প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬। ০২:৪৭ পিএম
আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২৬। ১৮:০৬ পিএম
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, ইরানের জন্য সময়টা বেশ ভালোই যাচ্ছে। বছরের পর বছর কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক হামলা সামলাতে হয়েছে দেশটিকে। আর এসবের মধ্যেই দেশটিকে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে। তবু দেশটি এখনও টিকে গেছে।
পরাশক্তিধর যুক্তরাষ্ট্র গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ব্যাপক মাত্রায় বোমা নিক্ষেপ শুরু করে। লক্ষ্য ছিল দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা। সঙ্গে ছিল তেহরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার বাসনা। কিন্তু প্রতিটি লক্ষ্যেই ওয়াশিংটন বড় ধরনের ব্যর্থ হয়েছে। অন্তত ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেরই তাই মত। উল্টোদিকে যুদ্ধ শুরুর সময়ের তুলনায় তেহরান এখন আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
ইরান সফলভাবে বিশ্বের অন্যতম বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালী নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সেটি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম আকাশছোঁয়া। ব্যাপক বোমাবর্ষণের মুখেও দেশটির সশস্ত্র বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে ক্ষয়ক্ষতি করার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
যুদ্ধের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমর্থন শুরু থেকেই দুর্বল ছিল, এখন তা আরও কমেছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্ষোভও বেড়েছে। ফলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, আগামী বছরজুড়ে তেহরান বর্তমান পথেই এগিয়ে যাবে।
ইরানি কর্মকর্তারা সন্দেহাতীতভাবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান নিয়ে গর্বিত। প্রকাশ্যে তারা সাফল্যের কথা বলছেন, এমনকি বিজয়ও ঘোষণা করেছেন। অবশ্য ব্যক্তিগত আলোচনায় দেখা গেছে, দেশটির শাসকগোষ্ঠীর অভিজাতরা এই যুদ্ধ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
কারণ তারা জানেন, ইরানের ওপর চাপ আরও বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনো বহু উপায় ও কৌশল রয়েছে। একই সঙ্গে তেহরানের আশঙ্কা, যেসব বিষয় আপাতত ওয়াশিংটনকে সংযত রাখছে; গোলাবারুদের মজুত কমে আসা, দেশের ভেতরের জনমত এবং আন্তর্জাতিক বিরোধিতা; সেগুলো একসময় দূর হয়ে যেতে পারে। সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের কাছে গুরুত্ব হারাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে একে আপাত ইতিবাচক খবর বলে মনে হতে পারে। তেহরান যদি এখনো ওয়াশিংটনকে ভয় পায়, তাহলে হয়তো যুক্তরাষ্ট্র চাপ প্রয়োগ করে ইরানি নেতৃত্বকে কিছু ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারবে। কিন্তু এ ধরনের ধারণা তেহরানের বর্তমান মানসিকতাকে ভুলভাবে বোঝার শামিল।
যুদ্ধ ইরানের ক্ষমতাসীন অভিজাতদের আরও কঠোর করে তুলেছে। এই যুদ্ধে তাদের বন্ধু ও পরিবারের সদস্যরা নিহত হয়েছেন। ইরানিরা ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারিকে এখন অনেকটা সেই দৃষ্টিতে দেখছেন, যেভাবে ইসরায়েলিরা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলাকে দেখে। আর এ থেকেই তাদের মধ্যে এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে যে এই শত্রুকে স্থায়ীভাবে পরাজিত করতেই হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকদের ওপর ইরানের আস্থা আগেও খুব একটা ছিল না। এখন সেই আস্থা প্রায় পুরোপুরিই হারিয়ে গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরান এখন এমন এক কৌশল গ্রহণ করছে, যার মূল বৈশিষ্ট্য হলো ক্রমাগত উত্তেজনা বাড়ানো এবং লাগাতার আক্রমণাত্মক অবস্থান বজায় রাখা। অর্থাৎ তেহরান বর্তমান অবস্থানে স্থিরও থাকবে না, আবার ওয়াশিংটনের সঙ্গে আপসও করবে না।
বরং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক অংশীদার দেশগুলোর অর্থনীতিতে আরও বড় আঘাত হানতে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে আরও বিপর্যস্ত করতে ইরান নতুন নতুন পদক্ষেপ নিতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলার পরিধিও বাড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের হত্যার চেষ্টা চালাতেও পারে ইরান, এমন শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে স্থল অভিযান শুরু করার সম্ভাবনাও দেখছেন অনেকে। এর মধ্যে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি দখলের চেষ্টাও থাকতে পারে।
তবে ইরানের এই কৌশল যুক্তরাষ্ট্রকে পিছু হটতে বাধ্য করতে ব্যর্থও হতে পারে। অবশ্য বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষই যদি অন্য পক্ষকে পুরোপুরি পরাস্ত করতে না পারে এবং শেষ পর্যন্ত উভয়েই কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়, তবু সেই শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তেহরানের ধারণা ওয়াশিংটন কিছু সময় নিয়ে আবার নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে নতুন করে সংঘাতে ফিরবে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো উসকানির জবাব কঠোরভাবে দিতে ইরানি শাসকগোষ্ঠী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এমনকি সরাসরি কোনো উসকানি ছাড়াই হামলা চালানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
তেহরান মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখে সহাবস্থান করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই অঞ্চল থেকে সরিয়ে দিতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করতেও তারা প্রস্তুত।
অন্যভাবে বললে, ইরানের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এতটাই ব্যয়বহুল ও কষ্টকর করে তোলা, যাতে ওয়াশিংটনের সামনে অধিকাংশ সেনা প্রত্যাহার করা ছাড়া আর কোনো বাস্তব বিকল্প না থাকে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে হরমুজ প্রণালীর ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে এই অঞ্চলের একটি স্থায়ী শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও বাধ্য করতে চায় তেহরান।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার মুহূর্তে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির কার্যালয় প্রাঙ্গণে এক বৈঠকে ছিলেন। এর আগের কয়েক মাস ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। তবে যুদ্ধ শুরুর আগের কয়েক সপ্তাহে ওয়াশিংটন তার বিপুল সামরিক সম্পদ পারস্য উপসাগরের আরও কাছে সরিয়ে আনে এবং ইরানকে সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করার দাবি জানায়।
ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই এমন ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন যে, তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সরকার উৎখাতের চেষ্টা করতে পারেন।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং সংঘাতের ক্রমবর্ধমান আশঙ্কা নিয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ব্রিফ করছিলেন আরাঘচি। ঠিক তখনই বোমা পড়তে শুরু করে।
প্রথম দফার হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল খামেনির কার্যালয় প্রাঙ্গণ। ওই হামলায় বহু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হন, তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিও ছিলেন।
তবে আরাঘচি বেঁচে যান। ধ্বংসস্তূপ থেকে যখন তিনি বেরিয়ে আসেন, তখন তিনি হতভম্ব এবং ধুলা-ময়লায় আচ্ছন্ন এক মানুষ।

ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির গ্রাফিক। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ
এক ইরানি পডকাস্টারকে দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি দৌড়ে রাস্তায় বেরিয়ে একটি চলন্ত গাড়ি থামান এবং চালককে তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়ে যেতে বলেন। সেখানে পৌঁছে তিনি যেসব সামরিক কমান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এবং বিদেশি নেতাদেরও ফোন করা শুরু করেন। কিছু সময় পর বেঁচে যাওয়া অন্য কর্মকর্তারাও তার সঙ্গে যোগ দেন।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র বহুদিন ধরেই আশঙ্কা করছিল, কোনো এক পর্যায়ে খামেনি ও তার শীর্ষ সহযোগীরা নিহত হতে পারেন। সে কারণে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতিও আগে থেকেই নেওয়া ছিল।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সরকার প্রায় এক বছর ধরে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক আমলাতান্ত্রিক কাঠামো বিকেন্দ্রীকরণের কাজ করেছিল, যাতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশ ছাড়াই প্রাদেশিক গভর্নর ও সামরিক কমান্ডাররা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেন।
জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের প্রত্যেককেই অন্তত দুজন সম্ভাব্য উত্তরসূরির নাম নির্ধারণ করে রাখতে বলা হয়েছিল, যাতে তারা নিহত হলে দ্রুত দায়িত্ব হস্তান্তর করা যায়। তারপরও এই হামলার অভিজ্ঞতা শাসকগোষ্ঠীর জন্য ছিল গভীর।
ইরানের নেতারা আর এক জায়গায় অবস্থান করতে পারছিলেন না। নিরাপত্তার কারণে তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি ও মোটরসাইকেলে করে এক বাংকার থেকে আরেক বাংকারে ছুটতে হচ্ছিল। একই সঙ্গে তাদের সহকর্মী, বন্ধু এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর শোকও সামলাতে হচ্ছিল।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এসব হামলায় তার বাবা ছাড়াও স্ত্রী, এক বোন ও এক ভাতিজিকে হারান। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় মোজতবা নিজেও আহত হয়েছিলেন।
শুধু এসব ধাক্কাই ইরানের সরকারকে ইসরায়েল ও ওয়াশিংটনের প্রতি আগের চেয়ে আরও বেশি বৈরী করে তোলার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো; বিশেষ করে জ্বালানি স্থাপনা ও পরিবহন নেটওয়ার্কে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা দেশটির শাসকগোষ্ঠীর ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে।
তাদের ধারণা, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো সীমিত যুদ্ধ করছে না, যার লক্ষ্য শুধু দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতার কাঠামো পরিচালনা করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা। বরং তেহরানের শাসকগোষ্ঠী মনে করছে, এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য ইরান রাষ্ট্রকেই ধ্বংস করা।
আর এই উপলব্ধি থেকেই তেহরান আরও কঠোর ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে। মোজতবা খামেনি নিহত সামরিক কর্মকর্তাদের জায়গায় কট্টরপন্থী সামরিক নেতাদের পদোন্নতি দিয়েছেন এবং তাদের ‘শত্রুর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান’ চালানোর প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মহসেন রেজাইকে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি করা হয়েছে। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পদ ও তেল কোম্পানিগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করবে ইরান।
দেশটি এখন ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক অংশীদারদের ওপরও প্রকাশ্যে হামলা চালাতে শুরু করেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক প্রভাব বিস্তার করলেও, সেটি মূলত তার বিভিন্ন মিত্রগোষ্ঠীর মাধ্যমে পরিচালিত হতো।
আর এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আগাম হামলার কৌশলও। উদাহরণ হিসেবে, জুলাইয়ে জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত কয়েকটি ঘাঁটিতে হামলা চালায় ইরান। তেহরানের দাবি ছিল, ওই ঘাঁটিগুলো ইরানের বিরুদ্ধে হামলার প্রস্তুতিস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের তিন সেনা নিহত হন।
শাসকগোষ্ঠীর এই নতুন কৌশলের উদ্দেশ্য শুধু মনস্তাত্ত্বিকভাবে ওয়াশিংটনকে শায়েস্তা করা নয়। এর আরেকটি লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা অবকাঠামোর সক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে ক্ষয় করা।
এই দিক থেকে ইরান যেন ইসরায়েলের তথাকথিত ‘মোয়িং দ্য লন’ কৌশলের নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করছে। এই কৌশলে বড় ধরনের সংঘাতের মধ্যবর্তী সময়ে সীমিত কিন্তু বারবার হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষের সক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়া হয়।
তেহরানের লক্ষ্য, ভবিষ্যৎ হামলা থেকে নিজের বাহিনী ও মিত্রদের রক্ষা করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্রমশ কম সক্ষম করে তোলা। যাতে ওই অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি ধরে রাখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানি নেতারা তাদের ব্যবহৃত কৌশলের ফল নিয়ে সন্তুষ্ট। তাদের বিশ্বাস, পুরো অঞ্চলজুড়ে দ্রুত ও ব্যাপক মাত্রায় উত্তেজনা বাড়ানোর ফলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে। আর এতে যুদ্ধের তীব্রতাও কিছুটা কমেছে।
তবে তেহরানের অভিজাতরা মনে করেন না যে ইরান পুরোপুরি বিজয়ী হয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পতন আসন্ন বলে পূর্বাভাস দিয়ে আসছেন। এমনকি প্রত্যাশার তুলনায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা অনেক বেশি কার্যকর প্রমাণিত হওয়ার পরও তারা দেশটিকে দুর্বল হিসেবেই তুলে ধরছেন।
উদাহরণ হিসেবে, সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, ইরান ‘মৃত্যুচক্রে’ প্রবেশ করেছে।
তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর কাছে এই ধারণাগত ব্যবধান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ইরানি কর্মকর্তারা মনে করেন, ওয়াশিংটন যদি বিশ্বাস করে যে আর একটি নিষেধাজ্ঞা, আর একটি হামলা কিংবা আর একটি বিক্ষোভই সরকারকে পতনের মুখে ঠেলে দিতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগ বন্ধ করবে না।
মৃত্যুর আগে খামেনি ব্যক্তিগত ও প্রকাশ্য দুই পরিসরেই সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরানের সামরিক শক্তি এমন পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত ওয়াশিংটন দেশটিকে শান্তিতে থাকতে দেবে না, যখন সেই শক্তিকে অস্বীকার করার আর কোনো সুযোগ থাকবে না।
আর গত আগস্টে মোজতবা খামেনি ইরানের সামরিক বাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ প্রতিরোধ সক্ষমতা’ অর্জনের নির্দেশ দেন।
অতীতে ইরানের কিছু নেতা মনে করতেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কোনো পথ হয়তো বের করা সম্ভব। কিন্তু এখন শাসকগোষ্ঠীর প্রায় কেউই আর তা বিশ্বাস করেন না।
বরং তেহরানের সিদ্ধান্ত হলো, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই সদিচ্ছাপূর্ণ আলোচনার অংশীদার হবে না। তাদের দৃষ্টিতে ওয়াশিংটনের অতীত আচরণই বারবার বিশ্বাসভঙ্গের উদাহরণ।
মাত্র তিন বছরের মাথায় যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। ২০২৫ সালের জুন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালায়, দুই পক্ষ তখনও আলোচনায় ছিল।
তেহরানের দৃষ্টিতে, দুই দেশের সর্বশেষ শান্তি উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার দায়ও যুক্তরাষ্ট্রের। জুনে দুই দেশ যে ‘সমঝোতা স্মারক’ স্বাক্ষর করেছিল, হরমুজ প্রণালী দিয়ে নতুন একটি নৌপরিবহন করিডোর চালুর চেষ্টা করে ওয়াশিংটন সেটিকে কার্যত ভেঙে দিয়েছে। অন্তত এমনটাই মনে করছে ইরান।
ইরানের শাসকগোষ্ঠীর আরেকটি উদ্বেগ হলো, বর্তমান সুবিধাজনক অবস্থান চিরস্থায়ী হবে না।
যথেষ্ট সময় পেলে বৈশ্বিক অর্থনীতি পারস্য উপসাগরনির্ভর রপ্তানি রুটের বিকল্প পথ তৈরি করে নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রাখার কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যাবে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন সময়ের সঙ্গে আরও শক্তিশালী অবস্থানে যেতে পারে। ইরানি নেতাদের ধারণা, আপাতত ট্রাম্প কিছুটা সীমাবদ্ধ অবস্থায় আছেন, কারণ তিনি চান আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা জয়ী হোক। অথচ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ আরও সম্প্রসারণ করা যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয়।
কিন্তু নির্বাচন শেষ হয়ে গেলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে জনসমর্থনের হার নিয়ে এতটা ভাবতে হবে না।
তেহরান চাইলে ২০২৮ সালে একজন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার অপেক্ষা করতে পারে। কিন্তু তাতেও তাদের অবস্থার খুব একটা উন্নতি হবে বলে তারা মনে করে না।
জো বাইডেন নির্বাচনী প্রচারের সময় ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তিনি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির নিষেধাজ্ঞাগুলোকে কাজে লাগিয়ে ইরানের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের চেষ্টা করেন, যা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।
তেহরানের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রশাসনও একইভাবে মনে করতে পারে যে ইরানের সঙ্গে সংঘাত এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখান থেকে আর সহজে ফিরে আসা সম্ভব নয়। ফলে তারাও চাপ অব্যাহত রাখতে পারে।
বরং যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলক মধ্যপন্থী কোনো প্রেসিডেন্ট ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন। কারণ তিনি ওয়াশিংটনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলো পুনর্গঠন করে এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদারদের ইরানবিরোধী অভিযানে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে সক্ষম হতে পারেন।
তাই ইরানি শাসকগোষ্ঠী চুপচাপ বসে থাকবে; এমন সম্ভাবনা কম। বরং তারা এখন থেকেই ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াতে শুরু করবে। আর এ জন্য তেহরানের হাতে আছে নানান উপায়।

তেহরানের রাস্তায় গত সেপ্টেম্বরে মোতায়েন করা মিসাইল। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ
উদাহরণ হিসেবে, সরকার পারস্য উপসাগর থেকে গ্যাস ও তেল রপ্তানি আরও কঠোরভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে তেহরান ইতোমধ্যেই এ বাণিজ্যের বড় অংশ আটকে দিয়েছে। তবে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ এখনো সরাসরি ভারত মহাসাগরে পৌঁছাতে পারে, কিংবা লোহিত সাগর হয়ে পণ্য পরিবহন করতে পারে।
এসব দেশের রপ্তানি পথও বন্ধ করতে ইরান সরাসরি তাদের তেল উৎপাদন স্থাপনা ও বন্দরগুলোতে হামলা চালাতে পারে। একই সঙ্গে ইয়েমেনে তাদের হুতি মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে লোহিত সাগরেও নৌ চলাচল বন্ধের চেষ্টা করা হতে পারে। গাজা যুদ্ধের বড় একটি সময়জুড়ে যেমন দেখা গেছে, হুতিরা সেখানে চলাচলকারী জাহাজে হামলার হুমকি দিয়েই নৌপথটি কার্যত অচল করার চেষ্টা করেছিল।
ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর কাছ থেকে আরও ভূখণ্ড দখল করে হুতিরা এখন আবারও ওই নৌপথ বন্ধ করে দেওয়ার মতো একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরব সাময়িকভাবে সেই পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেয়, যেটি দিয়ে পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগরে তেল পরিবহন করা হয়।
ইরান তার সরাসরি প্রতিপক্ষদের ওপর হামলা আরও তীব্র করতে পারে। এর অর্থ হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে আরও বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সাইবার অভিযানও বাড়াতে পারে তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের ধারণা, গত জুলাইয়ে মিনেসোটার পানি সরবরাহ অবকাঠামোর কিছু অংশ সাময়িকভাবে অচল হওয়ার ঘটনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতা ছিল। ভবিষ্যতে আবার হামলার মুখে পড়লে তেহরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বেসামরিক অবকাঠামোকেও আরও আক্রমণাত্মকভাবে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এমনকি পানি লবণমুক্তকরণ কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালিয়ে কোনো কোনো এলাকাকে বসবাসের অনুপযোগী করে তোলার চেষ্টা করা হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের হত্যার চেষ্টাও চালাতে পারে তেহরান।
ইরানের জন্য এটি এক অর্থে পুরোনো কৌশলে ফিরে যাওয়া হবে। ১৯৮০’র দশকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র এবং তার লেবাননি শিয়া মিত্ররা বহু টার্গেটকিলিং অভিযান চালিয়েছিল। ইউরোপে ইরানি ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যা এবং একাধিক বোমা হামলায় শত শত যুক্তরাষ্ট্র ও ফরাসি সেনা নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল।
১৯৯০’র দশকের শেষভাগে ইরান মূলত এ ধরনের অভিযান থেকে সরে আসে। তখন অন্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চলছিল এবং একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনকে প্রতিরোধমূলক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছিল। কিন্তু এখন ইরানি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনেকেই টার্গেটকিলিং পরিচালনায় পুরোনো দক্ষতা হারানোর বিষয়ে আক্ষেপ করছেন। তেহরানও এই সক্ষমতা পুনর্গঠনে আগ্রহী বলেই মনে হচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের হত্যা করা ইরানের জন্য সহজ হবে না। ইরানের হাতে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের মতো অত্যাধুনিক অস্ত্র কিংবা সেই মাত্রার গোয়েন্দা সক্ষমতা নেই, যেগুলোর সহায়তায় ইসরায়েল ও ওয়াশিংটন ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের হত্যা করতে পেরেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের দাবি, ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে হত্যার জন্য একজন ভাড়াটে ঘাতক নিয়োগের চেষ্টা করেছিল তেহরান। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত সেই পরিকল্পনা ভেস্তে দেয়। ইরান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
তারপরও তেহরানের সামনে কিছু বিকল্প রয়েছে। তারা গোপন অভিযান চালাতে পারে, কিংবা আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে হত্যা করার চেষ্টা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সদস্যদেরও লক্ষ্য করা হতে পারে।
গত আগস্টে, উদাহরণ হিসেবে, ইরানের সেনাবাহিনী ঘোষণা করেছিল; কেউ যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সেনাকে হত্যা বা আটক করতে পারলে তাকে ৩০ হাজার ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে।
ইরান মনে করতে পারে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তার সঙ্গে যা করেছে, তাদের সঙ্গেও একই কাজ করলেই প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ সক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তবে তা যদি যথেষ্ট না হয়, তাহলে নতুন কৌশল গ্রহণ করতেও ইরানি কর্মকর্তারা দ্বিধা করবেন না।
তারা চাইলে বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থায়ও বিঘ্ন ঘটাতে পারে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে শুধু তেলই পরিবাহিত হয় না; গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোও এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়াকে যুক্ত করা সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবল।
যুদ্ধ-ডুবুরি, চালকবিহীন পানির নিচের যান কিংবা সমুদ্রতলের ওপর নোঙর টেনে নেওয়া জাহাজ ব্যবহার করে তেহরান এসব কেবল বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করতে পারে।
আরও নাটকীয় পদক্ষেপ হিসেবে ইরান আশপাশের ভূখণ্ড দখলের চেষ্টাও করতে পারে।
ইরানি বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন, ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েল গাজা উপত্যকা, লেবানন ও সিরিয়ার কিছু ভূখণ্ড দখল করে এবং দাবি করে যে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য এসব পদক্ষেপ জরুরি ছিল। তাদের যুক্তি, ইরানেরও একইভাবে নিজস্ব নিরাপত্তা অঞ্চল গড়ে তোলার চেষ্টা করা উচিত।
তেহরান যদি মনে করে যে যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাহলে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা একসময় ইরানে স্থল আক্রমণ এবং দেশটির প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল খার্গ দ্বীপ দখলের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলার পর, কিছু ইরানি বিশ্লেষক ও কট্টরপন্থী সংসদ সদস্য বাহরাইন ও কুয়েতে অভিযান চালিয়ে কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি দখলের প্রস্তাব দেন।
তেহরান এমন পদক্ষেপকে ভূখণ্ড সম্প্রসারণ নয়, বরং প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরতে পারে। আর এর উদ্দেশ্য হবে প্রতিপক্ষকে ইরানের কাছাকাছি সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ না দেওয়া।
একই যুক্তি তেহরান আরও উত্তরের দিকেও প্রয়োগ করতে পারে।
আজারবাইজান ও ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অস্বস্তিকর। কিছু আজারবাইজানি ইরানের আজেরি-অধ্যুষিত প্রদেশগুলোকে বৃহত্তর আজারবাইজানের অংশ হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে কিছু ইরানি মনে করেন, বর্তমান আজারবাইজান প্রজাতন্ত্র বৃহত্তর ইরানের ঐতিহাসিক অংশ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়েছে। আজারবাইজান ও ইসরায়েল ঘনিষ্ঠ অংশীদার। ইরানের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি বিশ্বাসযোগ্যভাবেই অভিযোগ করেছেন যে, আজারবাইজান ইসরায়েলকে তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সুযোগ দিয়েছে।
আজারবাইজান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে দেশটি ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহকারী। এই বিষয়টিই হয়তো তেহরানকে ইরান সীমান্তবর্তী আজারবাইজানের বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড নাখচিভান দখলের চেষ্টা করতে উৎসাহিত করতে পারে। অন্তত আজারবাইজানের জ্বালানি অবকাঠামো ইরানি হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
একইভাবে, ইরান ইরাকের কুর্দি অঞ্চলেও সামরিক অনুপ্রবেশ ঘটাতে পারে। তেহরান এই অঞ্চলকেও তার প্রতিপক্ষদের সম্ভাব্য অভিযানস্থল হিসেবে দেখে।
যুদ্ধের শুরুর কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়ার এবং তাদের দিয়ে স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনা উত্থাপন করেছিলেন।
তেহরান যদি মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল থেকে ইরানের দিকে একটি স্থল করিডর তৈরি করতে চায়। আর এটি ইরাকের কুর্দি অঞ্চল দিয়েই যেতে হবে, তাহলে ইরান আগাম স্থল হামলা চালাতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে তেহরান ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের সিরিয়ায় হামলার আহ্বান জানাতে পারে। কারণ সম্ভাব্য এমন স্থল করিডরের অংশ হতে পারে সিরিয়াও।
সিরিয়ার নতুন নেতৃত্ব যদি লেবাননে ইরানের মিত্র হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান সহজতর করে, তাহলেও তেহরান এসব মিলিশিয়াকে সিরিয়ায় ঢোকার নির্দেশ দিতে পারে। এমনকি হুতিদের সৌদি ভূখণ্ডে প্রবেশের আহ্বানও জানানো হতে পারে।
সবশেষে, তেহরান সেই পদক্ষেপটিই নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে, যেটি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বহুদিন ধরে কাজ করে আসছে; পারমাণবিক বোমা তৈরি করা।
ইরান সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বলে আসছে যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। কিন্তু দেশটির সংসদ সদস্যসহ বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি এখন যুক্তি দিচ্ছেন, কার্যকর প্রতিরোধ সক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য তেহরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করা প্রয়োজন।
এই মত কতটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আর ইরান যদি সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
তারপরও ইরানের নেতারা যদি শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, অন্য কোনো উপায়েই ওয়াশিংটনের হামলা বন্ধ করা সম্ভব নয়, তাহলে তারা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথকেই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত বলে বিবেচনা করতে পারেন।
ইরান দ্রুত পারমাণবিক বোমা তৈরির পথে না গেলেও, তার উসকানির জবাবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত হামলা চালাতে পারে। তবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল পূর্ণমাত্রার স্থল অভিযান ছাড়া তারা আর কতটা অর্জন করতে পারবে, তা স্পষ্ট নয়।
ইরানি শাসকগোষ্ঠী ইতোমধ্যেই দেখিয়েছে যে তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। তাদের বিশ্বাস, তারা এমন এক অস্তিত্বের লড়াইয়ে আটকে গেছে, যেখানে জয়ী হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
ইসরায়েল ও ওয়াশিংটন যদি আরও বেশি নেতৃত্ব-নিধনকারী হামলা চালায়, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে কিংবা স্থলবাহিনী মোতায়েন করে, তাহলে তাতে ইরানের সংকল্প আরও শক্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সে ক্ষেত্রে তেহরান উত্তেজনা আরও এক ধাপ বাড়াবে। কারণ ইরানও শুরুতেই সর্বোচ্চ মাত্রার পাল্টা পদক্ষেপে যাবে না; বরং ধাপে ধাপে চাপ বাড়াবে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা হরমুজ প্রণালীর গ্রাফিক। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ
ওয়াশিংটন যদি এই বাস্তবতা বুঝতে পারে, তাহলে নতুন কোনো ইরানি উসকানির জবাবে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানো বা অন্য কোনো উপায়ে সংঘাত স্থগিত রাখার চেষ্টা করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সেটিও কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র তার লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট। উপসাগরী অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব বাহিনী সরিয়ে দেওয়া। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে অনির্দিষ্টকাল যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি বজায় রাখতেও তারা রাজি।
এমনকি ওয়াশিংটন যখন অপ্রস্তুত বলে মনে হবে, তখন সরাসরি হামলা বা হুমকি ছাড়াই তেহরান বড় ধরনের আক্রমণ শুরু করতে পারে।
এ ধরনের অভিযানে ইরান ও তার মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আঞ্চলিক অংশীদার ও সামরিক ঘাঁটির বিরুদ্ধে অত্যন্ত সমন্বিত ও একযোগে স্থল অভিযান চালাতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ব্যাপক বোমা হামলা, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ওপরও আক্রমণ।
লক্ষ্য হবে খুব দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতাকে চাপে ফেলে পিছু হটতে বাধ্য করা।
তবে এমন বড় ধরনের হামলার আগে, এমনকি অপেক্ষাকৃত সীমিত মাত্রার উত্তেজনা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও, ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে সতর্ক থাকতে হবে।
নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটানো ও অবরোধ ভাঙার উপায় বের করতে ইরানি কর্মকর্তারা কাজ করছেন। কিন্তু যুদ্ধ চলতে থাকলে দেশের ভেতরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপও প্রায় নিশ্চিতভাবেই বাড়বে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র একটি স্বৈরশাসিত ব্যবস্থা হলেও, অতিরিক্ত সংঘাতমুখী অবস্থানের জন্য কর্তৃত্ববাদী শাসনও মূল্য দিতে পারে। বিশেষ করে যদি আগে থেকেই অভ্যন্তরীণ সংকট থাকে।
আর এর উদাহরণ আর্জেন্টিনা। ১৯৮২ সালে যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ দখলের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর দেশটির দুর্বল সামরিক জান্তা দ্রুত ভেঙে পড়ে।
ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব এই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন। সে কারণেই তারা বারবার বলেছে, সামরিক সিদ্ধান্তের পেছনে অন্তত কিছুটা হলেও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সমর্থন থাকতে হবে।
আগস্টের এক সাক্ষাৎকারে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি মহসেন রেজাই বলেন, তার দেশ এমন একটি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত পথে এগোবে, যেখানে “বিশ্ব আমাদের সঙ্গে চলতে পারবে” এবং ইরানের “নিজস্ব জনগণও” বুঝতে পারবে যে “আমরা আসলে যুদ্ধ চাইছি না।”
তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বের বিশ্বাস, ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড তাদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী জনসমর্থন তৈরি করেছে।
তাদের দাবি, বিভিন্ন বিদেশি সরকার ব্যক্তিগতভাবে ইরানি কর্মকর্তাদের জানাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপের বিরুদ্ধে তেহরানের প্রতিরোধকে তারা সম্মান করে।
ইরানি নেতাদের আরও ধারণা, দেশের জনগণকেও তারা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে এই যুদ্ধের মূল্য দেওয়ার মতো কারণ রয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারির আগে অনেক ইরানিই শাসকগোষ্ঠীর সেই দাবিকে সন্দেহের চোখে দেখতেন যে ওয়াশিংটন শুধু সরকার নয়, পুরো দেশটিকেই “গিলে ফেলতে” চায়।
কিন্তু ট্রাম্প যখন বেসামরিক অবকাঠামোয় বোমা হামলা শুরু করেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করেন এবং ঘোষণা করেন যে ইরান নৌপথটি খুলে না দিলে দেশটির পুরো সভ্যতা “মরে যাবে”, তখন শাসকগোষ্ঠীর পুরোনো সতর্কবার্তাগুলো অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হতে শুরু করে।
এক অর্থে, ইরান এর আগেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরপরই ইরাক দেশটিতে হামলা চালায়। একই সময়ে সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠীগুলোও বারবার শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
১৯৮১ সালে, উদাহরণ হিসেবে, এক বোমা হামলায় ক্ষমতাসীন ইসলামিক রিপাবলিকান পার্টির নেতৃত্বের বড় একটি অংশ নিহত হয়।
যারা বেঁচে ছিলেন, তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে শুধু সাংগঠনিকভাবে টিকে থাকার সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে বিরোধীদের বিরুদ্ধে এতটাই শক্ত পাল্টা আঘাত হানতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতে আর কখনো এই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস না পায়।
মোজতবা খামেনি ছাড়া ইরানের নতুন নেতৃত্বের বড় অংশ এখনো বিপ্লব-পরবর্তী পুরোনো অভিজাতদের মধ্য থেকেই এসেছে। তারা সেই অভিজ্ঞতার শিক্ষা ভালোভাবেই মনে রেখেছেন।
তাদের সিদ্ধান্ত হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা থামাতে হলে আবারও নিজেদের শক্তি এমনভাবে দেখাতে হবে, যাতে প্রয়োজন হলে বছরের পর বছর আক্রমণাত্মক অবস্থান ধরে রাখতেও দ্বিধা না থাকে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র পিছু না হটা পর্যন্ত ক্রমেই বিস্তৃত পরিসরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে তেহরান প্রস্তুত।
অবশ্য উত্তেজনা বাড়ানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক কৌশল।
ইরান যদি সীমা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে ঠিক সেই ধরনের যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াই উসকে দিতে পারে, যেটি ঠেকাতে তারা এত কিছু করছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সেনা মোতায়েন এবং বড় ধরনের স্থল অভিযানও থাকতে পারে।
অন্যদিকে দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়লে দেশে নতুন করে বিক্ষোভও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তারপরও তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর বিশ্বাস, তারা বড় ধরনের জনরোষ এড়াতে পারবে। বরং তাদের কর্মকর্তাদের কাছে এই ঝুঁকিগুলোই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আরেকটি কারণ।
ইরানি নেতারা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন চাপের মধ্যে আছে, বিশ্বের বড় একটি অংশ তাদের অবস্থানের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং দেশের জনগণও সরকারের পাশে রয়েছে।
অন্যভাবে বললে, তাদের বিশ্বাস; ওয়াশিংটনকে শেষ পর্যন্ত পরাজিত করার এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় সুযোগ।
লেখক পরিচিতি: মোহাম্মদ আয়াতুল্লাহি তাবার টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির বুশ স্কুল অব গভর্নমেন্ট অ্যান্ড পাবলিক সার্ভিসে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহযোগী অধ্যাপক। পাশাপাশি তিনি রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসির ফেলো এবং কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের ননরেসিডেন্ট স্কলার। ইরানের রাজনীতি ও ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। তার উল্লেখযোগ্য বই হলো “রিলিজিয়াস স্টেটক্র্যাফট: দ্য পলিটিক্স অব ইসলাম ইন ইরান”।





