Logo
Logo
×
‘ককরোচ’ পোস্ট থেকে মোদি সরকারের মাথাব্যথা, কে এই দিপকে

২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর ভারতের বেঙ্গালুরুতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দিচ্ছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। ছবি: রয়টার্স

খবর ।  বিদেশ

‘ককরোচ’ পোস্ট থেকে মোদি সরকারের মাথাব্যথা, কে এই দিপকে

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬। ০৭:২৩ পিএম

আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬। ১৪:২৬ পিএম

বেকার তরুণদের নিয়ে করা ‘ককরোচ’ মন্তব্যের জবাব থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনই আজ ছড়িয়ে পড়েছে ভারতজুড়ে। আর সেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ, রাজনৈতিক কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকেকে শনিবার দিল্লি বিমানবন্দর থেকে আটক করেছে পুলিশ।

ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের চাপেই কয়েক মাস আগে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের এক মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল।

ভোটার তালিকায় কারসাজির অভিযোগে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে শনিবার নয়াদিল্লিতে একটি সমাবেশে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন দিপকে। তার উড়োজাহাজ রাজধানীতে অবতরণের পরই পুলিশ সেখানে পৌঁছে যায়।

সমালোচকদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় খসড়া তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে।

টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, উড়োজাহাজের ভেতর পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দিপকে বলছেন, “আমি গ্রেপ্তার হতে এসেছি, আমাকে গ্রেপ্তার করুন... আমি আপনাদের ভয় পাই না।”

তবে সেখানে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না; বরং তার সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে।

৩১ বছর বয়সী দিপকের জন্ম ভারতের বর্ণব্যবস্থায় সামাজিকভাবে নিচের স্তরে থাকা একটি দলিত পরিবারে।

চলতি বছর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যের জবাবে মাত্র ছয় শব্দের একটি পোস্ট করার পর দিপকে হঠাৎই ব্যাপক পরিচিতি পান।

সূর্য কান্তের ওই মন্তব্যে বেকার তরুণদের ‘ককরোচ’র (তেলাপোকা) সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল। তার জবাবে দিপকের পোস্ট সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়। আর সেই পোস্ট থেকেই জন্ম নেয় ব্যঙ্গাত্মক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি।

শুরুতে এটি ছিল মূলত অনলাইনভিত্তিক একটি আন্দোলন। কিন্তু খুব দ্রুতই তা রাজনৈতিক চাপ তৈরির শক্তিতে পরিণত হয়। পার্টি আকারে এটি নিবন্ধনও পায়।

সিজেপি দেশজুড়ে বড় ধরনের সড়ক আন্দোলন সংগঠিত করে। জনগণের টানা চাপের মুখে গত জুলাইয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভা থেকে এ ধরনের পদত্যাগ খুবই বিরল।

এরপর শনিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে নতুন কর্মসূচির ডাক দেওয়ার পর দিপকেকে আটক করা হয়।

নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, খসড়া ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় চিহ্নিত হওয়া নামগুলোকেই ওই ১৩ কোটির হিসাবে ধরা হয়েছে; যে সংখ্যা জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। কমিশন বলেছে, যাদের নাম ভুলভাবে বাদ পড়েছে, তারা আবার নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন।

এসআইআর শুরু হয় ২০২৫ সালের জুনে। দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলে এটি প্রথম নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া।

তবে প্রতি বছর যে নিয়মিত সংশোধন করা হয়, তার সঙ্গে এই প্রক্রিয়ার বড় পার্থক্য আছে।

নিয়মিত সংশোধনে সাধারণত নতুন ভোটারের নাম যুক্ত করা হয় এবং ঠিকানা বা অন্যান্য তথ্য হালনাগাদ করা হয়। কিন্তু এসআইআরে ভোটারদের যোগ্যতা অনেক বিস্তৃতভাবে নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে।

বর্তমান ভোটারদের তথ্য ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে পরিচালিত আগের নিবিড় সংশোধনের নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

লক্ষ্য হলো; কারা মারা গেছেন, কারা অন্য জায়গায় চলে গেছেন, কার নাম একাধিকবার রয়েছে এবং কাদের তথ্য আগের ভোটার তালিকার সঙ্গে মেলানো যাচ্ছে না, তা চিহ্নিত করা।

বর্তমান ভোটারদের নিজেদের তথ্যও যাচাই করতে বলা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে ভোট দেওয়ার যোগ্যতা প্রমাণের জন্য নথিপত্রও জমা দিতে হচ্ছে। এই কার্যক্রমের পরিসর বিশাল।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দুই ডজনের বেশি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, এই ১৩ কোটি ভোটারের নাম স্থায়ীভাবে মুছে গেছে। তারা দাবি বা আপত্তি জানাতে পারবেন এবং চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করতে পারবেন।

দাড়িওয়ালা দিপকেকে সাধারণত টি-শার্ট ও জিনস পরতেই দেখা যায়। রাজধানীতে যাওয়ার আগে তিনি দক্ষিণ ভারতের প্রযুক্তিনগরী বেঙ্গালুরুতে একটি বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এরপর মুম্বাই হয়ে দিল্লিতে পৌঁছালে পুলিশ তাকে এবং সংগঠনের আরও দুই জ্যেষ্ঠ নেতা; সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করে।

দিল্লিতে পুলিশের কঠোর অবস্থান এবং বিক্ষোভে কড়া বিধিনিষেধ সত্ত্বেও দিপকে সমর্থকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ভারতের অহিংস আন্দোলনের প্রতীক মহাত্মা গান্ধীর উদাহরণ দেন।

শনিবারের ফ্লাইটের আগে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দিপকে বলেন, “আগামীকাল কী হবে আমি জানি না। তবে একটি বিষয়ে আমি নিশ্চিত; আমি ভয় পাব না। পিছিয়েও যাব না। আমাদের গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে।”

তরুণদের এই বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লির নিরাপত্তা জোরদার করতে কয়েক হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করে কর্তৃপক্ষ। যাতায়াত ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাও স্থগিত করা হয়। কার্যত এক ধরনের লকডাউনের মাধ্যমে তরুণদের আন্দোলন ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়।

উড়োজাহাজে ওঠার আগে দিপকে প্রশ্ন করেন, “দেশের তরুণদের, দেশের মানুষকে প্রধানমন্ত্রী এত ভয় পাচ্ছেন কেন?”

ছয় শব্দের পোস্ট থেকে অপ্রত্যাশিত এক আন্দোলন

“সব তেলাপোকা যদি এক হয়ে যায়?”

মে মাসে সোশাল মিডিয়ায় দিপকের করা এই প্রশ্নই প্রায় রাতারাতি তাকে রাজনৈতিক যোগাযোগ পেশার একজন কর্মী থেকে ভারতের তরুণদের আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত করে। যুক্তরাষ্ট্রে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি শেষ করে ভারতে ফিরে আসেন দিপকে।

তিনি বলেছেন, তার ভাইরাল সাফল্য তাকে “বাস্তব ও অর্থবহ কাজ করার সুযোগ” দিয়েছে। যদিও এই সময়ে তিনি এবং তার পরিবার হুমকিও পেয়েছেন।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ অনলাইনে কয়েক মিলিয়ন অনুসারী সংগ্রহ করে। প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থীকে প্রভাবিত করা মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে দিতেও এই আন্দোলন বড় ভূমিকা রাখে। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের ক্ষোভের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। ২৫ জুলাই তিনি পদত্যাগ করেন।

এরপর থেকে দিপকে ও তার সমর্থকেরা বিভিন্ন ইস্যুতে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা নিজেদের রাজনৈতিক দল নয়, বরং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টিকারী একটি রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে দেখেন। সরকারি স্কুলের অবকাঠামো থেকে শুরু করে তরুণদের কর্মসংস্থান; বিভিন্ন বিষয় তাদের আন্দোলনের অংশ হয়েছে।

গত মাসে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংগঠনটি আবার রাস্তায় নামে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের দুই সহকর্মী নির্বাচন কমিশনার ভোটার তালিকা সংশোধন, ভোটার নিবন্ধনের পদ্ধতি ও কমিশনের ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে বারবার উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।

তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, অভ্যন্তরীণ আলোচনার সময় ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক বিষয়।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, এনডিটিভি

আরও পড়ুন

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে