ক্যালকুলেটর মানুষকে গণিত থেকে দূরে সরায়নি। বরং মুক্ত করেছিল বড় চিন্তার জন্য। এআইয়ের ক্ষেত্রেও সেই একই সুযোগ আছে। শর্ত একটাই। যন্ত্রের ওপর নির্ভরতা যেন নিজের চিন্তার জায়গাটা পুরোপুরি দখল করে না নেয়। গিফ: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ
প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৯ এএম
ক্যালকুলেটর মানুষকে গণিত থেকে দূরে সরায়নি। বরং মুক্ত করেছিল বড় চিন্তার জন্য। এআইয়ের ক্ষেত্রেও সেই একই সুযোগ আছে। শর্ত একটাই। যন্ত্রের ওপর নির্ভরতা যেন নিজের চিন্তার জায়গাটা পুরোপুরি দখল করে না নেয়। গিফ: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ
আপনার হাতের স্মার্টফোনটার দিকে একবার তাকান। কতজনের ফোন নম্বর মুখস্থ আছে আপনার? বাবা-মায়ের নম্বরটা হয়তো মনে আছে। কিন্তু ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা সহকর্মীর নম্বর? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উত্তর, না। স্মার্টফোন আসার পর এই মুখস্থবিদ্যাটা আমাদের দরকার পড়েনি। তাই সেই ক্ষমতাটা ধীরে ধীরে কমে গেছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, এআই কি আমাদের চিন্তাশক্তির ক্ষেত্রেও একই কাজ করবে?
ক্যালকুলেটরের গল্পটা মনে করুন
গত শতকের সত্তর দশকের কথা। তখন প্রথম পকেট ক্যালকুলেটর বাজারে আসে। শিক্ষকরা রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তাদের ভয় ছিল, ছাত্রছাত্রীরা আর নিজে হাতে যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ করতে শিখবে না। গণিতের বুনিয়াদি জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে গোটা প্রজন্ম।
বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। ক্যালকুলেটর মানুষের কাছ থেকে ক্লান্তিকর হিসাব কেড়ে নিয়েছে ঠিকই। কিন্তু সেই সময় মানুষ ঢেলে দিয়েছে অনেক বড় জায়গায়। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায়। প্রকৌশল নকশায়। হিসাবের শ্রমিক অংশটুকু যন্ত্রের হাতে দিয়ে মানুষ নিজে হয়ে উঠেছে হিসাবের স্থপতি।
তবে একটা শর্ত ছিল। যে ছাত্র যোগ বিয়োগের মূল ধারণাটা বোঝে না, তাকে ক্যালকুলেটর দিলেও সে ভুল উত্তর ধরতে পারবে না। যন্ত্র জ্ঞান প্রতিস্থাপন করেনি। জ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকেই আরও দক্ষ করেছে।
এআই কি ঠিক একই পথে হাঁটছে?
এআইয়ের বেলাতেও গল্পটা অনেকটা মিলে যায়। কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ ফারাক আছে। ক্যালকুলেটর শুধু সংখ্যা নিয়ে কাজ করত। উত্তর একটাই, ভুল হওয়ার সুযোগ কম। কিন্তু এআই কাজ করে ভাষা, যুক্তি আর মতামত নিয়ে। এখানে সঠিক উত্তর বলে কিছু সবসময় থাকে না। এআই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্যও দিতে পারে। তাই এখানে মানুষের ভূমিকাটা আগের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
১. ক্রিটিক্যাল থিংকিং বা বিশ্লেষণাত্মক বুদ্ধি
এআই তথ্যের জোগান দেবে অফুরন্ত। কিন্তু কোনটা সঠিক, কোনটা পক্ষপাতদুষ্ট, কোনটা পুরোপুরি ভুল, সেই বিচারের ভার আপনারই। যে মানুষ নিজে থেকে যাচাই করার অভ্যাস হারিয়ে ফেলবে, সে এআইয়ের ভুলকেও সত্যি বলে গিলে ফেলবে।
২. প্রশ্ন তোলার দক্ষতা
এআই থেকে ভালো উত্তর বের করার কৌশলটাই আজকের যুগের নতুন দক্ষতা। একে বলা হয় প্রম্পটিং। কিন্তু ভালো প্রশ্ন করতে হলে আগে বিষয়টা সম্পর্কে নিজের একটা কাঠামোগত ধারণা থাকা চাই। এআই ব্যবহার করার আগেই নিজেকে শিখতে হয়, কী জানতে চাই, কেন জানতে চাই।
৩. সৃজনশীলতার নতুন সংজ্ঞা
লেখা, ছবি আঁকা বা কোড লেখার প্রাথমিক খসড়া এখন এআই মুহূর্তেই বানিয়ে দেয়। কিন্তু সেই খসড়াকে অর্থবহ ও মৌলিক করে তোলার কাজটা এখনো মানুষেরই। ক্যামেরা আসার পর চিত্রশিল্প মরে যায়নি। বরং জন্ম দিয়েছে বিমূর্ত শিল্পের। এআইও হয়তো সৃজনশীলতাকে নতুন খাতে বইয়ে দেবে।
ঝুঁকিটা কোথায়
সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়। সমস্যা ব্যবহারের অভ্যাসে। যে ছাত্র রচনা লেখার আগেই এআইকে দিয়ে পুরো রচনা লিখিয়ে নেয়, তার লেখার হাত তৈরি হওয়ার আগেই থমকে যায়। যে কর্মী প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য এআইয়ের ওপর নির্ভর করে, তার নিজস্ব বিচারবুদ্ধি ধীরে ধীরে মরচে ধরে যায়।
ফারাকটা এখানেই। ক্যালকুলেটর একটা সংকীর্ণ কাজ থেকে মানুষকে মুক্তি দিয়েছিল, যাতে সে বড় কাজে মনোযোগ দিতে পারে। কিন্তু এআই ঢুকে পড়ছে মানুষের চিন্তা, ভাষা আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার একদম কেন্দ্রে। তাই সীমারেখা টানার দায়িত্বটাও মানুষেরই। কোন কাজ এআইকে দেব, আর কোন কাজ নিজের মস্তিষ্ককে সচল রাখতে নিজেই করব, সেই বিচার আমাদেরই করতে হবে।
বেছে নেওয়ার দায়িত্ব মানুষের
এআই মস্তিষ্ককে অলস বানাবে, নাকি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। উত্তরটা প্রযুক্তির হাতে নেই। উত্তরটা আছে ব্যবহারকারীর হাতে। যে মানুষ এআইকে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করে, নিজে প্রশ্ন তোলে, যাচাই করে, সিদ্ধান্ত নেয়, তার কাছে এআই একটা যন্ত্র নয়, লিভার। এটা তাকে আরও উঁচুতে তুলবে। আর যে সবকিছু এআইয়ের হাতে ছেড়ে দেয়, তার জন্য এটা একটা ধীর, নিঃশব্দ ক্ষয়।
ক্যালকুলেটর মানুষকে গণিত থেকে দূরে সরায়নি। বরং মুক্ত করেছিল বড় চিন্তার জন্য। এআইয়ের ক্ষেত্রেও সেই একই সুযোগ আছে। শর্ত একটাই। যন্ত্রের ওপর নির্ভরতা যেন নিজের চিন্তার জায়গাটা পুরোপুরি দখল করে না নেয়।
আপনার হাতের স্মার্টফোনটার দিকে একবার তাকান। কতজনের ফোন নম্বর মুখস্থ আছে আপনার? বাবা-মায়ের নম্বরটা হয়তো মনে আছে। কিন্তু ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা সহকর্মীর নম্বর? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উত্তর, না। স্মার্টফোন আসার পর এই মুখস্থবিদ্যাটা আমাদের দরকার পড়েনি। তাই সেই ক্ষমতাটা ধীরে ধীরে কমে গেছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, এআই কি আমাদের চিন্তাশক্তির ক্ষেত্রেও একই কাজ করবে?
ক্যালকুলেটরের গল্পটা মনে করুন
গত শতকের সত্তর দশকের কথা। তখন প্রথম পকেট ক্যালকুলেটর বাজারে আসে। শিক্ষকরা রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তাদের ভয় ছিল, ছাত্রছাত্রীরা আর নিজে হাতে যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ করতে শিখবে না। গণিতের বুনিয়াদি জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে গোটা প্রজন্ম।
বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। ক্যালকুলেটর মানুষের কাছ থেকে ক্লান্তিকর হিসাব কেড়ে নিয়েছে ঠিকই। কিন্তু সেই সময় মানুষ ঢেলে দিয়েছে অনেক বড় জায়গায়। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায়। প্রকৌশল নকশায়। হিসাবের শ্রমিক অংশটুকু যন্ত্রের হাতে দিয়ে মানুষ নিজে হয়ে উঠেছে হিসাবের স্থপতি।
তবে একটা শর্ত ছিল। যে ছাত্র যোগ বিয়োগের মূল ধারণাটা বোঝে না, তাকে ক্যালকুলেটর দিলেও সে ভুল উত্তর ধরতে পারবে না। যন্ত্র জ্ঞান প্রতিস্থাপন করেনি। জ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকেই আরও দক্ষ করেছে।
এআই কি ঠিক একই পথে হাঁটছে?
এআইয়ের বেলাতেও গল্পটা অনেকটা মিলে যায়। কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ ফারাক আছে। ক্যালকুলেটর শুধু সংখ্যা নিয়ে কাজ করত। উত্তর একটাই, ভুল হওয়ার সুযোগ কম। কিন্তু এআই কাজ করে ভাষা, যুক্তি আর মতামত নিয়ে। এখানে সঠিক উত্তর বলে কিছু সবসময় থাকে না। এআই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্যও দিতে পারে। তাই এখানে মানুষের ভূমিকাটা আগের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
১. ক্রিটিক্যাল থিংকিং বা বিশ্লেষণাত্মক বুদ্ধি
এআই তথ্যের জোগান দেবে অফুরন্ত। কিন্তু কোনটা সঠিক, কোনটা পক্ষপাতদুষ্ট, কোনটা পুরোপুরি ভুল, সেই বিচারের ভার আপনারই। যে মানুষ নিজে থেকে যাচাই করার অভ্যাস হারিয়ে ফেলবে, সে এআইয়ের ভুলকেও সত্যি বলে গিলে ফেলবে।
২. প্রশ্ন তোলার দক্ষতা
এআই থেকে ভালো উত্তর বের করার কৌশলটাই আজকের যুগের নতুন দক্ষতা। একে বলা হয় প্রম্পটিং। কিন্তু ভালো প্রশ্ন করতে হলে আগে বিষয়টা সম্পর্কে নিজের একটা কাঠামোগত ধারণা থাকা চাই। এআই ব্যবহার করার আগেই নিজেকে শিখতে হয়, কী জানতে চাই, কেন জানতে চাই।
৩. সৃজনশীলতার নতুন সংজ্ঞা
লেখা, ছবি আঁকা বা কোড লেখার প্রাথমিক খসড়া এখন এআই মুহূর্তেই বানিয়ে দেয়। কিন্তু সেই খসড়াকে অর্থবহ ও মৌলিক করে তোলার কাজটা এখনো মানুষেরই। ক্যামেরা আসার পর চিত্রশিল্প মরে যায়নি। বরং জন্ম দিয়েছে বিমূর্ত শিল্পের। এআইও হয়তো সৃজনশীলতাকে নতুন খাতে বইয়ে দেবে।
ঝুঁকিটা কোথায়
সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়। সমস্যা ব্যবহারের অভ্যাসে। যে ছাত্র রচনা লেখার আগেই এআইকে দিয়ে পুরো রচনা লিখিয়ে নেয়, তার লেখার হাত তৈরি হওয়ার আগেই থমকে যায়। যে কর্মী প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য এআইয়ের ওপর নির্ভর করে, তার নিজস্ব বিচারবুদ্ধি ধীরে ধীরে মরচে ধরে যায়।
ফারাকটা এখানেই। ক্যালকুলেটর একটা সংকীর্ণ কাজ থেকে মানুষকে মুক্তি দিয়েছিল, যাতে সে বড় কাজে মনোযোগ দিতে পারে। কিন্তু এআই ঢুকে পড়ছে মানুষের চিন্তা, ভাষা আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার একদম কেন্দ্রে। তাই সীমারেখা টানার দায়িত্বটাও মানুষেরই। কোন কাজ এআইকে দেব, আর কোন কাজ নিজের মস্তিষ্ককে সচল রাখতে নিজেই করব, সেই বিচার আমাদেরই করতে হবে।
বেছে নেওয়ার দায়িত্ব মানুষের
এআই মস্তিষ্ককে অলস বানাবে, নাকি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। উত্তরটা প্রযুক্তির হাতে নেই। উত্তরটা আছে ব্যবহারকারীর হাতে। যে মানুষ এআইকে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করে, নিজে প্রশ্ন তোলে, যাচাই করে, সিদ্ধান্ত নেয়, তার কাছে এআই একটা যন্ত্র নয়, লিভার। এটা তাকে আরও উঁচুতে তুলবে। আর যে সবকিছু এআইয়ের হাতে ছেড়ে দেয়, তার জন্য এটা একটা ধীর, নিঃশব্দ ক্ষয়।
ক্যালকুলেটর মানুষকে গণিত থেকে দূরে সরায়নি। বরং মুক্ত করেছিল বড় চিন্তার জন্য। এআইয়ের ক্ষেত্রেও সেই একই সুযোগ আছে। শর্ত একটাই। যন্ত্রের ওপর নির্ভরতা যেন নিজের চিন্তার জায়গাটা পুরোপুরি দখল করে না নেয়।