প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৭ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৫:৫৪ পিএম
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে বড় ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পড়েছে সৌদি আরব। হামলা ঠেকাতে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক বা ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমে আসায় এবার আঞ্চলিক ও পশ্চিমা মিত্রদের কাছে আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ।
বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তার বরাতে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, সৌদি আরব ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছে। হুতি ও অন্যান্য ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোকাবিলায় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মিত্রদের কাছে কেন সহায়তা চাইছে রিয়াদ
সৌদি আরবের প্রধান সামরিক মিত্র ও অস্ত্র সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ইরানের সঙ্গে চলমান দীর্ঘ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুতও চাপের মধ্যে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে শুধু ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য মিত্র দেশের কাছেও সহায়তার জন্য যোগাযোগ করেছে রিয়াদ। তবে এখন পর্যন্ত ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান বা মিসরের পক্ষ থেকে সৌদি আরবে নতুন সামরিক সহায়তা পাঠানোর কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
মক্কার কাছে ড্রোন নিয়ে উত্তেজনা
সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে পবিত্র মক্কা নগরীর কাছে ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনায়।
সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, ১৫ সেপ্টেম্বর মক্কার দক্ষিণে একটি হুতি ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করা হয়। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রোনটি পবিত্র নগরীর নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ভূপাতিত করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে গুরুতর নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে হুতিরা মক্কাকে লক্ষ্য করে ড্রোন পাঠানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে ড্রোনটির প্রকৃত লক্ষ্য নিয়ে সৌদি আরব ও হুতিদের বক্তব্যের মধ্যে সরাসরি বিরোধ রয়েছে।
সৌদি এফ-১৫ ভূপাতিতের দাবি হুতিদের
মক্কার কাছে ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনার পর ইয়েমেনের হুতিরা দাবি করেছে, তারা একটি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে।
হুতি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, ইয়েমেনের মারিব এলাকায় সৌদি যুদ্ধবিমানটি সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার সময় ভূপাতিত করা হয়। এ দাবির সমর্থনে হুতিরা ধ্বংসাবশেষের ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করেছে।
তবে ঘটনাটি নিয়ে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। ফলে যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার হুতি দাবিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তেল স্থাপনাও বড় ঝুঁকিতে
সৌদি আরবের উদ্বেগ শুধু সামরিক স্থাপনা নিয়ে নয়। বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশটির জন্য তেল উৎপাদন, পরিবহন ও রপ্তানি অবকাঠামোর নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি জ্বালানি অবকাঠামো ও লোহিত সাগরে দেশটির জাহাজগুলো হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে। একই সময়ে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর হামলায় সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন বন্ধ হওয়ার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালি নিয়ে উদ্বেগ। এই জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে হুতিদের সামরিক উপস্থিতি ও হামলার হুমকি বাড়ায় সৌদি আরবের তেল রপ্তানির বিকল্প পথ নিয়েও চাপ তৈরি হয়েছে।
হরমুজ ও বাব আল-মানদেব—দুই জলপথেই চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদেব ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে। এই দুই জলপথ আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে সৌদি আরবের জন্য চ্যালেঞ্জটি শুধু নিজ ভূখণ্ডের আকাশ প্রতিরক্ষা নয়। তেল স্থাপনা, বন্দর, জাহাজ ও আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখাও একই সঙ্গে জরুরি হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে যেতে চাইছে না
সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন সৌদি-হুতি সংঘাতে সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
এপি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি বাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও সামরিক পরিকল্পনায় সহায়তা বাড়ানোর জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। তবে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে ওয়াশিংটনের বর্তমান ভূমিকা সহায়তা ও সমন্বয়কেন্দ্রিক বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
একই সময়ে ওমানের রাজধানী মাসকাটে মার্কিন কর্মকর্তা ও হুতি প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। আলোচনার লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর উপায় খোঁজা।
পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা চুক্তি
সৌদি আরব সম্প্রতি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করেছে। ফলে হুতিদের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় এই নিরাপত্তা সহযোগিতার কার্যকারিতাও আলোচনায় এসেছে।
তবে পাকিস্তান ও তুরস্কের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি আরবের পক্ষ থেকে তাদের কাছে সরাসরি সামরিক সহায়তার অনুরোধ আসেনি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ মক্কার কাছে ড্রোনের ঘটনার পর সৌদি আরবের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। তুরস্কও সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে।
সামরিক সহায়তার চেয়ে কূটনীতিতে জোর
সৌদি আরব সামরিক সহায়তা চাইলেও মিত্রদের মধ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রতি আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে। ওমান ও মিসর আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে তুরস্কও ইচি চীন সফর করছেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেনরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বলে দেশটির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়া ঠেকানো এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ও জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ রাখা।
চীনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
এই উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি চীন সফর করছেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
চীন একই সঙ্গে ইয়েমেন ও লোহিত সাগরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন।
আরও বড় আঞ্চলিক সংকটের আশঙ্কা
হুতি হামলা, সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া, তেল অবকাঠামোর ওপর হুমকি এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে সংঘাতটি এখন শুধু সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
সৌদি আরব একদিকে নিজের ভূখণ্ড ও জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় মিত্রদের সহায়তা চাইছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ানোর বদলে কূটনৈতিকভাবে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে সামরিক প্রতিরোধের পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগই আঞ্চলিক পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।




