Logo
Logo
×
তেল-কয়লার চেয়েও সস্তা সৌরবিদ্যুৎ, তবু ব্যবহার মাত্র ৪-৫%

তেল-কয়লার তুলনায় কম খরচে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার প্রতীকী চিত্র। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ

অর্থনীতি ।  এনার্জি

তেল-কয়লার চেয়েও সস্তা সৌরবিদ্যুৎ, তবু ব্যবহার মাত্র ৪-৫%

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬। ০১:১২ পিএম

আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২৬। ১৭:৫৫ পিএম

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, কয়লা ও গ্যাসের দাম বাড়া এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে ওঠার মধ্যে বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক কম খরচের বিকল্প হিসেবে সামনে আসছে সৌরবিদ্যুৎ।

জ্বালানি আমদানির প্রয়োজন না থাকা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং পরিবেশদূষণ তুলনামূলকভাবে কম এসব সুবিধা থাকলেও দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনো খুবই সীমিত। 

এর একটি উদাহরণ পাবনার ভবানীপুরের ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০২৪ সালে চালু হওয়া কেন্দ্রটি পদ্মার বালুচরের প্রায় ৪০০ একর জমিতে নির্মিত। দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে কেন্দ্রটি।

২০২১ সালে করা ২০ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি অনুযায়ী, এখানকার প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম সাড়ে ১১ সেন্ট, যা বর্তমান হিসাবে প্রায় ১৩ টাকা। বিপরীতে ফার্নেস তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিটের উৎপাদন ব্যয় ২৮ টাকার বেশি এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের খরচ প্রায় ১৫ টাকা। 

নতুন প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুতের দাম আরও কমছে। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১০টি দরপত্রে সৌরবিদ্যুতের গড় দাম দাঁড়ায় ইউনিটপ্রতি ৮ দশমিক ২৭ সেন্ট, অর্থাৎ ১০ টাকার কিছু বেশি।

আগের অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পগুলোর গড় দর ছিল ১০ দশমিক ৪৭ সেন্ট বা প্রায় ১৩ টাকা। একটি নতুন চুক্তিতে দর নেমেছে ৭ দশমিক ৪৯ সেন্টে, যা ৯ টাকার কিছু বেশি। অর্থাৎ প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে আগের তুলনায় গড়ে প্রায় ২১ শতাংশ কম দামে সৌরবিদ্যুৎ কেনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। 

সৌরবিদ্যুতের খরচ কমছে, কিন্তু অংশ এখনো ছোট

দেশে বর্তমানে সব ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৩৪৭ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে, সৌর, পানি ও বায়ুসহ নবায়নযোগ্য উৎসের ১৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৮৯ মেগাওয়াট।

অর্থাৎ গ্রিডে যুক্ত বিদ্যুৎ সক্ষমতার প্রায় ৪ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। ২০১২-১৩ অর্থবছরেও এই হার ছিল ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। 

তবে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ হিসাবের মধ্যে ধরলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা কিছুটা বাড়ে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হিসাবে, বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের ছাদে উৎপাদিত বিদ্যুৎসহ বর্তমানে গ্রিডে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে যুক্ত সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৪৯২ মেগাওয়াট। এই হিসাবেও মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতায় নবায়নযোগ্যের অংশ প্রায় ৫ শতাংশ। 

বাংলাদেশ এর আগেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছিল। ২০২১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনার লক্ষ্য ছিল। সেটি অর্জিত না হওয়ায় সময়সীমা ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়, কিন্তু সেই লক্ষ্যও পূরণ হয়নি।

২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ হলেও এর মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ গেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে। 

দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ খাতের বিনিয়োগের বড় অংশ গিয়েছে গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলভিত্তিক কেন্দ্র নির্মাণে। কিন্তু ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে।

ডলারের দাম বাড়ার পাশাপাশি দেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দামও বাড়ে। উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানির ঘাটতিতে বিভিন্ন সময়ে লোডশেডিং করতে হয়েছে। এই পরিস্থিতিই নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রয়োজনীয়তাকে আরও সামনে নিয়ে আসে।

তৎকালীন সরকার শেষদিকে ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য সম্মতিপত্র দিয়েছিল। তবে সেগুলো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া বিশেষ আইনের আওতায় অনুমোদন পাওয়ায় পরবর্তী সময়ে বাতিল করা হয়। ২০২৪ সালের নভেম্বরে সংশ্লিষ্ট বিশেষ বিধান বাতিল হওয়ার পর এসব প্রকল্পের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার সুযোগও বন্ধ হয়ে যায়। 

এরপর দরপত্রের মাধ্যমে নতুন প্রকল্প নেওয়া শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জানুয়ারিতে দুই দফায় মোট ১১টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি হয়, যেগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ৮১৮ মেগাওয়াট। বর্তমান সরকারের সময়েও নতুন ১০টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। 

পিডিবির হিসাবে, বেসরকারি খাতে বর্তমানে ১৯টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন, যেগুলোর মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৪২ মেগাওয়াট। সরকারি খাতে নির্মাণাধীন ছয়টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আরও ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা। এর বাইরে কক্সবাজারে ১০০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার চুক্তি প্রক্রিয়াধীন। 

তবে কাগজে প্রকল্প থাকলেও দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনে আসার পথে কয়েকটি বড় সমস্যা রয়েছে। আগে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদেশি ঋণে সরকার সার্বভৌম গ্যারান্টি দিত। সেই সুবিধা তুলে নেওয়ার পর অনেক বিদেশি ঋণদাতা অর্থায়নে আগ্রহ হারিয়েছে।

পাশাপাশি জমি কেনা ও অধিগ্রহণের জটিলতা, নতুন উদ্যোক্তাদের সীমিত অভিজ্ঞতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরঞ্জাম আমদানিতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন চুক্তির কয়েকটি প্রকল্প থেকে আগামী এক-দুই বছরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাওয়া কঠিন হতে পারে। 

তিনটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দায়িত্ব পাওয়া কনফিডেন্স গ্রুপও জমি ও ব্যাংক অর্থায়নের সমস্যার কথা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, প্রকল্পগুলোর উৎপাদন শুরু করতে ২০২৮ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। 

অন্যদিকে বাতিল হওয়া প্রকল্প নিয়েও নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বাতিল হওয়া ৩১টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মোট ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ সক্ষমতা তৈরি হতে পারত এবং প্রায় ৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ আসত। এর মধ্যে ১৫টি কোম্পানি জমিও কিনেছিল। তবে এসব প্রকল্পের বিদ্যুতের দাম নতুন প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের তুলনায় বেশি ছিল। 

সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের মত, যেসব বাতিল প্রকল্পের নির্মাণকাজ অনেক দূর এগিয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে বিদ্যুতের দাম নিয়ে নতুন করে দর-কষাকষি করা যেতে পারে।

বিশেষ করে নীলফামারীর ডিমলায় ৫০ মেগাওয়াট এবং দিনাজপুরে ১০০ মেগাওয়াটের দুটি প্রকল্প প্রায় প্রস্তুত অবস্থায় ছিল; সম্মতিপত্র বাতিল হওয়ায় কাজ থেমে যায়। যাচাই-বাছাই ও নতুন মূল্য সমঝোতার মাধ্যমে এমন প্রকল্প দ্রুত উৎপাদনে আনা সম্ভব কি না, তা এখন বিবেচনায় রয়েছে। 

লক্ষ্য ১০ হাজার মেগাওয়াট, সামনে জমি ও অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে। সেই লক্ষ্যে সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে এবং ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছাদে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ইউনিটপ্রতি সাড়ে ১০ টাকায় কিনবে সরকার। 

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি সরকারি জমিতে বড় প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। দেশে প্রায় ৩৬ লাখ একর খাসজমি এবং ১৮ লাখ একর অকৃষিজমি আছে। এর মধ্যে চরের প্রায় ৩০ হাজার একর জমি ব্যবহার করেই ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। পিডিবির নিজস্ব প্রায় ৬ হাজার একর জমিও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহার করা যেতে পারে। 

সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময়ও তুলনামূলক কম। বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে যেখানে ১০ থেকে ১২ বছর সময় লাগতে পারে, একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায় দেড় বছরের মধ্যে নির্মাণ করা সম্ভব। তবে জমি নিশ্চিত করা এবং অর্থায়নই এই খাতের অন্যতম প্রধান বাধা। 

বিদেশের অভিজ্ঞতাও দেখাচ্ছে, নীতি সহায়তা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে সৌরবিদ্যুৎ দ্রুত বাড়ানো সম্ভব। ভিয়েতনামের সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ২০১৮ সালে মাত্র ৮৬ মেগাওয়াট ছিল; ২০২৫ সালের শেষে তা প্রায় ১৯ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে।

পাকিস্তানে বিদ্যুতের উচ্চ দামের কারণে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের বিস্তার হয়েছে; শুধু গ্রিডে যুক্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতাই ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। 

সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মূলধনি ব্যয়ও কমছে। প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাবে, ৫০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রায় সাড়ে তিন কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং সাধারণত ছয় থেকে সাত বছরের মধ্যে বিনিয়োগ উঠে আসতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ছাদভিত্তিক ও ছোট প্রকল্পে ইতিবাচক তৎপরতা দেখা গেলেও বাংলাদেশের ২০৩০ সালের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের গতি দ্রুত বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বাতিল হয়ে যাওয়া কিন্তু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি থাকা প্রকল্পগুলো দ্রুত যাচাই-বাছাই, অর্থায়নের নিশ্চয়তা, জমির ব্যবস্থা এবং প্রতিযোগিতামূলক দরে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। 

বাংলাদেশের সামনে তাই সৌরবিদ্যুতের প্রশ্নটি শুধু পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের নয়। এটি আমদানি করা তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানোর সঙ্গেও যুক্ত।

কমে আসা প্রযুক্তি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ এই সুযোগ আরও বাড়িয়েছে। তবে সম্ভাবনাকে বাস্তব উৎপাদনে রূপ দিতে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি, অর্থায়ন এবং জমির জটিলতা কাটানো।

আরও পড়ুন

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে