প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১১ এএম
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতি ও আলোচ্যসূচি তুলে ধরেন পররাষ্ট্রসচিব। ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরে দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের অর্থায়ন ও ঋণের সুদ কমানোর বিষয়টি আলোচনায় আসবে। প্রকল্পটির ব্যয় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে জাপানের সঙ্গে অবকাঠামোগত সহযোগিতা ও অর্থায়নের শর্ত নিয়ে আলোচনা করবে বাংলাদেশ।
পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, জাপানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে কম সুদে ঋণ পাওয়ার বিষয়টি তোলা হবে। তবে এ আলোচনা থেকে কী ফল আসবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার আমন্ত্রণে আগামী ২৫ থেকে ২৮ অক্টোবর দেশটি সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি হবে তার চতুর্থ বিদেশ সফর।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতি ও আলোচ্যসূচি তুলে ধরেন পররাষ্ট্রসচিব।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে প্রকল্পটির ব্যয় ১১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। জাপানের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
এই বাড়তি ব্যয় কমানোর বিষয়ে জাপানের সঙ্গে আলোচনা হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আসাদ আলম সিয়াম জানান, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সব উন্নয়ন সহযোগী দেশের কাছ থেকেই কম সুদে ঋণ পেতে চায়। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার ওপর ঋণের শর্ত নির্ভর করে।
পররাষ্ট্রসচিবের ভাষ্য, এসব বিষয় আলোচনায় আসবে। তবে প্রকল্পের ব্যয় কিংবা ঋণের সুদ কতটা কমানো সম্ভব হবে, তা বৈঠকের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।
মাতারবাড়ী বন্দর ও জ্বালানি সহযোগিতায় গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রীর সফরে জাপানের অর্থায়নে নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
বন্দরটিকে কেন্দ্র করে একটি শিল্পভিত্তিক সরবরাহব্যবস্থা বা ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভ্যালু চেইন’ গড়ে তুলতে আগ্রহী জাপান। এর মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যকে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ভবিষ্যতে দেশের আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বন্দরের সক্ষমতা উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। আগামী ১০ বছরে পণ্য পরিবহনের সম্ভাব্য চাহিদা বিবেচনায় নিয়েই মাতারবাড়ী বন্দর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতার বিষয়টিও সফরের আলোচ্যসূচিতে থাকবে।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপানের চিবা অঞ্চলে একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) টার্মিনাল পরিদর্শন করবেন। পাশাপাশি একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, ইউনিলিভারের সদরদপ্তর এবং নাগানোর টয়োটা কারখানা ঘুরে দেখার কর্মসূচি রয়েছে।
পররাষ্ট্রসচিব জানান, বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক বর্তমানে কৌশলগত অংশীদারত্বের পর্যায়ে রয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ও নিরাপত্তা খাতে চলমান সহযোগিতা এই সফরের মাধ্যমে আরও সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হওয়ায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জাপান বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী। মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে দেশটি অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতা দিয়ে আসছে।
এবারের সফরে জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো, নতুন জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ডিজিটাল উদ্ভাবন, গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
আগামী ২৬ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই দেশের সরকারপ্রধানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই দিন জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নৈশভোজেও অংশ নেবেন তারেক রহমান।
এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন, জাইকা, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিরা তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামেও মূল বক্তব্য দেবেন।
পররাষ্ট্রসচিব জানিয়েছেন, সফরকালে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান পরিবহন, সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় সরকারের আধুনিকীকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে।
তিনি বলেন, প্রায় আটটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি স্বাক্ষরিত হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খান।
সফরের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং বাংলাদেশে নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্রসচিব।






