প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
কুষ্টিয়ায় ছয় হত্যা মামলায় হানিফসহ চার আসামির রায় যেকোনো দিন ঘোষণা করতে পারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ছবি: সংগৃহীত
জুলাই আন্দোলনের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফসহ চার আসামির বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ যেকোনো দিন রায় ঘোষণা করতে পারে।
বুধবার ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। চার আসামিই পলাতক থাকায় তাঁদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন যুক্তি উপস্থাপন করেন।
মামলার অন্য তিন আসামি হলেন কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা।
এর আগে ৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষ চার আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে যুক্তিতর্ক শেষ করে।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে হানিফ জুলাই আন্দোলন দমনে নেওয়া সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং অধীনস্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে সেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছেন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, আন্দোলনের সময় উসকানি ও সহায়তার পাশাপাশি দলীয় বিভিন্ন বৈঠকে উপস্থিত থেকে সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন হানিফ। কুষ্টিয়ার পুলিশ কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে তাঁর টেলিফোন কথোপকথনের রেকর্ডও প্রমাণ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।
তবে এসব অভিযোগ এখনো বিচারাধীন এবং আসামিদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রায়ের মাধ্যমেই হবে।
তিনটি অভিযোগে বিচার
গত বছরের ২ নভেম্বর হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-২। এর আগে ৫ অক্টোবর তাঁদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেয় প্রসিকিউশন এবং পরদিন তা আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।
আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় পরে জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে পলাতক আসামিদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করে ট্রাইব্যুনাল।
চার আসামির বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন। এর একটি ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়সংক্রান্ত। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের মোকাবিলায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা যথেষ্ট—এমন বক্তব্য দেওয়ার সময় দলীয় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে তা সমর্থন করেছিলেন হানিফ।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই কুষ্টিয়ায় একটি বৈঠকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সহিংস ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ ও ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল।
তৃতীয় অভিযোগে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় কুষ্টিয়া শহরে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় আসামিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৯ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ২৩ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তার জেরার মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। এরপর ১১ মে রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তিতর্ক শুরু করে।
রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য, কুষ্টিয়ার হত্যাকাণ্ডগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; বরং আন্দোলন দমনের পরিকল্পিত ও সমন্বিত কার্যক্রমের অংশ।
এর আগে ১০ জুন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তি-পাল্টা যুক্তি শেষে মামলাটি রায়ের অপেক্ষায় রাখা হয়েছিল। পরে প্রসিকিউশন অতিরিক্ত প্রমাণ জমা দেওয়ায় আবার যুক্তিতর্ক শুরু হয়।
অতিরিক্ত প্রমাণের মধ্যে ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে আজগর আলীর একটি বক্তব্যও রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ওই বক্তব্যে হানিফের নির্দেশে আন্দোলন দমনের কথা বলা হয়েছিল।
সব পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ায় এখন মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ।




