Logo
Logo
×
বোয়িংয়ের নকশাই কি বাঁচাল ফ্লাইদুবাইয়ের বিমান

ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজ। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ

ইনসাইট ।  এক্সপ্লেইনার

বোয়িংয়ের নকশাই কি বাঁচাল ফ্লাইদুবাইয়ের বিমান

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬। ০৭:৪৬ পিএম

আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৬। ১৪:২০ পিএম

উড়োজাহাজটি একপর্যায়ে প্রায় খাড়াভাবে নিচে নামছিল। আর ককপিটে চলছিল দুই পাইলটের লড়াই। মাত্র কয়েক মিনিটে হাজার হাজার ফুট উচ্চতা হারাচ্ছিল ফ্লাইদুবাইয়ের বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স।

তারপরও সেটি ভেঙে পড়েনি।

বরং ভয়াবহ সেই পতন সামলে শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবে নিরাপদে অবতরণ করে উড়োজাহাজটি। বেঁচে যান ১৭০ জনের বেশি আরোহী।

ঘটনার পর আলোচনার পুরোটা জুড়েই ছিল ককপিটে দুই পাইলটের মরিয়া লড়াই এবং দ্রুত নিচে নামতে থাকা উড়োজাহাজটিকে সামাল দিতে যাত্রী ও রিজার্ভ ক্রুদের ভূমিকা।

কিন্তু আরেকটি বিষয়ও এখন নজর কাড়ছে। আর সেটি হলো; উড়োজাহাজটি নিজেই কীভাবে এমন পরিস্থিতি সহ্য করল।

দুই পাইলট যখন ককপিটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়ছিলেন, তখন বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজটি একপর্যায়ে প্রায় খাড়াভাবে নিচে নেমে যায়। এমন ভয়াবহ গতিবিধিতে উড়োজাহাজটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে।

ওই ঘটনার পর সোশাল মিডিয়ায় বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ নকশা নিয়ে প্রশংসাও দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও অনলাইনে বোয়িংয়ের নকশার প্রশংসা করেছেন।

তদন্তকারীরা এখনো ঘটনার পূর্ণ চিত্র বের করার চেষ্টা করছেন। তবে একজন পরীক্ষামূলক পাইলটের বক্তব্য এবং উড়োজাহাজটির নকশাগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, বিমান চলাচলে বহুস্তরের বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং হয়তো কিছুটা ভাগ্য উড়োজাহাজটি ও তাতে থাকা ১৭০ জনের বেশি মানুষের জীবন রক্ষা করেছে।

প্রাথমিক তথ্য বলছে, কো-পাইলট তার সহকর্মীর ওপর হামলা করার পর উড়োজাহাজটি প্রথমে দ্রুত নিচে নামে, পরে হঠাৎ ওপরে উঠে আবারও নিচে নামতে শুরু করে। এ সময় কয়েকজন যাত্রী উড়োজাহাজের সামনের দিকে ছুটে যান। তারা আহত পাইলটের কাছ থেকে হামলাকারীকে সরিয়ে দেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করেন। এরপর উড়োজাহাজটির দ্রুত পতনও থামানো সম্ভব হয়। এর আগে হঠাৎ নিচে নামার ঘটনায় পুরো কেবিনে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল।

উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের তাবুকে অবতরণের পর সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া (যাচাই না করা) কয়েকটি ছবিতে দেখা যায়, এর রাডারের একটি অংশ ছিড়ে গেছে।

রাডার হলো উড়োজাহাজের লেজে থাকা গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পৃষ্ঠ। এটি ডানা কাত না করেও উড়োজাহাজের নাক কোন দিকে থাকবে, তা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে উড়োজাহাজটি প্রতি মিনিটে ৩২ হাজার ফুটেরও বেশি গতিতে নিচে নামছিল।

এমন তীব্র পতন থেকে উড়োজাহাজকে টেনে তুলতে গেলে যাত্রীদের ওপর প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় চাপ বা ‘জি-ফোর্স’ পড়ার কথা। আর এমন ধরনের চাপ সাধারণত যুদ্ধবিমানের পাইলট বা নভোচারীদের সহ্য করতে হয়।

কতটা চাপ সহ্য করতে পারে একটি উড়োজাহাজ

কোনো উড়োজাহাজকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার আগে এমন অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পরীক্ষা করা হয়, যা স্বাভাবিক ফ্লাইটে কখনো ঘটবে বলেই ধরে নেওয়া হয় না।

ঘটনায় ব্যবহৃত বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স হলো ১৯৬০-এর দশকে প্রথম অনুমোদন পাওয়া বোয়িংয়ের বহুল ব্যবহৃত একক-আইল ৭৩৭ পরিবারের সর্বশেষ ও তুলনামূলক বেশি জ্বালানিসাশ্রয়ী সংস্করণ। এতে আধুনিক ইঞ্জিন ও অ্যাভিওনিকস যুক্ত করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সাবেক পরীক্ষামূলক পাইলট বব স্টোনি বলেন, “এত চরম সীমা পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয় কেন? কারণ অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো উড়োজাহাজ সেই সীমা অতিক্রম করতে পারে।”

স্টোনি বোয়িং ৭৩৭-৯০০ইআরসহ একাধিক উড়োজাহাজের ফ্লাইট টেস্টিংয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। গত দশকে দুটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পর ৭৩৭ ম্যাক্সকে আবার আকাশে ফেরানোর প্রক্রিয়াতেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

উড়োজাহাজ অনুমোদনের সময় শুধু আকাশেই নয়, মাটিতেও কঠিন পরীক্ষা করা হয়। এমনকি ডানায় ইচ্ছাকৃতভাবে এত চাপ দেওয়া হয় যে সেটি ভেঙে যাওয়ার পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমান চলাচল বিধিমালা অনুযায়ী, বড় বাণিজ্যিক উড়োজাহাজকে তাদের ঘোষিত স্বাভাবিক সর্বোচ্চ পরিচালনগতির চেয়েও অনেক বেশি গতিতে পরীক্ষা করতে হয়।

এফএএর তথ্য অনুযায়ী, বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮-এর স্বাভাবিক সর্বোচ্চ পরিচালনগতি ঘণ্টায় প্রায় ৬৩০ মাইল বা এক হাজার কিলোমিটার। তবে উচ্চতা ও আবহাওয়ার ওপর এই সীমা বদলাতে পারে।

ফ্লাইটরাডার২৪ এর প্রাথমিক তথ্য বলছে, ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজটি পতনের সময় ঘণ্টায় প্রায় ৬৯০ মাইল গতিতে পৌঁছেছিল।

ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইটের কোলাজ। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ

রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হলে কতটা বিপদ

রাডারের মতো কোনো ফ্লাইট কন্ট্রোল সারফেস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সাধারণত গুরুতর ঘটনা। এতে উড়োজাহাজের স্বাভাবিক ওড়ার ধরন বদলে যেতে পারে এবং ভেতরে থাকা সবার জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

স্টোনি জানান, উড়োজাহাজ অনুমোদনের সময় রাডার আটকে গেলে কী হবে, তার পরীক্ষা করার নিয়ম রয়েছে। তবে পুরো রাডারই যদি হারিয়ে যায়, এমন পরিস্থিতি পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা নেই।

তবে বায়ুগতিবিদ্যার দিক থেকে দুই পরিস্থিতির মধ্যে কিছুটা মিল আছে। কারণ উভয় ক্ষেত্রেই পাইলটকে কার্যত রাডার ছাড়া উড়োজাহাজ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

স্টোনির ভাষায়, ৭৩৭-এর মতো বড় উড়োজাহাজে অবতরণের সময় রাডারের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রবল বাতাস থাকলে কিংবা বাতাস রানওয়ের সরলরেখা বরাবর না বইলে রাডার ছাড়া অবতরণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

তবে তার মতে, ডানা বা লেজের ফ্ল্যাপ হারালে পরিস্থিতি সাধারণত আরও কঠিন হয়।

ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনার সময় উড়োজাহাজে থাকা অফ-ডিউটি পাইলটদের যে অনেকগুলো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল, ক্ষতিগ্রস্ত রাডার সম্ভবত ছিল তার একটি।

আহত হয়েও ককপিটের দরজা খুলেছিলেন ক্যাপ্টেন

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ছুরিকাঘাতে আহত হওয়ার পরও ক্যাপ্টেন ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। নিরাপত্তার কারণে এই দরজা শুধু ভেতর থেকেই খোলা যায়।

দরজা খোলার পর যাত্রীরা এগিয়ে আসেন। এরপর ফ্লাইটে থাকা অফ-ডিউটি পাইলটরা উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেন।

হাসপাতাল থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শুক্রবার ফোনালাপে ফ্লাইদুবাইয়ের ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার বলেন, “আমি ১৭ বছর ধরে পাইলট। গত ১১ বছর ধরে ক্যাপ্টেন হিসেবে কাজ করছি। চোখ বন্ধ করেও বুঝতে পারি ফ্লাইটে কী ঘটছে।”

তিনি বলেন, “আমি যখন মেঝেতে পড়ে ছিলাম, তখন বুঝতে পারলাম উড়োজাহাজ নিচে নামছে। তখন নিজেকে বললাম, স্মিত, এটাই শেষ চেষ্টা। দরজাটা তো ঠিক সেখানেই।”

টিভি দেখে শেখা কৌশল কাজে লাগালেন যাত্রী

নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে এক যাত্রী দাবি করেছেন, তিনিই প্রথম ককপিটে পৌঁছেছিলেন।

ইয়ানিভ হায়ুন নামের ওই যাত্রী বলেন, তিনি প্রথমে আহত ক্যাপ্টেনের ওপর থেকে হামলাকারীকে সরিয়ে দেন। এরপর উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণযন্ত্র নিজের দিকে টেনে ধরে দ্রুত পতন থামানোর চেষ্টা করেন।

তার দাবি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান এয়ার ক্র্যাশ ইনভেসটিগেশন নিয়মিত দেখার কারণেই তিনি জানতেন, এমন পরিস্থিতিতে কী করতে হয়।

বোয়িং ৭৩৭-এ উড়োজাহাজ নিয়ন্ত্রণের জন্য মাঝখানে শিংয়ের মতো দেখতে দুটি স্টিয়ারিং ইয়োক থাকে।

অন্যদিকে এয়ারবাস এ৩২০-তে পাইলটের আসনের পাশে থাকা সাইডস্টিক দিয়ে উড়োজাহাজ চালানো হয়। কোনো অপেশাদারের জন্য বোয়িংয়ের ইয়োক হয়তো তুলনামূলক বেশি স্বাভাবিক বা পরিচিত মনে হতে পারে।

নিরাপত্তাব্যবস্থা, নাকি ভাগ্য

বিমান চলাচলের ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যেখানে বহুস্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও বিকল্প প্রযুক্তি বড় দুর্ঘটনা ঠেকিয়েছে।

আবার এমন ঘটনাও আছে, যেখানে নিরাপদ পরিণতি আর বিপর্যয়ের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে প্রায় অলৌকিক কিছু পরিস্থিতি। এর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণগুলোর একটি ২০০৯ সালের ‘মিরাকল অন দ্য হাডসন’।

একঝাঁক পাখি ইঞ্জিনে ঢুকে পড়ায় ইউএস এয়ারওয়েজের একটি এয়ারবাস এ৩২০-এর দুটি ইঞ্জিনই বিকল হয়ে যায়। এরপর উড়োজাহাজটি নিউইয়র্কের হাডসন নদীতে জরুরি অবতরণ করে। তাতে থাকা ১৫৫ জনই বেঁচে যান।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড পরে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলেছিল, ঘটনাটিকে একটি “সফল” পানিতে জরুরি অবতরণ হিসেবে দেখা হয়েছে।

তবে তদন্তে উঠে আসে, এই সাফল্যের পেছনে কয়েকটি সৌভাগ্যজনক পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা রেখেছিল।

পাইলটের প্রায় ২০ হাজার ঘণ্টার উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা ছিল। উড়োজাহাজে অতিরিক্ত স্লাইড ও লাইফ র‌্যাফট ছিল। আর উড়োজাহাজটি এমন জায়গায় পানিতে নেমেছিল, যেখানে কাছাকাছি অনেক বড় নৌযান ছিল এবং তারা দ্রুত উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসে।

নিরাপদ পরিণতি দেখে যেন বিমান চলাচল খাত আত্মতুষ্টিতে না ভোগে, সে বিষয়ে সতর্ক করে ওই প্রতিবেদনের শেষে বলা হয়েছিল; “তদন্তে এমন কয়েকটি ক্ষেত্র চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থার আরও উন্নতি প্রয়োজন।”

ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনাটিও হয়তো একই শিক্ষা সামনে আনছে। উড়োজাহাজের নকশা, বহুস্তরের ব্যাকআপ ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত পাইলট এবং যাত্রীদের হস্তক্ষেপ; সবকিছু মিলেই হয়তো একটি ভয়াবহ বিপর্যয় এড়ানো গেছে। কিন্তু তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঠিক কোন বিষয়টি কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

আরও পড়ুন

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে