Logo
Logo
×
ইরানের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের, কী হতে যাচ্ছে

ইরানের হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এআই

ইনসাইট ।  এক্সপ্লেইনার

আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার

ইরানের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের, কী হতে যাচ্ছে

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৬:২৭ পিএম

ইরানের প্রস্তাবিত সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

ইরান নতুন করে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার রোডম্যাপ উপস্থাপনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প তা নাকচ করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।

এর কয়েক দিন আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প ইরানকে ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছিলেন।

ইরানের সাত দিনের প্রস্তাবে কী ছিল?

ইরানের প্রস্তাবে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় চালুর একটি রোডম্যাপ তুলে ধরা হয়।

শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, ব্যর্থ জুনের ১৭ তারিখের ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) যুক্তরাষ্ট্র যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে নতুন প্রস্তাবে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার এক ব্যক্তিগত সংবাদ ব্রিফিংয়ে আরাঘচি জানিয়েছিলেন, এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে ইরানের জব্দ করা ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড় করা, ইরানের ওপর আরোপিত তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দেশটির বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার।

এ ছাড়া সাত দিনের ওই সময়ে সব ধরনের শত্রুতা বন্ধের কথাও বলা হয়েছে। এর মধ্যে লেবাননে চলমান সংঘাতও রয়েছে, যেখানে ইসরায়েল এখনো দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একটি অংশ দখল করে রেখেছে।

আরাঘচির হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এসব শর্ত পূরণ করতে চার থেকে পাঁচ দিন সময় নেবে। এরপর সপ্তম দিনে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ নিয়ে আলোচনা শুরু করার কথা রয়েছে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটি গ্রহণ করলেই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

আরাঘচির ভাষায়, ‘এখন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। ইরান কোনো ধরনের চাপ, হুমকি বা ভয় দেখানো মেনে নেবে না।’

কী বলছে যুক্তরাষ্ট্র?

ইরানের প্রস্তাব নিয়ে মার্কিন সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

তবে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ট্রাম্প দ্রুতই প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের দাবি পূরণ করবে কি না, তা নিয়ে ট্রাম্প সন্দিহান। ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান দাবি হলো—ইরান কখনো যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে এবং হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল পুনরায় নিশ্চিত করা।

অন্যদিকে ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করবে না। ফলে দুই দেশের মধ্যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

এদিকে এক মার্কিন কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, ইরানের প্রস্তাবের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন কোনো তাড়াহুড়ো করছে না। হরমুজ প্রণালি নিয়ে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী বলেও মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র।

শুক্রবার রাতে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি মানচিত্রের ছবি পোস্ট করেন। সেখানে জলপথটির নাম ‘ট্রাম্প স্ট্রেইট’ বা ‘ট্রাম্প প্রণালি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে। এমনকি জলপথটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি। তবে ইরান এ দাবি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, প্রণালিটির ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

শান্তি আলোচনা কি চলছে?

দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে আলোচনা মূলত পরোক্ষভাবে চলছে।

এ সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে কাতার দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই জানিয়েছে, কূটনীতির পথ এখনো খোলা রয়েছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা আল জাজিরাকে বলেছেন, মধ্যস্থতার মাধ্যমে চলমান আলোচনা ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’।

সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী কাতার জানিয়েছে, শুক্রবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানো এবং পুনরায় সংলাপ শুরুর শর্ত নিয়ে আলোচনা করেছেন।

এর আগে চলতি সপ্তাহে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ নিউইয়র্কে ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মধ্যস্থতার মাধ্যমে আলোচনা করেন। ট্রাম্প ওই বৈঠককে ‘খুব ভালো’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

তবে আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো থমাস ওয়ারিকের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরান একই অবস্থানে রয়েছে কি না, তা নিয়ে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ‘বিপুল সংশয়’ রয়েছে।

আল জাজিরাকে ওয়ারিক বলেন, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাবের সবচেয়ে ভালো ফল হতে পারে—এটি নতুন করে আলোচনা শুরুর সুযোগ তৈরি করবে এবং ওয়াশিংটন কোন কোন পূর্বশর্ত নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত, তা স্পষ্ট হবে।

এরপর কী হতে পারে?

বর্তমান পরিস্থিতি আবারও সংঘাতের দিকে গড়াতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর উদ্ধৃত মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, ট্রাম্প তার সহযোগীদের জানিয়েছেন, আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বোমা হামলা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

এর আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ট্রাম্প বলেছিলেন, কোনো চুক্তি না হলে তিনি ইরানকে ‘ধ্বংস করে দেওয়া’ এবং দেশটিকে ‘নরকে ঠেলে দেওয়ার’ বিষয়টি বিবেচনা করছেন।

একই সময়ে ট্রাম্প বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই সংঘাত অবসানের জন্য একটি চুক্তি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি ইন কাতারের সরকার ও রাজনীতিবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভের মতে, ট্রাম্প ‘প্রতিকূল শর্তে যুদ্ধ শেষ করতে চান না’। নভেম্বরের নির্বাচনের ফলাফল তার নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।

মাসগ্রেভ বলেন, নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়লে এবং কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে ট্রাম্প একতরফা পদক্ষেপ নিতে পারেন, যার মধ্যে আবারও যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত থাকতে পারে।

তার মতে, এমন পরিস্থিতি ইরানের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক আঘাত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। এর ফলে স্বল্পমেয়াদে সংঘাত আরও বাড়তে পারে। তবে এরপর এমন আলোচনা শুরু হতে পারে, যাতে হোয়াইট হাউসকে সরাসরি আত্মসমর্পণ করছে—এমন চিত্র তৈরি না হয়।

আরও পড়ুন

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে