআই
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০২:২০ পিএম
আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ১৮:৪২ পিএম
বাংলাদেশ ব্যাংক লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত ২২টি অনলাইন পেমেন্ট অ্যাগ্রিগেটর শনাক্ত করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইট ও অ্যাপ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) চিঠি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অ্যাপগুলো গুগল প্লে স্টোর থেকে সরিয়ে স্থায়ীভাবে বন্ধ করার অনুরোধও করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস সুপারভিশন বিভাগ প্রতিষ্ঠানগুলো শনাক্ত করেছে। রবিবার বিটিআরসির পাশাপাশি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকেও (বিএফআইইউ) এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
লাইসেন্সবিহীন ২২টি প্রতিষ্ঠান হলো—বহুদূর পে, জিনিপে, পে-টিলার, বেঙলি পে, পেওরা বিডি, সহজপে বিডি, ইজিপে ওয়ে, একে পে, বিডি পে, সাজঘর পে, আস্থা পে, উদ্যোক্তাপে, ওয়ালেটমিক্স, বিটিটি পে, ইজিপে অটোমেশন, ইউনিকপে বিডি, বিডি অটো পে, আরএইচ পে বিডি, ইজি পে, অটো পে লিমিটেড, বিশ্বস্ত ও পিপড়াপে।
তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্তত ১৯টির ওয়েবসাইটে বিকাশ, নগদ, রকেট, বাংলা কিউআর এবং বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হচ্ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, অননুমোদিত এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে গ্রাহকদের সতর্ক করা হচ্ছে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেউ প্রতারণার শিকার হলে তার দায় বাংলাদেশ ব্যাংক নেবে না। এ কারণেই সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট ও অ্যাপ বন্ধে বিটিআরসিকে অনুরোধ করা হয়েছে।
পেমেন্ট অ্যাগ্রিগেটর এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যার মাধ্যমে কোনো ব্যবসায়ী এক জায়গা থেকেই বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, কার্ড ও কিউআর পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারে। এ ধরনের সেবা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স প্রয়োজন।
লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত কোনো অ্যাগ্রিগেটর গ্রাহক বা ব্যবসায়ীর অর্থ নিজস্ব হিসাবে গ্রহণ করলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি তারল্য সংকট, দেউলিয়াত্ব, প্রতারণা, অ্যাকাউন্ট জব্দ কিংবা পরিচালনাগত সমস্যায় পড়লে গ্রাহক ও মার্চেন্টদের অর্থ আটকে যেতে পারে।
একটি পেমেন্ট অ্যাগ্রিগেটর একসঙ্গে হাজার হাজার ব্যবসায়ীর লেনদেন প্রক্রিয়া করতে পারে। ফলে একটি প্ল্যাটফর্ম হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক ও ব্যবসায়ীর অর্থ অনিষ্পন্ন অবস্থায় থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়।
নজরদারির বাইরে লেনদেন
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর বা পিএসও হিসেবে কাজ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লাইসেন্স প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে ১১টি পিএসও বৈধ লাইসেন্স নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ভাষ্য, লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সরাসরি নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে প্রতারণার শিকার গ্রাহকের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়।
এসব প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রকের নজরদারির বাইরে থাকায় গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ, লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং অর্থের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই যথাযথ মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের বদলে ব্যক্তিগত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস নম্বর ব্যবহার করছে। এর মাধ্যমে নিয়মিত আর্থিক নজরদারির কিছু ধাপ এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কিছু প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের বিটকয়েনসহ বিভিন্ন ভার্চুয়াল মুদ্রায় বিনিয়োগেও উৎসাহিত করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, দেশে এসব ভার্চুয়াল সম্পদের লেনদেন অনুমোদিত নয়। ফলে এমন প্ল্যাটফর্মে অর্থ বিনিয়োগ করলে ব্যবহারকারীর অর্থ প্রচলিত নিয়ন্ত্রক সুরক্ষার বাইরে চলে যেতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, তালিকাভুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জুয়াসহ অন্যান্য অবৈধ কার্যক্রমের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সবিহীন হওয়ায় তাদের আর্থিক লেনদেনের ওপর নজরদারিও সীমিত এবং সরকার ভ্যাট ও কর আদায়ের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা মনে করেন, শুধু ওয়েবসাইট বা অ্যাপ বন্ধ করলেই যথেষ্ট হবে না। এসব প্রতিষ্ঠানের পেছনে কারা রয়েছে, কারা প্রচার করছে এবং হুন্ডি, অর্থপাচার বা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তারা জড়িত কি না, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।
তিনি এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন। তাঁর মতে, ব্যবহারকারীর তথ্য কোথায় গেছে এবং এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরকার কতটা কর ও ভ্যাট হারিয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
বিকাশের করপোরেট কমিউনিকেশনস বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম জানিয়েছেন, অননুমোদিত কোনো পেমেন্ট অ্যাগ্রিগেটরের সঙ্গে বিকাশের লেনদেনের সুযোগ নেই। কোনো প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স পেলেও অন্যান্য আইন ও বিধিবিধান মেনে চলছে কি না, তা যাচাই করেই তাদের সঙ্গে কাজের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠিতে বলেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লাইসেন্স ছাড়া কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি পেমেন্ট সিস্টেম পরিচালনা বা পেমেন্ট সেবা দিতে পারবে না। এমন কার্যক্রম শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠান বিটকয়েন, ইথেরিয়ামসহ বিভিন্ন ভার্চুয়াল সম্পদের লেনদেনেও সহায়তা করছে। এসব কার্যক্রম অনুমোদিত নয় এবং আইনগত ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।






