Logo
Logo
×
বাব আল-মান্দেব কী? কেন এটা এত গুরুত্বপূর্ণ?

হুথিরা ইয়েমেনের পেরিম দ্বীপ, মোখা আর ধুবাব দখল করে নেওয়ায় বিশ্ব বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ বাব আল-মান্দেব প্রনালি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ

ইনসাইট ।  এক্সপ্লেইনার

বাব আল-মান্দেব কী? কেন এটা এত গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৬:১৯ পিএম

আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ১৪:৫৩ পিএম

ইয়েমেন আর হর্ন অফ আফ্রিকার মাঝের এক চিলতে সরু পানিপথ এখন পুরো অঞ্চলের ছড়িয়ে পড়া সংকটের নতুন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

বাব আল-মান্দেব প্রণালি বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ, যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর আর বিশাল ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী দেশের লোহিত সাগর উপকূল ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পর এই পানিপথটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কারণ এর ফলে এশিয়া আর ইউরোপীয় বাজারকে সংযোগকারী অন্যতম প্রধান পথের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ইয়েমেন সরকারের এক সামরিক সূত্র গত ১১ সেপ্টেম্বর তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে জানিয়েছে, হুথি যোদ্ধারা পেরিম দ্বীপ দখল করে নিয়েছে, যা মায়্যুন দ্বীপ নামেও পরিচিত। এই দ্বীপটি ঠিক বাব আল-মান্দেব প্রণালির ভেতরেই অবস্থিত। সূত্রটি আরও জানায়, এই দখলের মাধ্যমে হুথিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করল।

খবরে বলা হয়েছে, হুথিরা দ্বীপের ঠিক মুখোমুখি থাকা উপকূলীয় শহর ধুবাব এবং আরও উত্তরে অবস্থিত হানিশ দ্বীপপুঞ্জও দখল করে নিয়েছে।

এর একদিন আগেই গোষ্ঠীটি বাব আল-মান্দেব প্রণালি থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার (৫০ মাইল) দূরের ঐতিহাসিক বন্দর নগরী মোখা দখল করে নেয়।

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা এর জবাব দিতে চায়।

জাতিসংঘে ইয়েমেনের প্রতিনিধি আবদুল্লাহ আল-সাদি নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে বলেছেন, হুথিরা তাদের সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েই চলেছে এবং লোহিত সাগরে এক “নতুন পরিস্থিতি” চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

তাহলে বাব আল-মান্দেব আসলে কী, আর কেনই বা এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?

বাব আল-মান্দেব কী?

আরবি ভাষায় ‘বাব আল-মান্দেব’ নামের অর্থ হলো “অশ্রুর দ্বার”। এটি ইয়েমেনকে হর্ন অফ আফ্রিকার জিবুতি আর ইরিত্রিয়া থেকে আলাদা করেছে।

এটি এডেন উপসাগর ও আরব সাগরকে লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। লোহিত সাগরের একদম উত্তর প্রান্তে রয়েছে মিশরের সুয়েজ খাল, যা এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে চলাচলের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত পথগুলোর একটি।

সেই হিসেবে বাব আল-মান্দেব হলো সুয়েজ করিডোরের দক্ষিণ দিকের প্রবেশদ্বার।

কোনো জাহাজ যদি সুয়েজ খাল দিয়ে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে যাতায়াত করতে চায়, তবে তাকে সবার আগে বাব আল-মান্দেব পার হতেই হবে।

প্রণালিটি তার সবচেয়ে সংকীর্ণ পয়েন্টে প্রায় ১৮ মাইল (২৯ কিলোমিটার) চওড়া, আর এখানে জাহাজ চলাচলের পথটি দুটি চ্যানেলে ভাগ করা।

পেরিম দ্বীপটি এই যাতায়াতের পথকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। একটি চ্যানেল দ্বীপ আর ইয়েমেনের মূল ভূখণ্ডের মাঝখান দিয়ে গেছে, অন্য চওড়া পথটি আফ্রিকান অংশের দিকে গেছে।

এই দ্বীপে যে অবস্থান নেবে, লোহিত সাগরে আসা- যাওয়া করা জাহাজগুলোর ওপর নজর রাখার জন্য সে এক দারুণ সুবিধা পাবে।

ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ধরে একটু উত্তরের হানিশ দ্বীপপুঞ্জও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক যাতায়াতের পথের খুব কাছেই অবস্থিত।

মোখা ও ধুবাবের পাশাপাশি এই কৌশলগত পয়েন্টগুলো নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কারণে হুথিরা শিপিং রুটের আশেপাশে বেশ শক্ত সামরিক অবস্থান পেয়ে যেতে পারে।

বাব আল-মান্দেব বিশ্ব বাণিজ্যে কীভাবে প্রভাব ফেলে?

বাব আল-মান্দেব শুধু তেল সরবরাহের পথ নয়।

এই প্রণালিটি এক বিশাল সামুদ্রিক পথেরই অংশ, যার মাধ্যমে এশিয়া ও ইউরোপীয় বাজারের মধ্যে তৈরি পোশাক বা অন্যান্য পণ্য, কৃষিপণ্য, খাদ্যশস্য, সার, গাড়ির যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক্স এবং অন্যান্য নানা ধরনের জিনিস আনা-নেওয়া করা হয়।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, লোহিত সাগরে নতুন করে এই বিশৃঙ্খলা শুরু হওয়ার আগে, ২০২৩ সালে বিশ্ব বাণিজ্যের আনুমানিক ১২ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ এবং বিশ্বের সমুদ্রপথে কন্টেইনার পরিবহনের প্রায় ২২ শতাংশ সুয়েজ খাল দিয়ে সম্পন্ন হতো।

আর এই পথের জন্য বাব আল-মান্দেব একেবারেই অপরিহার্য। দক্ষিণ দিক থেকে জাহাজগুলো যদি নিরাপদে লোহিত সাগরে ঢুকতে না পারে, তবে এশিয়া-ইউরোপ সংক্ষিপ্ত পথ হিসেবে সুয়েজ খালের বাণিজ্যিক উপযোগিতার বড় একটা অংশই নষ্ট হয়ে যায়।

তখন বাধ্য হয়ে জাহাজগুলোকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে যাতায়াত করতে হয়। ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হিসাব মতে, আরব সাগর থেকে ইউরোপে যাওয়া কোনো তেল ট্যাঙ্কারকে যদি ওই ঘুরে যেতে হয়, তবে সফরকাল প্রায় ১৫ দিন বেড়ে যায়।

এই দীর্ঘ যাত্রায় বেশি জ্বালানি খরচ হয়, জাহাজ আর কর্মীদের বাড়তি সময় আটকে থাকতে হয়, অন্য কাজের জন্য পাওয়া জাহাজের সংখ্যা কমে যায় এবং পণ্য পরিবহন ও বিমার খরচ অনেকটাই বেড়ে যায়। আর দিনশেষে এই বাড়তি খরচগুলো পণ্যের উৎপাদনকারী আর সাধারণ ভোক্তাদের পকেট থেকেই যায়।

এর কুফল ইতোমধ্যে দেখাও গেছে। ২০২৩ সালের শেষের দিকে হুথিরা বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ শুরু করার পর, আফ্রিকা ঘুরে জাহাজ পাঠানোয় বাব আল-মান্দেব দিয়ে তেলের প্রবাহ ২০২৩ সালের দৈনিক ৯.৩ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে কমে ২০২৪ সালে ৪.১ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে আসে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাস নাগাদ সুয়েজ খাল দিয়ে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় ৭০ শতাংশ কম ছিল। 

ইয়েমেনের আল-সালিফ উপকূলে হুথিদের হাতে ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে জব্দ হওয়া বাণিজ্যিক জাহাজ গ্যালাক্সি লিডারের ডেকে নাচছেন কয়েকজন। ছবি: রয়টার্স

২০২৬ সালে এসে কেন এই প্রণালিটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে?

সাম্প্রতিক সংকট এই প্রণালিকে গুরুত্বের আরেকটি নতুন মাত্রায় এনে দাঁড় করিয়েছে, তা হলো হরমুজ প্রণালিতে তৈরি হওয়া বাধা।

ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালি হলো পারস্য উপসাগরে উৎপাদিত অধিকাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান সামুদ্রিক রপ্তানি পথ।

ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে এই পানিপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল অনেক কমে গেছে।

ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য দেখাচ্ছে, হরমুজ দিয়ে তেলের প্রবাহ ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে দৈনিক ২১.৬ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে কমে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৪.৯ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে।

এর জবাবে সৌদি আরব তাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে বেশি পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পাঠাতে শুরু করে, যাতে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলা যায়।

এর ফলে, বাব আল-মান্দেব দিয়ে তেল ও তেলজাত পণ্যের প্রবাহ গত বছরের শেষ প্রান্তিকে দৈনিক ৫.৪ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে বেড়ে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৮.১ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে রপ্তানি কমে যাওয়ায় চাপের মুখে থাকা জ্বালানি বাজারের জন্য লোহিত সাগরের পথটি এখন এক বড় ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে।

তবে ইয়ানবুর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে একটা সমস্যা থেকে যায়। সৌদি আরব থেকে ইউরোপগামী তেল বাব আল-মান্দেব পার না হয়েই সুয়েজ খাল বা মিশরের সুয়েজ-মেডিটেরিনিয়ান (এসইউএমইডি) পাইপলাইন দিয়ে উত্তরে চলে যেতে পারে।

কিন্তু ইয়ানবু থেকে প্রধান এশীয় গ্রাহকদের দিকে যাওয়া কার্গোকে সাধারণত দক্ষিণ দিকে বাব আল-মান্দেব হয়েই যেতে হয়। যদি ওই পথটি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে, তবে সেই জাহাজগুলোকে সুয়েজ হয়ে উত্তরে গিয়ে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে যেতে হবে, যা অনেক দীর্ঘ এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল এক যাত্রা।

বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে অবস্থিত পেরিম দ্বীপের (আরবিতে মাইয়ুন নামে পরিচিত) একটি দৃশ্য। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, ২০১৫ সালে দ্বীপটি হুথি যোদ্ধাদের কাছ থেকে দখলে নেয় ইয়েমেন সরকারপন্থী সেনা ও উপসাগরীয় আরব বাহিনী। তবে সম্প্রতি হুথিরা আবারও দ্বীপটি দখলে নিয়েছে বলে খবরে এসেছে। ২০১৫ সালের ৪ অক্টোবর এই ছবিটি তোলে রয়টার্সের স্ট্রিঞ্জার।

উপকূল দখলে রাখা মানেই কি পুরো প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যাওয়া?

ইয়েমেন অংশের উপকূলীয় এলাকা নিয়ন্ত্রণে এলে হুথিদের পক্ষে শিপিং রুটে হুমকি তৈরি করার ক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে সত্যি, তবে তার মানে এই নয় যে তারা পুরো পানিপথটির একক নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যাবে। 

প্রণালির পশ্চিম পাশে জিবুতি আর ইরিত্রিয়ার সীমানা রয়েছে, আর আন্তর্জাতিক মূল শিপিং রুটটি আফ্রিকান উপকূলের দিকেই প্রসারিত।

এছাড়া আন্তর্জাতিক আইনও দুটি উন্মুক্ত সাগর বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে যুক্তকারী প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের অধিকার রক্ষা করে। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশনের অধীনে, জাহাজ ও উড়োজাহাজ চলাচলের ট্রানজিট অধিকার রয়েছে যা কোনোভাবেই ব্যাহত করা যাবে না।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাও (আইএমও) গত জুলাইয়ে পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, আন্তর্জাতিক প্রণালি দিয়ে অবাধ ট্রানজিট চলাচলে কোনো ধরনের হুমকি দেওয়া, বাধা তৈরি করা বা স্থগিত করা যাবে না।

আরও পড়ুন

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে