প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০১:৩৫ পিএম
আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ১৮:৫৭ পিএম
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় তেল আমদানি চালু রাখতে বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য রাখা ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যবহার করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এর মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট বা ইআরএল-২ প্রকল্পের অর্থও রয়েছে।
জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির বৈঠকের জন্য প্রস্তুত করা বিপিসির কার্যপত্রে বলা হয়েছে, দেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে সংস্থাটির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এই অবস্থায় গত সাত মাসে বিভিন্ন প্রকল্পের হিসাব থেকে ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলে জ্বালানি তেল আমদানি চালিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তবে প্রকল্পের জন্য রাখা অর্থ অন্য খাতে ব্যবহারের কারণে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর কাজ ব্যাহত হবে না বলে দাবি করেছেন বিপিসির চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম।
তাঁর ভাষ্য, প্রকল্পগুলোর হিসাবে থাকা অর্থ বিপিসির নিজস্ব। চলতি ও আগামী অর্থবছরে কোন প্রকল্পে কখন কত অর্থ প্রয়োজন হবে, সেই হিসাব বিবেচনা করেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থ পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এ জন্য মন্ত্রণালয় থেকে নতুন করে অর্থ নেওয়া হয়নি।
লোকসান সত্ত্বেও দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা বিপিসির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলেও জানিয়েছেন তিনি। প্রকল্পগুলোর যখন অর্থ প্রয়োজন হবে, তখন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তাঁর দাবি।
ছয় মাসে লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা
বিপিসির হিসাবে, জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে সাধারণত দুই মাসের তেলের মূল্যের সমপরিমাণ ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা চলতি মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। কিন্তু ভর্তুকি মূল্যে জ্বালানি বিক্রির কারণে সংস্থাটির চলতি মূলধন কমেছে।
মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর বড় অংশই এসেছে ডিজেল থেকে।
দেশে ব্যবহৃত পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ৬৫ শতাংশ ডিজেল। কার্যপত্র প্রস্তুতের সময় আন্তর্জাতিক বাজারদর ও ডলারের বিনিময় হার বিবেচনায় প্রতি লিটার ডিজেলের ব্যয় প্রায় ২০৫ টাকা পড়ছিল। তখন দেশে তা বিক্রি হচ্ছিল লিটারপ্রতি ১১৫ টাকায়।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের গড় দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৮৬ ডলার। মার্চে তা বেড়ে ১৮৬ দশমিক ৫৯ ডলারে ওঠে। এপ্রিলে সর্বোচ্চ দাম পৌঁছায় ব্যারেলপ্রতি ২৮৪ দশমিক ৯৫ ডলারে। সেপ্টেম্বরে কার্যপত্র তৈরির সময় পর্যন্ত গড় মূল্য ছিল ১৬৫ দশমিক ৮২ ডলার।
বিপিসির হিসাবে, দেশে সর্বশেষ যে দামে ডিজেল বিক্রি হচ্ছে, তাতে খরচ উঠে আসতে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি দাম প্রায় ১১০ ডলারের মধ্যে থাকতে হবে। ফলে বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরেও সংস্থাটি লোকসান করছে।
দেশে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু হয়। আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম সমন্বয়ের ব্যবস্থা থাকলেও পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত শুরুর পর প্রায় পাঁচ মাস জনস্বার্থ বিবেচনায় সেই সূত্র অনুযায়ী পুরোপুরি দাম বাড়ানো হয়নি বলে জানিয়েছে বিপিসি।
১৯ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারে ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। এরপর ১ জুন কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ডিজেলের দাম রাখা হয় ১১৫ টাকা।
সবশেষ ২১ সেপ্টেম্বর চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। বর্তমানে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিপিসি বলছে, লোকসান কমানোর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েও সর্বশেষ মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তবে পাচারের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ সংস্থাটি শনাক্ত করতে পারেনি।
সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি জানতে চেয়েছে, জ্বালানি সংকটের সময় এবং পরে সরবরাহব্যবস্থা একই থাকার পরও শুধু দাম বাড়ানোর পর কীভাবে সংকট কেটে গেল।
বিপিসির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, কমিটির প্রথম বৈঠকে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়নি। মূলত বিপিসি ও এর অধীন কোম্পানিগুলোর বর্তমান কার্যক্রম, প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
পরবর্তী বৈঠকে দেশের বর্তমান জ্বালানি চাহিদা, মজুত সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা মোকাবিলার প্রস্তুতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিতে বিপিসিকে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম জনগণের জন্য সহনীয় রাখতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।
বর্তমানে বিপিসি ও এর অধীন কোম্পানিগুলোর ৬৪টি ডিপো ও স্থাপনায় মোট ১৬ লাখ ২৭৩ টন জ্বালানি তেল মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে। এই মজুত দিয়ে পণ্যভেদে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে বিপিসির হিসাব।
ভবিষ্যতে এই সক্ষমতা বাড়িয়ে ৯০ দিনের জ্বালানি মজুতের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ জন্য মোট কত বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। বিপিসির অধীন কোম্পানিগুলো নিজস্ব বাজেটে মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ শুরু করেছে।
সব কোম্পানির পরিকল্পনা পর্যালোচনার পর প্রয়োজনীয় মোট বিনিয়োগের অঙ্ক নির্ধারণ করা হবে এবং সে তথ্য পরবর্তী সময়ে সংসদীয় কমিটিকেও জানানো হবে বলে জানিয়েছে বিপিসি।




