প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫০ এএম
ইসরায়েলগামী একটি ফ্লাইদুবাই ফ্লাইটের ক্যাপ্টেনের ওপর হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত কো-পাইলটকে ওমানের নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কথিত উগ্রপন্থী মতাদর্শ নিয়ে উদ্বেগের কারণে এর আগে নিজ দেশ ওমানে তাকে বিমান চালানো থেকে বিরত রাখা হয়েছিল।
তবে পাইলটের পরিচয় কিংবা তার বিশ্বাস ও মতাদর্শ সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সংযুক্ত আরব আমিরাত শনিবার জানিয়েছে, বুধবার ফ্লাইট এফজেড১০৭৩-এ ঘটে যাওয়া ঘটনাটি ছিল একটি “সন্ত্রাসী অভিযান” চালানোর চেষ্টা। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, কো-পাইলট জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত একটি কুঠার দিয়ে ভারতীয় নাগরিক ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের ওপর হামলা করে উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন।
তবে হামলার উদ্দেশ্য কী ছিল এবং এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, তা এখনো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ঘটনাটি পাইলট নিয়োগ ও যাচাই প্রক্রিয়া এবং বিমান চলাচল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অভিযুক্ত পাইলট সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে
দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ১৭৪ আরোহীবাহী ফ্লাইটটির ক্যাপ্টেনের ওপর হামলায় সন্দেহভাজন কো-পাইলটের নাম হামাম আল-হাম্মামি। পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত তিন ব্যক্তি, যাদের মধ্যে একজন উপসাগরীয় অঞ্চলের ও একজন পশ্চিমা দেশের কূটনীতিক, বার্তা সংস্থা এপিকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় তারা সবাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলের ওই কূটনীতিক জানান, আল-হাম্মামি একাই এ হামলা চালিয়েছিলেন, নাকি কোনো উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল; তা জানতে তদন্ত চলছে।
একটি সূত্র ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে সিএনএন জানিয়েছে, আল-হাম্মামি ওমানের নাগরিক। সংযুক্ত আরব আমিরাতে তার জন্ম ও তার মা সিরিয়ার নাগরিক। জীবনের বেশ কয়েক বছর তিনি আমিরাতে কাটিয়েছেন।
ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেওয়ার আগে তার বিমান চালনা পেশায় কোনো সতর্কসংকেত ছিল কি না, তা নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল শুক্রবার জানায়, কথিত উগ্রপন্থী মতাদর্শ নিয়ে উদ্বেগের কারণে ওমানের কর্তৃপক্ষ এর আগে তাকে দেশটিতে বিমান চালানো থেকে নিষিদ্ধ করেছিল।
তবে তার কথিত মতাদর্শ আসলে কী ছিল কিংবা ওমান এ বিষয়ে অন্য দেশ বা কোনো বিমান সংস্থাকে সতর্ক করেছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে আঞ্চলিক এক কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, একই ধরনের উদ্বেগের কারণে আল-হাম্মামিকে ফ্লাইট প্রশিক্ষণ থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে তাকে অন্য একটি পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সিএনএন আরও জানায়, আল-হাম্মামির নামে থাকা একটি লিংকডইন প্রোফাইলে উল্লেখ রয়েছে যে, তিনি সাত বছর ওমান এয়ারে কাজ করার পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটি ছাড়েন। এরপর একই বছরের জুনে রয়্যাল এয়ার মারোকে যোগ দেন ও গত জানুয়ারিতে সেখান থেকেও চলে যান।
আল-হাম্মামি যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন।
প্রেস অ্যাসোসিয়েশনকে দেওয়া বিবৃতিতে বাকিংহামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটির একজন মুখপাত্র বলেন, “এই ঘটনায় আহত পাইলট, ক্রু ও যাত্রীদের প্রতি আমাদের সমবেদনা রয়েছে।”
তিনি বলেন, “হামাম আল-হাম্মামি এর আগে এভিয়েশন ম্যানেজমেন্টের একটি কোর্স করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি কোনো পাইলট প্রশিক্ষণ নেননি।”
ফ্লাইট এফজেড১০৭৩-এ কী ঘটেছিল
ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৭টা ৫ মিনিটে ফ্লাইট এফজেড১০৭৩ দুবাই থেকে তেল আবিবের উদ্দেশে যাত্রা করে। একপর্যায়ে উড়োজাহাজটি ৩৪ হাজার ফুটের বেশি, অর্থাৎ ১০ হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতায় ওঠে।
দুই ঘণ্টার কিছু বেশি সময় পর হঠাৎই উড়োজাহাজটি নিচে নামতে শুরু করে। দ্রুত উচ্চতা হারানোর পর আবার ওপরে উঠে এবং এরপর ফের নিচে নামতে থাকে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে উড়োজাহাজটি ১৭ হাজার ফুটের বেশি নিচে নেমে যায়। পরে আবার উচ্চতা অর্জন করে এবং ফের নিচের দিকে যেতে থাকে।
এরই মধ্যে ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, কো-পাইলট ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা করেন।
পরে মাচ্ছার জানান, গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি যখন ককপিটের মেঝেতে পড়ে ছিলেন, তখন উড়োজাহাজটি দ্রুত নিচের দিকে নামছিল।
আবুধাবির একটি হাসপাতাল থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তিনি বলেন, “আমি যখন নিচে পড়ে ছিলাম, তখন বুঝতে পারছিলাম উড়োজাহাজটি দ্রুত নিচে নামছে। আমি জানতাম, কিছু করার এটাই শেষ সুযোগ।”
তিনি বলেন, “আমি বুঝতে পারছিলাম উড়োজাহাজ নিচে চলে যাচ্ছে। আমি মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলাম। তখন নিজেকে বললাম, দরজা তো সামনেই, শুধু খুলতে হবে। কোনোভাবে আমি সেটি খুলতে পারি এবং লোকজন ভেতরে ঢোকে।”
এরপর যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা ককপিটে প্রবেশ করে কো-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনেন।
একপর্যায়ে উড়োজাহাজটি প্রায় ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় স্থিতিশীল হয়। পরে এর ট্রান্সপন্ডার কোড ৭৫০০-এ পরিবর্তন করা হয়। এই কোড উড়োজাহাজে বেআইনি হস্তক্ষেপ বা ছিনতাইয়ের সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ফ্লাইটে থাকা দুই রিজার্ভ পাইলট এরপর উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাবুকে অবতরণ করান।
স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে উড়োজাহাজটি নিরাপদে অবতরণ করে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, দুই পাইলটকেই হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকের ছাড়পত্র পাওয়ার পর তাদের আবুধাবিতে স্থানান্তর করা হয়।
হামলা নিয়ে কী বলেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত
সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল হামাদ সাইফ আল-শামসি শনিবার জানান, তদন্তকারীরা প্রাথমিকভাবে মনে করছেন, কো-পাইলট পরিকল্পিত “সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড” বাস্তবায়ন শুরু করেছিলেন।
আল-শামসির ভাষ্য অনুযায়ী, কো-পাইলট উড়োজাহাজের জরুরি ক্র্যাশ অ্যাক্স বা কুঠার ব্যবহার করে ককপিটের ভেতর ক্যাপ্টেনের ওপর হামলা করে “উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন”।
ক্র্যাশ অ্যাক্স হলো জরুরি পরিস্থিতিতে উড়োজাহাজের কোনো অংশ কেটে বের হওয়ার প্রয়োজন হলে পাইলটদের ব্যবহারের জন্য ককপিটে রাখা বিশেষ ধরনের হাতিয়ার।
বৃহস্পতিবার আল-শামসি তদন্তকারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ঘটনাটির সঙ্গে “সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা উদ্দেশ্যের” কোনো যোগসূত্র ছিল কি না কিংবা আগে থেকেই কোনো পরিকল্পনা বা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত এখনো প্রকাশ্যে হামলার কোনো উদ্দেশ্য নিশ্চিত করেনি। আল-হাম্মামি একাই কাজ করেছিলেন কি না, সে বিষয়েও তদন্তকারীরা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানাননি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ শনিবার বলেন, সর্বশেষ এই “সন্ত্রাসী” হামলা নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে যে উগ্রবাদের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের লড়াই এখনো শেষ হয়নি।
সোশালমিডিয়া এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, “এই ঘটনা সংযুক্ত আরব আমিরাতের শুরু থেকেই নেওয়া দৃঢ় অবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে। উগ্রবাদের প্রতি কোনো সহনশীলতা নয় এবং এর বক্তব্যের প্রতিও কোনো ছাড় নয়। ঘৃণার মোকাবিলা ও উগ্রবাদের উৎস বন্ধ করার মধ্য দিয়ে নিরাপত্তার শুরু।”
তদন্ত কোন পর্যায়ে
আবুধাবি এখন তদন্তে নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রসিকিউটররা হামলার পরিস্থিতি, উদ্দেশ্য এবং অন্য কারও সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ বা সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছেন।
এর আগে আল-শামসি বলেছিলেন, উড়োজাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিবন্ধিত এবং দেশটির পতাকার অধীনে পরিচালিত হওয়ায় এ ঘটনার বিচারিক এখতিয়ার আমিরাতের কর্তৃপক্ষের।
তিনি আরও বলেন, উড়োজাহাজে সংঘটিত অপরাধ দেশের সীমানার বাইরে ঘটলেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইন প্রযোজ্য হবে।
শনিবার আল-শামসি জানান, তদন্তকারীরা “ঘটনার সব পরিস্থিতি, উদ্দেশ্য ও সংশ্লিষ্ট যোগসূত্র উদ্ঘাটনের পাশাপাশি কারিগরি পরীক্ষা এবং বিভিন্ন ভৌত ও ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ করছেন।”
প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব তদন্তের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে তদন্ত চলাকালে ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইটগুলো স্থগিত রয়েছে।



