Logo
Logo
×
ঝুঁকিপূর্ণ পাইলট কীভাবে শনাক্ত করে এয়ারলাইনস

পাইলটদের প্রশিক্ষনের পাশাপাশি বিভিন্ন কায়দায় চলে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ

ইনসাইট ।  এক্সপ্লেইনার

ঝুঁকিপূর্ণ পাইলট কীভাবে শনাক্ত করে এয়ারলাইনস

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬। ০৫:২৩ পিএম

আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৬। ১৫:০৩ পিএম

উড়োজাহাজ আকাশে ওঠার পর এর পাইলটের জিম্মায় চলে যায় সব আরোহী। তিনি উড়োজাহাজে হঠাৎ এমন কিছু করবেন, যা আরোহিদের জীবন বিপন্ন করে দিতে পারে। আর বিমান চলাচল শিল্পের জন্য এটি ভয়াবহ এক আশঙ্কা।

২০১৫ সালে জার্মানউইংস এয়ারলাইনের এক কো-পাইলট ফ্রান্সের আল্পসে ইচ্ছাকৃতভাবে উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত করে। ওই দুর্ঘটনায় উড়োজাহাজে থাকা ১৫০ জনই নিহত হন। মূলত ওই ঘটনার পরই বিশ্বজুড়ে পাইলটদের মানসিক স্বাস্থ্য, আচরণ ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি যাচাইয়ে নিয়ম আরও কঠোর করা হয়।

কিন্তু ঘটনার এক দশক পরও বিষয়টি পুরোপুরি মেটেনি। নতুন নতুন আরও প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে। একজন পাইলট যদি ধীরে ধীরে মানসিকভাবে অস্থিতিশীল হয়ে পড়েন, কিংবা চরমপন্থী মতাদর্শে ঝুঁকে যান, সেটি কি সময়মতো ধরা সম্ভব?

ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইট ১০৭৩-এ সাম্প্রতিক হামলার পর এসব প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ বলছে, ওই ফ্লাইটের কো-পাইলট ককপিটে কুঠার দিয়ে ক্যাপ্টেনের ওপর হামলা করেন ও উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। ঘটনাটিকে তারা “সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের চেষ্টা” হিসেবে বর্ণনা করেছে।

বিমান চলাচল খাতে প্রতি বছর লাখ লাখ ফ্লাইট নিরাপদে পরিচালিত হয়। তারপরও এমন বিচ্ছিন্ন ঘটনা দেখিয়ে দেয়, নিরাপত্তাব্যবস্থার ফাঁকফোকর কোথায় থাকতে পারে।

পরীক্ষায় কি সব ধরা পড়ে

বর্তমানে পাইলট হতে চাইলে প্রার্থীদের একাধিক স্তরের যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এর মধ্যে থাকে মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপত্তাজনিত ব্যাকগ্রাউন্ড চেক ও নিয়মিত চিকিৎসা মূল্যায়ন।

প্রতি বছর পাইলটদের মেডিকেল পরীক্ষাও দিতে হয়। সেখানে শুধু শারীরিক সক্ষমতা নয়, তাদের মানসিক অবস্থাও বিবেচনায় নেওয়া হয়। বিষণ্নতা, আত্মহত্যাপ্রবণতা, মাদক বা অ্যালকোহল ব্যবহারের বিষয়েও প্রশ্ন করা হতে পারে।

এয়ারলাইনসগুলো নিয়মিত ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করে, যেখানে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা ঝুঁকি বা উগ্রপন্থার প্রতি সহানুভূতির কোনো লক্ষণ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়।

একটি এয়ারলাইনসের এক নির্বাহী ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, “আমরা নিয়মিত সাইকোমেট্রিক পরীক্ষা ও নিরাপত্তাজনিত যাচাই করি।”

কিন্তু সমস্যা হলো, এসব পরীক্ষার বড় একটি অংশ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ওপর।

এবিষয়ে বাণিজ্যিক ফ্লাইটের এক পাইলট বলেন, “এটা অনেকটাই আত্মঘোষণার মতো। কোন উত্তর দিলে সব ঠিকঠাক দেখাবে, সেটা মানুষ জানে।”

কর্মরত আরেক পাইলট জানান, তার সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন হয়েছিল দুই দশকেরও বেশি আগে।

আরেকজন বলেন, অনেকে বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার আগে ‘প্রস্তুতি’ নেন; কীভাবে উত্তর দিলে পরীক্ষকের মনে হবে সব স্বাভাবিক আছে, তা তারা জানেন।

সমস্যা লুকানোর প্রবণতা কেন

পাইলটদের জন্য মেডিকেল সার্টিফিকেট শুধু একটি স্বাস্থ্য সনদ নয়; এটি তাদের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

৩০ বছর পাইলট হিসেবে কাজ করার পর বর্তমানে বিমান নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন অ্যান্ড্রু ম্যাককেকনি। তার মতে, এটাই সমস্যার একটি বড় জায়গা।

তিনি বলেন, একজন পাইলট যদি মনে করেন মানসিক সমস্যার কথা বললে তার মেডিকেল সার্টিফিকেট ঝুঁকিতে পড়বে, তাহলে তিনি সাহায্য চাইতে দ্বিধা করতেই পারেন।

অর্থাৎ, যে ব্যবস্থা সমস্যাকে চিহ্নিত করার জন্য তৈরি, কখনো কখনো সেটিই সমস্যা লুকিয়ে রাখার প্রণোদনা তৈরি করতে পারে।

পাইলট প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত একজন বলেন, “আপনি সহজে বলতে পারেন না যে আপনার সমস্যা আছে।”

তার মতে, অটিজম, অ্যাটেনশন ডেফিসিট ডিসঅর্ডার বা বিষণ্নতায় ভোগা অনেকে ভয় পান। এগুলো প্রকাশ করলে হয়তো তাদের ক্যারিয়ারই বিপদে পড়বে।

সহকর্মীদের নজরদারি

২০১৫ সালের জার্মানউইংস দুর্ঘটনার পর অধিকাংশ এয়ারলাইনস আরেকটি ব্যবস্থা জোরদার করে। কোনো পাইলট বা ক্রু সদস্য যদি মনে করেন তার সহকর্মীর আচরণ নিয়ে উদ্বেগের কারণ আছে, তাহলে তিনি গোপনে রিপোর্ট করতে পারেন।

২০১৫ সালে ফ্রান্সের আল্পসে জার্মানউইংসের উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে ১৫০ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় তদন্তকারীরা জানান, পাইলটের ইচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ডেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ

এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিমান চলাচল খাতে একই ক্রু দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেন না। রোস্টার নিয়মিত বদলায়। ফলে পাইলট, কো-পাইলট ও কেবিন ক্রুর অনেকেই উড্ডয়নের কয়েক ঘণ্টা আগেই প্রথমবার একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হন।

দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক পাইলট বলেন, “খুব দ্রুত একটি দল হিসেবে কাজ করতে পারাটা এই পেশার অংশ।”

সহকর্মীর রিপোর্টের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচরণ বা মানসিক অবস্থার বিষয়ে তদন্ত হতে পারে। প্রয়োজনে তাকে চিকিৎসা বা মানসিক সহায়তাও দেওয়া হয়।

খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি বলছেন, এই ব্যবস্থায় বাস্তব সুফল পাওয়া গেছে।

তবে অপব্যবহারের অভিযোগও আছে। ব্যক্তিগত বিরোধ, এমনকি প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার ঘটনাও এই শিল্পে শোনা যায়।

পাইলটের জীবন কতটা চাপের

পাইলটের চাকরি বাইরে থেকে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে আছে অনিয়মিত ঘুম, দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকা ও প্রায় স্থায়ী জেটল্যাগ।

একজন পাইলট বলেন, “নিজের সঙ্গে একা থাকতে যদি স্বচ্ছন্দ না হন, দিনের পর দিন হোটেল রুমে থাকা খুব চাপের হয়ে উঠতে পারে।”

তবে অন্যদের মতে, চাকরির চাপের চেয়ে ব্যক্তিগত জীবনের বড় ঘটনা অনেক সময় বেশি প্রভাব ফেলে। বিবাহবিচ্ছেদ, প্রিয়জনের মৃত্যু বা বড় ধরনের পারিবারিক সংকট একজন মানুষের মানসিক অবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিচালনা করা সাবেক এক পাইলট বলেন, “সবচেয়ে কঠিন হলো তাদের মূল্যায়ন করা, যারা জীবনে বড় কোনো ধাক্কা খাওয়ার পর আচরণে বদলে যান।”

আবার অনেকে পাইলটের জীবনকে মানসিকভাবে মুক্তির জায়গা হিসেবেও দেখেন।

একজন দীর্ঘপাল্লার ফ্লাইটের পাইলট বলেন, “প্রতিদিন সূর্য দেখা যায়, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে যাওয়া যায়, যেখানে কেউ আপনাকে চেনে না।”

আরেকজন পাইলট এই শিল্পে প্রচলিত একটি রসিকতা করে বলেন, “সবচেয়ে বেশি চাপ থাকে শূন্য ফুট উচ্চতায়; অর্থাৎ মাটিতে।”

ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনা কী বদলাতে পারে

ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, ফ্লাইট ১০৭৩-এর ঘটনা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ সরকারি তদন্ত চলছে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী গাইথ আল গাইথ বলেন, “তদন্তকে সত্য উদঘাটনের সুযোগ দেওয়া জরুরি। নিরাপত্তা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ছিল এবং থাকবে।”

তদন্ত শেষ হওয়ার আগে পাইলট যাচাইব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চায়নি এয়ারলাইনসটি।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল হামাদ সাইফ আল-শামসি বলেছেন, কো-পাইলট ককপিটে ক্র্যাশ অ্যাক্স দিয়ে ক্যাপ্টেনের ওপর হামলা করেন এবং উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন।

তদন্তে ঘটনার পূর্ণ প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য এবং অন্য কারও সঙ্গে কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।

বার্কলেসের এয়ারলাইনস বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু লবেনবার্গ মনে করেন, এই ঘটনা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও এয়ারলাইনসগুলোকে আবারও কয়েকটি পুরোনো প্রশ্নে ফিরিয়ে নিতে পারে।

এর মধ্যে রয়েছে; পাইলটদের কত ঘন ঘন মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা হওয়া উচিত, নিরাপত্তা যাচাই কতটা গভীর হওয়া দরকার, এবং ককপিটে শুধু দুই পাইলট থাকলে ফ্লাইট কন্ট্রোলে কার কতটা প্রবেশাধিকার থাকা উচিত।

তবে শুধু পরীক্ষা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে; এমন ধারণায় সন্দিহান অ্যান্ড্রু ম্যাককেকনি।

তার যুক্তি, এসব মূল্যায়ন অনেকটাই ধরে নেয় যে কেউ যদি নাশকতা বা হত্যার পরিকল্পনা করে, তাহলে তিনি কোনো না কোনো পর্যায়ে সহকর্মী, চিকিৎসক বা কাউন্সেলরের কাছে তার মানসিক অবস্থার ইঙ্গিত দেবেন।

ম্যাককেকনির মতে, এটি সবসময় বাস্তবসম্মত নয়।

অন্যদিকে বিমান নিরাপত্তা খাতের একটি অংশ মনে করে, নিয়মিত এবং ঘন ঘন মূল্যায়নই ঝুঁকি কমাতে পারে।

ইসরায়েলি এয়ারলাইন এল আলের সাবেক নিরাপত্তাপ্রধান আরিক আরাদ বলেন, পাইলটদের শুধু নিয়োগের সময় নয়, পরবর্তী সময়েও নিয়মিত মনস্তাত্ত্বিক ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে নেওয়া উচিত।

তার মতে, প্রয়োজনে প্রতি ছয় মাস পরপর এমন মূল্যায়ন করা যেতে পারে; যাতে কেউ ধীরে ধীরে বিপজ্জনক আচরণ, মানসিক সংকট বা চরমপন্থী অবস্থানের দিকে চলে যাচ্ছেন কি না, তা আগেই বোঝা যায়।

ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনা সেই পুরোনো সমস্যাকেই আবার সামনে এনেছে। আকাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি ও নিয়ম যতই শক্তিশালী হোক, শেষ পর্যন্ত ককপিটে বসে থাকেন মানুষ। আর মানুষের আচরণ পুরোপুরি আগেভাগে অনুমান করা এখনো সবচেয়ে কঠিন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।

আরও পড়ুন

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে