প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১০ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬। ০১:৪৩ পিএম
আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৬। ১৮:১৩ পিএম
স্কুলে শিক্ষক-কর্মচারীর ঘাটতি, জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে চলা বিক্ষোভ শনিবার ব্যাপক সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ভাঙচুর হয়েছে।
দেশজুড়ে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্তত ১৫০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তবে শ্রমিক সংগঠন সিজিটির দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ। অধিকাংশ মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও ছোট ছোট কয়েকটি দল সরকারি ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পুলিশের ওপর হামলা চালায়।
প্যারিসে বিকেলের দিকে মূল মিছিল অনেকটাই শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে যায়। মুখোশ ও কালো পোশাক পরা কয়েকটি দল পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে দাঙ্গা পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
শহরের বিভিন্ন সড়কে আগুন জ্বালানো হয় এবং কয়েকটি গাড়িতেও অগ্নিসংযোগ করা হয়। দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। গ্যালারি লাফায়েত ডিপার্টমেন্ট স্টোরে ঢোকার চেষ্টা করা হয়; কয়েকটি ব্যাংক, পোশাকের দোকান এবং একটি মোবাইল ফোনের দোকানেও হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
প্যারিসের ঐতিহাসিক প্লাস দ্য লা রিপাবলিকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আগুন ও সংঘর্ষ দেখা যায়। কেন্দ্রীয় প্যারিসে দাঙ্গা পুলিশকে বিক্ষোভকারীদের দিকে এগিয়ে যেতে এবং কয়েকজনকে লাঠি দিয়ে আঘাত করতেও দেখা গেছে।
রাজধানীর বাইরে সহিংসতা আরও কয়েকটি বড় শহরে ছড়িয়ে পড়ে। মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের লিমোজ শহরের টাউন হলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলে ভবনটির ছাদের একটি অংশ ধসে পড়ে। মার্সেইয়ে কালো পোশাক পরা একদল বিক্ষোভকারী সিটি হলে ঢুকে দেয়ালে গ্রাফিতি করে। লিওঁ শহরের পর্যটন দপ্তরেও আগুন দেওয়া হয়।
লিওঁর মেয়র গ্রেগরি দোসে শহরের পর্যটন দপ্তরে অগ্নিসংযোগকে মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য, ভবনটি শহরের পরিচিত ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর একটি।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, কয়েকটি এলাকায় দমকলকর্মীরা আগুন নেভাতে গেলেও সহিংস ব্যক্তিদের বাধার মুখে পড়েছেন।
গ্রেনোবল, আভিনিওঁ, পো, মঁপেলিয়ে ও ভালঁসসহ আরও কয়েকটি শহরে ভবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। লিল শহরের একটি অ্যাপল স্টোরেও ভাঙচুর ও লুটপাট হয়।
ছাত্রদের আন্দোলন যেভাবে দেশজুড়ে ছড়াল
ফ্রান্সে বর্তমান আন্দোলনের শুরু মূলত স্কুলের পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থেকে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশটির মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষক স্বল্পতা, জনবলের ঘাটতি, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং জরাজীর্ণ ভবনসহ বিভিন্ন সমস্যার প্রতিবাদ করছেন।
পরে শ্রমিক ইউনিয়ন, শিক্ষক, অভিভাবক, কর্মজীবী মানুষ, কৃষক, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকেরাও বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দেন। ফলে শিক্ষা খাতের দাবি ধীরে ধীরে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির মূল্য, বৈষম্য ও সরকারি সেবার মান নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।
২০১৮ সালে জ্বালানি কর ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন শুরু হয়েছিল। শনিবারের বিক্ষোভে আবারও অনেককে পরিচিত হলুদ জ্যাকেট পরে অংশ নিতে দেখা গেছে।
সরকার আন্দোলনকারীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি মেনে শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় পদক্ষেপও নিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার গেফ্রে ৮ অক্টোবর সবচেয়ে সংকটপূর্ণ স্কুলগুলোতে ৩ হাজার বিকল্প শিক্ষক দ্রুত মোতায়েনের ঘোষণা দেন। তবে সেই ঘোষণার পরও আন্দোলন থামেনি।
শনিবারের সহিংসতায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সাঁ-তেতিয়েনে এক তরুণ গুরুতর আহত হয়েছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি বিস্ফোরক বস্তু বিস্ফোরিত হয়ে তার একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একই ধরনের ঘটনায় পুলিশের ব্যবহৃত স্টান গ্রেনেড নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পুলিশি কৌশল নিয়ে অন্তত দুই ডজন অভিযোগ তদন্ত করছে সংশ্লিষ্ট নজরদারি সংস্থা।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু জানিয়েছেন, শনিবারের অস্থিরতায় ১৫০ জনের বেশি পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। সহিংসতার জন্য তিনি ‘অতি-বামপন্থী’ গোষ্ঠী ও অপরাধীদের দায়ী করেছেন। তার অভিযোগ, ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে কিছু গোষ্ঠী এই অস্থিরতাকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। এটি প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব মূল্যায়ন।
লেকর্নু বলেছেন, সহিংসতার মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না।
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁও ভাঙচুর, লুটপাট ও সরকারি ভবনে হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানো মানুষের অধিকার রক্ষার কথাও বলেছেন তিনি।
অন্যদিকে কট্টর বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশঁ পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছেন। একই সঙ্গে তিনি লুটপাট ও অগ্নিসংযোগেরও নিন্দা করেছেন।
ন্যাশনাল র্যালির নেত্রী মারিন ল্য পেন বলেছেন, আন্দোলনকারীদের কিছু দাবি ন্যায্য হলেও সহিংস গোষ্ঠী সেই আন্দোলনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। সহিংসতার দায় নিয়ে ফরাসি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগও চলছে।
ফ্রান্স এমন এক সময়ে এই অস্থিরতার মুখে পড়েছে, যখন দেশটি ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে এবং অর্থনীতি, সরকারি ঋণ ও জনসেবায় ব্যয়ের প্রশ্নে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।
শনিবার ফ্রান্সের বাইরেও ইউরোপের কয়েকটি দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় ও অন্যান্য ইস্যুতে বিক্ষোভ হয়েছে। বেলজিয়াম, পর্তুগাল ও ইতালিতে তুলনামূলক ছোট কর্মসূচি হয়। ইতালির কিছু শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষও হয়েছে। আলবেনিয়ায় দুর্নীতি, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা নিয়ে চলমান ছাত্র আন্দোলনও অব্যাহত ছিল।
ফ্রান্সের বর্তমান আন্দোলনে এখন দুটি চিত্র পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে; একদিকে লাখ লাখ মানুষের শান্তিপূর্ণভাবে শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে প্রতিবাদ, অন্যদিকে কিছু এলাকায় সহিংসতা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ। শনিবারের ঘটনায় বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তার ও পুলিশের আহত হওয়ার সংখ্যা পরিস্থিতির তীব্রতাই সামনে এনেছে।



