Logo
Logo
×
জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধে ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড

ছবি: বাংলাবাজার ইলাস্ট্রেশন

খবর ।  আইন-আদালত

জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধে ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ১২:৫২ পিএম

আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ১৬:৩২ পিএম

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। সাত আসামির সবাই পলাতক।

মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অন্য ছয় আসামি হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

এর আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গত বছরের ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। প্রায় ১০ মাস পর একই প্রেক্ষাপটের মামলায় দলটির সাধারণ সম্পাদকসহ সাতজনের রায় এলো।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। মঙ্গলবারের রায়টি এসব ঘটনায় সপ্তম রায়।

দুটি ট্রাইব্যুনালের সাতটি রায়ে এখন পর্যন্ত ৬৮ আসামিকে বিভিন্ন সাজা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ২২ জন মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ব্যক্তিদের ১৮ জন পলাতক এবং চারজন কারাগারে রয়েছেন।

ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে তিন কাউন্ট

মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগে ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে তিনটি কাউন্টে অভিযোগ আনা হয়েছিল। প্রথম কাউন্টে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্দোলন দমন, ছাত্রলীগকে হামলায় প্ররোচিত করা এবং বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, ১১ জুলাই ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলেন কাদের। ১৪ জুলাই গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের সময় উপস্থিত থেকে তিনি অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন বলেও অভিযোগ করা হয়।

১৫ জুলাই ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কাদের ছাত্রলীগকে আন্দোলনকারীদের প্রতিহত করার আহ্বান জানান বলে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয় এবং বহু মানুষ আহত হন।

১৬ জুলাই ইন্টারনেটের গতি কমাতে তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে নির্দেশ দেওয়া এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে কাদেরের বিরুদ্ধে।

অভিযোগে বলা হয়, ওই সময় চট্টগ্রামের মুরাদপুরে মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহম্মেদ শান্ত ও মো. ফারুক এবং রংপুরে আবু সাঈদসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীরা নিহত হন।

দ্বিতীয় কাউন্টে ১৭ জুলাই দলীয় নেতাদের নিজ নিজ এলাকায় আন্দোলন প্রতিরোধে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ এবং ১৮ জুলাই দলীয় নেতা-কর্মীদের রাজপথে নামার আহ্বান জানানোর অভিযোগ করা হয়।

১৯ জুলাই কারফিউ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন প্রসঙ্গে কাদেরের ‘শুট অ্যাট সাইট’ বক্তব্যের কথাও আনুষ্ঠানিক অভিযোগে এসেছে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা ও তৎকালীন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে অপহরণ, গুম, হত্যা ও নির্যাতনের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তৃতীয় কাউন্টে ৩ আগস্ট পাড়া-মহল্লায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলন প্রতিহত করতে দলের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, ৪ ও ৫ আগস্ট ঢাকা, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু আন্দোলনকারী নিহত হন।

আনুষ্ঠানিক অভিযোগে আরও বলা হয়, আন্দোলন দমনে দেশজুড়ে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহারে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হন।

নাছিমের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ

আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, ১৫ জুলাই ধানমন্ডিতে ওবায়দুল কাদেরের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে তিনি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হামলায় সমর্থন ও প্ররোচনা দিয়েছিলেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

আনুষ্ঠানিক অভিযোগে নাছিমের বিরুদ্ধে নিজ জেলা মাদারীপুরে আন্দোলন দমনের কার্যক্রম তদারক এবং ৩ ও ৪ আগস্ট ঢাকায় দেওয়া বক্তব্যের মাধ্যমে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

তাঁর বিরুদ্ধেও দেশব্যাপী ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে গুরুতর আহত করার ঘটনায় দায়ের অংশ হিসেবে অভিযোগ আনা হয়।

আরাফাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ

তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে অভিযোগে ১৩ জুলাই থেকে আন্দোলনের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হামলার নির্দেশ এবং আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে উপস্থাপনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, মহাখালী এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার তদারকিতে তাঁর ভূমিকা ছিল। ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ফোনালাপে আন্দোলন দমন এবং কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ রাখার কথোপকথনের বিষয়ও অভিযোগপত্রে এসেছে।

৪ আগস্ট আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সংগঠনকে আন্দোলন দমনে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।

পরশের বিরুদ্ধে অভিযোগ

যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে আন্দোলন দমাতে তিনি যুবলীগ নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন নির্দেশ দিয়েছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর নির্দেশে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা হয়।

১৮ জুলাই চট্টগ্রাম ও ১৯ জুলাই মহাখালীতে কয়েকজন আন্দোলনকারী হত্যার ঘটনায় যুবলীগ সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে।

১ আগস্ট আন্দোলনকে ‘আগ্রাসন ও ধ্বংসলীলা’ আখ্যা দিয়ে বক্তব্য এবং ৪ ও ৫ আগস্ট লক্ষ্মীপুর ও রাজশাহীতে প্রাণহানির ঘটনায় যুবলীগের ভূমিকার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

মাইনুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ

যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খানের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, ১২ জুলাই সিলেটে আন্দোলনকারীদের নিয়ে কটাক্ষ করে নেতা-কর্মীদের আন্দোলন প্রতিহত করতে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।

১৯ জুলাই মিরপুরে নিজে অস্ত্র হাতে মহড়া দেওয়া এবং তাঁর নেতৃত্ব ও নির্দেশে গুলিতে রুস্তম ও আসিফ ইকবালসহ ২৬ জন নিহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ৪ ও ৫ আগস্ট মিরপুরে আরও কয়েকজন নিহত হওয়ার ঘটনাতেও তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়।

সাদ্দামের বিরুদ্ধে অভিযোগ

ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে ১১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে আন্দোলনকারীদের হুমকি ও উসকানি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশ বাস্তবায়নে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় প্ররোচনা, পরিকল্পনা ও নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।

অভিযোগে বলা হয়, ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলায় তাঁর নেতৃত্ব ছিল। পরদিনও তিনি আন্দোলনকারীদের ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেন। এরপর রাজধানীসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটে।

তাঁর বিরুদ্ধেও দেশজুড়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে আহত করার ঘটনায় দায়ের অভিযোগ আনা হয়েছে।

আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে অভিযোগ

ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, আন্দোলন দমনে পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও অর্থ গ্রহণের পাশাপাশি ১৩ জুলাই মধুর ক্যানটিনে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন তিনি।

১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলন প্রতিহত করতে নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ১৬ জুলাই সাদ্দাম হোসেনের বক্তব্যের সময় উপস্থিত থেকে সমর্থন দেওয়ার কথাও আনুষ্ঠানিক অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৮ জুলাই দেশজুড়ে হামলা ও প্রাণহানির ঘটনায় ছাত্রলীগের ভূমিকার পাশাপাশি আসিফের প্ররোচনা, নির্দেশ ও তদারকির অভিযোগও আনা হয়। তাঁর বিরুদ্ধেও ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ হত্যা ও ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে আহত করার অভিযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে