প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬। ১২:৫০ পিএম
আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬। ১৫:২০ পিএম
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে নয়া দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভের আগেই সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে ও জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে আটক করেছে পুলিশ।
ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিবাদে ডাকা বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজধানী দিল্লি কার্যত দুর্গ বানিয়ে ফেলেছে পুলিশ।
শনিবার (১০ অক্টোবর) ভোর থেকেই দিল্লির চেহারা ছিল অন্যরকম। রাস্তায় লাঠি আর ঢাল হাতে হাজার হাজার নিরাপত্তারক্ষী। শহরের ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ। কেন্দ্রীয় এলাকায় ইন্টারনেট আর ফোনের লাইন বিচ্ছিন্ন। আগের দিনই পুলিশ রাজধানীমুখী ট্রেন বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিল।
আর এত আয়োজন একটা বিক্ষোভ ঠেকাতে। ডাক দিয়েছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের জেন-জি আন্দোলন। তাদের দাবি একটাই। নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারকে পদ ছাড়তে হবে।

দিল্লি বিমানবন্দরে বিমানের ভিতরে অভিজিৎ দীপকে। তাদের ধরতে বিমানের ভিতর পুলিশ। ছবি: ভিডিয়ো থেকে।
বিমান থেকেই আটক
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের বয়স ৩১ বছর। তিনি মুম্বাই থেকে বিমানে দিল্লি আসেন। সঙ্গে ছিলেন আরও দুই নেতা, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। দলের দাবি, স্থানীয় সময় সকাল ১১টার ঠিক আগে বিমান নামতেই তিনজনকে আটক করা হয়।
সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, প্রায় আধডজন উর্দিধারী কর্মকর্তা দীপকের সিটের দিকে এগিয়ে আসছেন।
তখন দীপকেকে বলতে শোনা যায়, “এটা স্বৈরাচার।” এক কর্মকর্তা বারবার বলছিলেন, “স্যার, দয়া করে সহযোগিতা করুন।” কর্মকর্তারা জানান, বিক্ষোভের অনুমতি নেই। দীপকে পাল্টা বলেন, “আপনারাতো এটা আমাকে বাইরেও বলতে পারতেন।”
রয়টার্স জানিয়েছে, পুলিশ বিমানবন্দরে দীপকের সঙ্গে দেখা করে বিক্ষোভ বাতিল করতে বলেছিল। কারণ হিসেবে বলা হয়, কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছে। ডেইলি স্টারের খবর, ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিসহ পাঁচশর বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। মধ্য দিল্লিতে অনেককে জোর করে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়।
তবু সবাই থামেননি। শিখ মন্দিরে আটকা পড়া কয়েকশ বিক্ষোভকারী পুলিশের নজর এড়িয়ে বেরিয়ে আসেন। স্লোগান দিতে দিতে তারা বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরের দিকে এগোন। পথে ছিল ব্যারিকেড আর পুলিশের সারি।
২২ বছরের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া নাদা হাসিন সহপাঠীদের নিয়ে এসেছিলেন। পুলিশের হলুদ ব্যারিকেডের সামনে তিনি বলেন, “আমরা কি এই দেশের সন্তান নই? আমরাতো আমাদের মৌলিক অধিকার, ভোটের অধিকার চাইছি।”
সিজেপির আইনি দলের প্রধান রত্না সিং জানান, দুই ডজনের বেশি পুলিশ তার গাড়ি ঘিরে রেখেছে। পরোয়ানা দেখতে চাইলে তাকে বলা হয়, “আমাদের ওপরের নির্দেশ আছে।”

আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অনেকজনকে আটক করা হচ্ছে। ছবি: পিটিআই
কারা এই ‘ককরোচ’
নামটা অদ্ভুত। এর পেছনে একটা গল্প আছে। এই বছরের ১৫ মে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি মন্তব্য করেন। তাতে বেকার তরুণদের সঙ্গে এমন লোকদের তুলনা ছিল, যারা সোশাল মিডিয়া আর আন্দোলনের পথে প্রতিষ্ঠান আক্রমণ করে। পরে তিনি ব্যাখ্যা দেন। কিন্তু ‘ককরোচ’ শব্দটা তরুণদের মুখে মুখে রয়ে যায়।
পরদিন, ১৬ মে, রাজনৈতিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অভিজিৎ দীপকে অনলাইনে শুরু করেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। নামটা শাসক দল বিজেপির (ভারতীয় জনতা পার্টি) নামের সঙ্গে মিলিয়ে ঠাট্টা করে রাখা। শুরুতে পুরোটাই ছিল রাজনৈতিক ব্যঙ্গ।
দলটি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত নয়। ২১ মে ভারতে তাদের এক্স অ্যাকাউন্ট আটকে দেওয়া হয়।
এরপর আন্দোলন রাস্তায় নামে। ৬ জুন যন্তর মন্তরে প্রথম বিক্ষোভ হয়। তখন পুলিশ অনুমতি দিয়েছিল। দাবি ছিল পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। ২০ জুন থেকে যন্তর মন্তরে অবস্থান চলে। ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা হয়।
এএফপির ভিডিওতে লাঠিচার্জ আর কাঁদানে গ্যাসের দৃশ্য দেখা গেছে। দিল্লি পুলিশ বলেছে, সেখানে সহিংসতা বা আটকের ঘটনা ঘটেনি। পরের দিন বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভে আটক হন এবং পরে ছাড়া পান। এবার আন্দোলনের লক্ষ্য বদলে গেছে। এবার ইস্যু ভোটার তালিকা।

ইন্টারনেট বন্ধ করা সহ এবং দিল্লির বিভিন্ন সড়ক ও সীমান্ত এলাকায় একাধিক স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। ছবি: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
ভোটার তালিকায় কী ঘটছে
ভারতের নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা নতুন করে যাচাই করছে। এর নাম ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’, সংক্ষেপে এসআইআর। এতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রতিটি ভোটারের তথ্য মিলিয়ে দেখার কথা।
কাজটা শুরু হয় ২০২৫ সালে, বিহারে। সেখানে প্রায় ৬৫ লাখ নাম বাদ পড়ে। পরে ধাপে ধাপে দেশের বাকি রাজ্যে কাজ ছড়ায়। একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া তালিকায় এ পর্যন্ত বাদ গেছে ১৩ কোটি ৩৭ লাখ নাম।
নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, তালিকা থেকে নাম কাটা পড়েছে মেক্সিকোর মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি মানুষের। তাদের হিসাবে এসআইআরের আগে তালিকায় ছিল প্রায় ৯৭ কোটি নাম। এর মধ্যে দুই কোটির বেশি মানুষকে মৃত ধরা হয়েছে। ‘অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত ও অন্যান্য’ শ্রেণিতে গেছে আরও প্রায় নয় কোটি নাম।
একটা কথা মনে রাখা দরকার। এই ১৩ কোটি খসড়া তালিকার হিসাব। বাদ পড়া মানুষ আপত্তি জানাতে পারেন। কিন্তু নাম ফেরাতে তাদের নতুন করে আবেদন করতে হয়। অর্থাৎ ভোটাধিকার যে আছে, তা এখন প্রমাণের দায় নাগরিকের।
‘প্রমাণ দিন, নইলে বাদ’
সাবেক নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা বলছেন, আগের সংশোধনে জোর ছিল প্রতিটি নাগরিককে তালিকায় রাখার ওপর। তখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে সরাসরি যাচাই হতো। এখন মনোভাব উল্টে গেছে। তার ভাষায়, “সামান্যতম অজুহাতে মানুষকে বাদ দেওয়াই যেন মূল চেষ্টা এবং অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
সমস্যার একটা বড় দিক নথি। ভারতে অনেক মানুষের কাগজপত্র গুছিয়ে রাখার অভ্যাস বা সুযোগ নেই। অনেকের জন্মসনদও নেই। আরেক দিক অ্যালগরিদম। বহু মানুষকে “যৌক্তিক অসঙ্গতি”র কারণে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর আওতায় পড়ে নামের বানানের গরমিল, এমনকি ভাইবোনের সংখ্যা বা বয়সের ফারাকও।
তৃতীয় পক্ষের আপত্তিও একটা কারণ। টাইমসের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কর্ণাটকের এক নির্বাচনী এলাকায় এক দিনে প্রায় ২,০০০ আপত্তির ফর্ম জমা পড়ে। প্রায় অর্ধেকই জমা দেন মাত্র পাঁচজন। যাদের নিয়ে আপত্তি, তাদের বেশির ভাগ মুসলমান। অনেক ফর্মে টাইপ করা ছিল টার্গেট ব্যক্তির নাম। শুধু আপত্তিকারীর অংশ ফাঁকা। বিশ্লেষকদের মতে, এটা সুসংগঠিত প্রচারণার ইঙ্গিত।
সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও কম নয়। দিল্লির খেলনার দোকানের কর্মী ৪৩ বছরের নানহে লাল নথি নিয়ে তিনবার ভোটার কেন্দ্রে গেছেন। তিনি বলেন, “আমি তো তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তারা নিজেরাই দেখতে পারে যে আমরা বেঁচে আছি।”
তার মালিক বারবার ফোন করে জানতে চাইছিলেন, কাজে কখন ফিরবেন। গরিব মানুষকে এখন বেছে নিতে হচ্ছে, ভোট কর্মকর্তাদের কাছে বারবার যাবেন, নাকি দিনের মজুরি তুলবেন।
মুসলমানদের নিয়ে অভিযোগ কতটা?
বিরোধীদের বড় অভিযোগ, এই সংশোধন বেছে বেছে মুসলমানদের নিশানা করছে। এ নিয়ে প্রমাণের ছবি মিশ্র।
কলকাতার গবেষণা সংস্থা সাবর ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে কিছু চিত্র উঠে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রামে সম্পূরক তালিকায় বাদ পড়াদের ৯৫ শতাংশের বেশি মুসলমান। অথচ ভোটারদের মধ্যে তারা প্রায় ২৬ শতাংশ। হায়দরাবাদের ১৫টি আসনে খসড়া তালিকায় বাদ গেছে ১৯ লাখ ৪১ হাজারের বেশি নাম। এর ৪০.৭ শতাংশ মুসলমান।
আবার ভিন্ন চিত্রও আছে। দ্য উইকের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে বাদ পড়াদের বড় অংশ অমুসলিম। সাবরের নিজের তথ্যেও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের খসড়ায় বাদ পড়াদের ৩৩.৩ শতাংশ মুসলমান, ৬৬.৭ শতাংশ অন্যরা। তবে মুসলমানরা ভোটার প্রায় ২৫-২৬ শতাংশ। তাই তাঁদের অংশ আনুপাতিকের চেয়ে বেশি।
নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, ভারতের ২০ কোটি মুসলমান অসঙ্গতভাবে নিশানা হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। তারা আরও লিখেছে, বিজেপি নেতারা এই প্রক্রিয়াকে “অনুপ্রবেশকারী” তাড়ানোর উদ্যোগ বলে সাফাই গেয়েছেন। শব্দটা আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসীদের বোঝায়। কিন্তু ক্রমে এটা ভারতের সব মুসলমানকে বোঝাতে ব্যবহার হচ্ছে।
টাইমসের মতে, “উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি” পাওয়ার জোরালো প্রমাণ মেলেনি। তবু বিজেপি নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন, বাদ পড়াদের নাগরিক কল্যাণ সুবিধা মিলবে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজেপির দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টাইমসকে বলেছেন, এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য দলের নির্বাচনী সুবিধা পাকাপোক্ত করা। একজনের ভাষ্য, উদ্দেশ্য পুরোপুরি রাজনৈতিক ছিল। অন্যজনের মতে, বড় লক্ষ্য মতাদর্শিক।
হিন্দু ডানপন্থীরা নাগরিকত্ব পরীক্ষার মাধ্যমে যা পারেননি, নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে তা করানো। এই বক্তব্য নামহীন সূত্রের। বিজেপি এর সঙ্গে একমত নয়।
পশ্চিমবঙ্গ: যেখানে সব হিসাব মিলিয়ে দেখা হচ্ছে
সবচেয়ে বেশি নজর পশ্চিমবঙ্গে। সেখানে এসআইআরে প্রায় ৯১ লাখ নাম বাদ গেছে। সরকারি হিসাবে চূড়ান্ত বাদ ৯০ লাখ ৮৩ হাজার। ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ পর্যন্ত বাদ গিয়েছিল ৬৩.৬৬ লাখ নাম। আরও প্রায় ৬০ লাখ নাম রাখা হয় ‘বিচারাধীন’ শ্রেণিতে। বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তারা এর মধ্যে ২৭ লাখের বেশি নাম বাদ দেন। প্রায় ৩২.৬৮ লাখ নাম তালিকায় থাকে।
এরপর হয় বিধানসভা নির্বাচন। ৪ মে ফল ঘোষণা হয়। ২৯৪ আসনের মধ্যে বিজেপি পায় ২০৭টি। তৃণমূল পায় ৮০টি। পনেরো বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে প্রথমবার সরকার গড়ে বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী হন শুভেন্দু অধিকারী।
এরপর শুরু হয় হিসাবের লড়াই। তৃণমূলের দাবি, ৩১টি আসনে বিজেপির জয়ের ব্যবধান বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার চেয়ে কম। রাজ্য কংগ্রেসের এসআইআর কমিটির চেয়ারপারসন প্রসেনজিৎ বসু সুপ্রিম কোর্টে এক আবেদনে লিখেছেন, ৮২টি আসনে এসআইআরের কারণে হওয়া রদবদল জয়ের ব্যবধানকে ছাড়িয়ে গেছে। অল্ট নিউজের বিশ্লেষণে ৪৯টি আসনে ‘বিচারাধীন’ অবস্থায় বাদ পড়া ভোটার জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি। এর মধ্যে বিজেপি জিতেছে ২৬টি, তৃণমূল ২১টি, কংগ্রেস ২টি।
নির্বাচন কমিশনের পাল্টা তথ্য হলো, সবচেয়ে বেশি নাম কাটা পড়া পাঁচটি আসনেই জিতেছে তৃণমূল। দ্য ওয়্যারের এক প্রতিবেদক লিখেছেন, এসআইআর ছাড়াও বিজেপি হয়তো জিততই। তবে কয়েকটি কাছাকাছি লড়াইয়ে এর প্রভাব থাকতে পারে।
আপিলের চিত্রটাও গুরুত্বপূর্ণ। দ্য ওয়্যার জানিয়েছে, ট্রাইব্যুনালে জমা পড়েছিল ৩৪ লাখ আবেদন। সেখান থেকে নাম যোগ হয়েছে মাত্র ১,৬০৭টি। নিউইয়র্ক টাইমস অন্য কথা লিখেছে। তাদের মতে, নিষ্পত্তি হওয়া প্রায় এক লাখ আপিলের বেশির ভাগই বৈধ প্রমাণিত হয়েছে এবং নাম ফিরিয়ে দিতে বলা হয়েছে। তারা আরও লিখেছে, আদালতের নিযুক্ত কর্মকর্তারা ১৬ লাখ ভোটার ফেরানোর অনুমোদন দিলেও নির্বাচন কমিশন আপিল করে তা আটকে দিয়েছে। এ কথা কমিশনের নিজস্ব আদালত-নথিতে আছে বলে টাইমসের দাবি।

যন্তর মন্তরে হতে যাওয়া বিক্ষোভের একদিন আগে, নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে শুক্রবারে বিজয় চকে ব্যারিকেড বসিয়েছে দিল্লি পুলিশ। ছবি: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
আদালত কী বলেছে
২৭ মে সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ বলেছে, এসআইআর বৈধ। আদালতের কথায়, ভোটার তালিকা গণতন্ত্রের ভিত্তি। এর শুদ্ধতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর অবাধ নির্বাচন নির্ভর করে।
রায়ে কিছু শর্তও আছে। নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা তৈরির সময় নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। কিন্তু নাগরিকত্ব চূড়ান্তভাবে ঠিক করার ক্ষমতা তার নেই। যাঁর নাম আগে থেকেই তালিকায় আছে, তার পক্ষে অনুমান মানতে হবে। আদালত আরও বলেছে, আধার নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়।
পরে সেপ্টেম্বরে পশ্চিমবঙ্গের ফল নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবার শুনানি হয়। আদালত বলেছে, জয়ের ব্যবধান খুব কম হলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ নতুন করে আবেদন করতে পারে। কমিশনের মত, এর সমাধান নির্বাচনী মামলা।
কমিশন ও সরকার কী বলছে
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান, এসআইআর ভোটার তালিকা ‘পরিশুদ্ধ’ করার প্রক্রিয়া। মৃত, দুই জায়গায় নাম থাকা আর অন্যত্র চলে যাওয়া মানুষের নাম বাদ দেওয়াই এর উদ্দেশ্য। ২০২৫ সালে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগের জবাবে জ্ঞানেশ কুমার বলেছিলেন, কমিশন “পাহাড়ের মতো” ভোটারদের পাশে আছে। তিনি আরও বলেছিলেন, কমিশনের কাছে কেউ বিরোধী বা শাসক নয়।
শনিবারের বিক্ষোভ নিয়ে কমিশনের কর্মকর্তারা মন্তব্য করেননি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এক সপ্তাহের বিক্ষোভ নিয়ে কিছু বলেননি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক পোস্টে বিরোধী আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধে “মিথ্যা ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর” অভিযোগ তুলেছেন। বিজেপির মুখপাত্র প্রত্যুষ কান্তের যুক্তি, অতীতে বিরোধী দলগুলোই ভুয়া ও দ্বৈত নাম বাদ দিতে বলেছে।
তাহলে এখন কমিশনের চেষ্টা কেন সন্দেহজনক হবে?
ভোটার তালিকার ভুল যে দীর্ঘদিনের সমস্যা, সেটা মিথ্যে নয়। কোটি কোটি মানুষ কাজের খোঁজে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায়। এতে নকল বা পুরনো নাম থেকে যায়। তাই তালিকা পরিষ্কারের দরকার আছে। বিতর্ক এই পদ্ধতি নিয়ে।
কমিশনের ভেতরেও অসন্তোষ?
একটি ভারতীয় সংবাদপত্রের অনুসন্ধানে খবর বেরিয়েছে, তিন নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে দুজন এই উদ্যোগে ভেতরে ভেতরে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এটা প্রকাশ হওয়ার পর বিরোধীরা চাপ বাড়ায়।
কমিশন জবাব দিয়েছে, ভিন্ন মত প্রতিষ্ঠানিক আলোচনার স্বাভাবিক অংশ। তারা বলেছে, এসআইআর-সহ সব সিদ্ধান্তে তিন কমিশনারেরই সম্মতি ছিল।
বিরোধীরা এ নিয়ে কড়া ভাষায় নেমেছে। রাহুল গান্ধী 'ভোট চুরি'কে জনগণের বিরুদ্ধে অপরাধ বলেছেন। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ ও গ্রেপ্তার চেয়েছেন। ডিএমকে প্রধান এম কে স্ট্যালিন চেয়েছেন পদত্যাগ আর এসআইআর বন্ধ। সিপিএম রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ চেয়েছে। বিজেপি পাল্টা বলেছে, মতভেদই প্রমাণ করে কমিশন গণতান্ত্রিকভাবে চলছে।
বিরোধীদের অভিযোগ আরও পুরনো। তারা বলছেন, ২০২৩ সালে মোদি সরকার নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের কমিটির কাঠামো বদলায় এবং কমিশনারদের আইনি সুরক্ষা দিতে আইন করে। এতে কমিশন সরকারের অনুকূলে ঝুঁকেছে বলে তাঁদের দাবি।
কংগ্রেসের আইনপ্রণেতা প্রবীণ চক্রবর্তী বলেন, 'পরিসংখ্যানগত অসঙ্গতি' তদন্তের আবেদন কমিশন উপেক্ষা করেছে। তার অভিযোগ, বিরোধীদের মেশিন-রিডেবল ভোটার তালিকা এবং ভোটকেন্দ্রের সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়ার সুযোগও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আগে কী হয়েছিল, এবার কী হতে পারে
মোদি সরকার শেষবার এমন বড় আন্দোলনের মুখে পড়েছিল ২০২০ সালের শেষে। কৃষকরা নতুন কৃষি আইনের বিরুদ্ধে দিল্লির দিকে রওনা দিয়েছিলেন। তাদের শহরের সীমানায় আটকে দেওয়া হয়। কয়েক মাস কেউ কেউ সেখানে তাবু খাটিয়ে ছিলেন। শেষে সরকার পিছু হটে। টাইমসের মতে, এবারের দমনপীড়ন আরও কঠোর। বিপুল নিরাপত্তারক্ষী, ব্যাপক ব্যারিকেড আর আয়োজকদের আটকের জোর তৎপরতাই তার প্রমাণ।
বিরোধী জোটের পরের কর্মসূচিও ঠিক হয়ে আছে। নভেম্বরের ১ তারিখে দিল্লিতে সমাবেশের কথা। দেশজুড়ে 'গণতন্ত্র বাঁচাও' সমাবেশের ডাকও আছে।
রাজনীতির হিসাবও চলছে। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ফল ভালো না হলেও বিজেপি রাজ্য পর্যায়ে একের পর এক জিতছে। সংশোধিত ভোটার তালিকার ভিত্তিতে এমন এক বড় রাজ্যেও জিতেছে, যেখানে আগে কখনো জেতেনি। পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ২০২৯ সালে।
ভোটার তালিকার চূড়ান্ত চিত্র এখনো পরিষ্কার নয়। কত নাম ফিরবে, কত বাদ থাকবে, তা নির্ভর করছে আপিল আর আদালতের ওপর। তালিকা শুদ্ধ হচ্ছে, নাকি বৈধ ভোটার বাদ পড়ছে, তার জবাব এখনো আসেনি।
তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স, দ্য ওয়্যার, স্ক্রল




