প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬। ০৩:৪৮ পিএম
আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৬। ১৫:৪৯ পিএম
ফ্রান্সে হাইস্কুল অবরোধ দিয়ে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ এখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। স্কুলের অবনতিশীল পরিবেশ, শিক্ষকসংকট, শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি ও আবাসন সংকটের প্রতিবাদে তরুণরা রাস্তায় নামছেন।
ফ্রান্স ও বেলজিয়াম থেকে আলবেনিয়া, গ্রিস, স্পেন ও ইতালি পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভে দেখা গেছে স্কুল দখল, বড় মিছিল ও বিক্ষুব্ধ জনতা। কোথাও কোথাও এসব আন্দোলন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষেও গড়িয়েছে।
দেশভেদে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ আলাদা হলেও এর পেছনে একটি অভিন্ন হতাশা কাজ করছে। তরুণদের অভিযোগ, নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সুযোগ ও সম্পদ দিতে সরকারগুলো ব্যর্থ হচ্ছে।
বিক্ষোভের কেন্দ্র ফ্রান্স
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শেষের দিকে ফ্রান্সে বিক্ষোভ শুরু হয়। প্যারিস অঞ্চলে, বিশেষ করে ক্রেতেইলের আশপাশে শিক্ষার্থীরা ময়লার বিন ও অস্থায়ী ব্যারিকেড দিয়ে স্কুলের প্রবেশপথ অবরোধ করতে শুরু করে।
তাদের অভিযোগের মধ্যে ছিল শিক্ষক না থাকা, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি, শ্রেণিকক্ষ এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামো। অনেক স্কুলে ছত্রাক, ভাঙা টয়লেট ও তাপপ্রবাহের সময় শ্রেণিকক্ষের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছানোর অভিযোগও এসেছে।
শিক্ষার্থীরা কঠিন সময়সূচি ও ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্ল্যাটফর্ম ‘পারকুরসুপ’ এরও সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের প্রক্রিয়ায় এটি অতিরিক্ত চাপ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
আর এসব অভিযোগের জায়গা থেকে আন্দোলন দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শত শত স্কুলের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিক্ষোভের চূড়ান্ত পর্যায়ে ২০০টির বেশি হাইস্কুল পুরোপুরি বন্ধ ছিল বলে জানা গেছে। আরও অনেক স্কুলে আংশিক বন্ধ বা ক্লাসে বিঘ্ন ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দেয়।

২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসের উপকণ্ঠ সাঁ-দেনিতে লিসে পল এলুয়ার স্কুলে অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলছেন সুইডিশ জলবায়ু আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ। ছবি: এএফপি
অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের হিসাবেও বড় পার্থক্য রয়েছে। ১৩ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অন্তত ১ লাখ ৬১ হাজার ৫০০ বিক্ষোভকারীর কথা জানায়। অন্যদিকে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর দাবি, প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। অক্টোবরের শুরুতে আরও কয়েকটি বড় বিক্ষোভেও বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ দেখা যায়।
১৩ অক্টোবর প্যারিসের উত্তরে সাঁ-দেনির একটি অবরুদ্ধ স্কুলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দেন জলবায়ু আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ। তিনি বলেন, তরুণদের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তে তাদের অর্থবহ ভূমিকা দেওয়া হচ্ছে না।
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক
পুলিশের আচরণও বিক্ষোভে নতুন উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠেছে। লঁস শহরে এক কিশোরের একটি হাত হারানোর ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার স্থগিত করে। অন্য আরেক ঘটনায় চোখে আঘাত ও দাঁতের ক্ষতির অভিযোগ এসেছে। পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে দেওয়া বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬ হাজার ৮০০ থেকে ৮ হাজার মানুষকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের প্রায় ৮৫ থেকে ৮৬ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। আহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী, স্কুলকর্মী এবং পুলিশ সদস্যও রয়েছেন।
অধিকাংশ মিছিল মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হলেও কিছু বিক্ষোভ শেষ হয়েছে কাঁদানে গ্যাস, পুলিশের ধাওয়া ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে। শিক্ষার্থী ইউনিয়নগুলো জরুরি ভিত্তিতে স্কুল সংস্কার কর্মসূচি, বড় পরিসরে শিক্ষক নিয়োগ, উন্নত সময়সূচি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিক্ষার্থীদের বেশি প্রতিনিধিত্ব দাবি করছে। তারা পারকুরসুপ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন অথবা সেটি বাতিলের দাবিও জানিয়েছে। এর পাশাপাশি আরও নার্স, মনোবিজ্ঞানী ও ক্যারিয়ার পরামর্শক নিয়োগের দাবি উঠেছে।
শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার গেফ্রে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্কুলগুলোতে প্রায় ৩ হাজার বিকল্প শিক্ষক পাঠানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু অক্টোবরের শেষ নাগাদ আরও বিস্তৃত পরিকল্পনা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর মধ্যে পরামর্শ প্রক্রিয়া ও ২০২৭ সালের বাজেটে কিছু সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে। তবে তিনি আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেছেন।
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাঁক্রো ধৈর্য্য ও সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে শিক্ষার্থী নেতারা সরকারের প্রাথমিক পদক্ষেপকে অপর্যাপ্ত বলে প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে আন্দোলন
বেলজিয়ামে অক্টোবরের শুরুতে টিউশন ফি সংস্কার, অতিরিক্ত শিক্ষার্থীভর্তি শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করে। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে কিছু শ্রেণির শিক্ষার্থীকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ১৯৪ ইউরো পর্যন্ত ফি দিতে হতে পারে।
লিয়েজ থেকে ব্রাসেলস এবং আরও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিশৃঙ্খল বিক্ষোভের সময় গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটে। ৯ অক্টোবর কৃচ্ছ্রসাধনের নীতির বিরুদ্ধে দেশব্যাপী শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর ধর্মঘটেও শিক্ষার্থীরা যোগ দেয়। এতে কয়েক দশক হাজার মানুষ অংশ নেন। ব্রাসেলস সেন্ট্রাল স্টেশনের কাছে বিচ্ছিন্ন কিছু সংঘর্ষে জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয় এবং আগুন লাগানোর ঘটনাও ঘটে।
আলবেনিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা, শিক্ষার ব্যয় ও সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ দুর্নীতি ও বৈষম্যবিরোধী বৃহত্তর বিক্ষোভের সঙ্গে মিশে গেছে।
দেশটিতে কয়েক মাস ধরে চলা ‘ফ্লেমিঙ্গো রেভল্যুশন’ এর সঙ্গেও এসব বিক্ষোভের যোগসূত্র তৈরি হয়েছে। এই আন্দোলন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিলাসবহুল উপকূলীয় রিসোর্ট প্রকল্পের বিরোধিতা করছে।

২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর আলবেনিয়ার তিরানায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় জ্বলন্ত একটি কিয়স্কের সামনে আলবেনিয়ার জাতীয় পতাকা হাতে বিক্ষোভকারীরা। ছবি: এএফপি
তিরানায় বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা সরকারি ভবন, ব্যাংক এবং অবকাঠামোতে হামলা চালায়। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও লাঠি ব্যবহার করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে ১০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। আহত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও ঘটে।
প্রধানমন্ত্রী এদি রামা পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বৈধ উদ্বেগগুলো সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবে সহিংসতার নিন্দা করেছেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার জন্য তার সরকারের প্রচেষ্টার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন।
গ্রিসে আবাসন সংকট নিয়ে বিক্ষোভ
গ্রিসে শিক্ষার্থীরা প্রায় ১৩ অক্টোবর এথেন্সের পার্লামেন্ট ভবনের বিপরীতে সিনতাগমা স্কয়ারে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান শুরু করে। তাদের প্রধান অভিযোগ দ্রুত বাড়তে থাকা বাসাভাড়া ও পর্যাপ্ত সরকারি আবাসনের অভাব।
ছোট একটি ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া ৫০০ থেকে ৬০০ ইউরো বা তারও বেশি হতে পারে। ফলে অনেক শিক্ষার্থীর নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বাসস্থান।
বিক্ষোভকারীরা ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, আরও শিক্ষার্থী আবাসন, ভর্তুকি বৃদ্ধি ও শিক্ষা খাতে বেশি অর্থ বরাদ্দ দাবি করছে। শিক্ষকসংকট ও খারাপ পরিবেশের প্রতিবাদে স্কুলে অবস্থান কর্মসূচিও বেড়েছে।
স্পেনে শিক্ষক ধর্মঘট
স্পেনে ১৪ অক্টোবর মাদ্রিদ অঞ্চলে অনির্দিষ্টকালের শিক্ষক ধর্মঘট শুরু হয়েছে। ‘মারেয়া ভের্দে’ বা ‘গ্রিন টাইড’ আন্দোলনের অধীনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং পরিবারগুলো এতে অংশ নিচ্ছে।
বিক্ষোভকারীরা সরকারি শিক্ষা খাতে বেশি অর্থ বরাদ্দ, ছোট শ্রেণিকক্ষ, বেশি বেতন, কম পাঠদানের সময় এবং আরও বিশেষায়িত কর্মী নিয়োগের দাবি জানিয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, আঞ্চলিক সরকার সরকারি স্কুলের ক্ষতির বিনিময়ে বেসরকারিকরণকে উৎসাহ দিচ্ছে।
ইতালিতেও স্কুল দখল
ইতালিতে তুরিন ও রোমের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন হাইস্কুল দখল করেছে। তারা ফ্রান্সের আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত স্লোগান ব্যবহার করছে এবং শিক্ষা খাতে অর্থের ঘাটতি, জরাজীর্ণ ভবন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ করছে।
দেশের আরও কয়েকটি স্থানে ছোট পরিসরের বিক্ষোভেও একই ধরনের উদ্বেগ উঠে এসেছে।
সুযোগের সংকট আরও বিস্তৃত হচ্ছে
ইউরোপজুড়ে এই বিক্ষোভগুলো কয়েক বছরের আর্থিক সীমাবদ্ধতা, শিক্ষক নিয়োগে সংকট ও পুরোনো অবকাঠামোর কারণে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর বাড়তে থাকা চাপকে সামনে এনেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়িভাড়া, জ্বালানি বিল ও দৈনন্দিন জীবনের খরচ বৃদ্ধি।
ফলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ক্রমেই আরও ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে উঠছে। তরুণরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েও হতাশা প্রকাশ করছে। তাদের অভিযোগ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আবাসনে বাধাগুলো দূর করতে সরকারগুলো যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
ফ্রান্সের বিক্ষোভকে ১৯৬৮ সালের মে মাসের ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। তবে বর্তমান আন্দোলনের মূল দাবি অনেকটাই বাস্তব ও দৈনন্দিন; স্কুলের অবস্থা, শিক্ষকসংকট ও শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের মতো বিষয়।
সরকারগুলো কিছু নির্দিষ্ট ছাড় দিয়ে আলোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা বাজেটের সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরছে। তবে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ, ব্যাপক গ্রেপ্তার এবং আহত হওয়ার ঘটনাগুলো তরুণদের নেতৃত্বাধীন এসব বিক্ষোভে কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে আরও প্রশ্ন তুলেছে।



