প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১০ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৩:২৫ পিএম
আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ২০:৫১ পিএম
আগামী এক দশকের মধ্যে এআইয়ের কারণে মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ১০ শতাংশ শঙ্কা আছে—এমন ধারণা করাটা “অযৌক্তিক না” বলে মন্তব্য করেছেন নোবেলজয়ী ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পথিকৃৎ জেফ্রি হিন্টন।
এআই নিয়ে একদম সামনের সারিতে কাজ করা গবেষকদের উদ্বেগের তালিকায় এবার তিনিও যোগ দিলেন, যাকে এআইয়ের গডফাদার বলা হয়।
২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত হিন্টন গুগলে (গুগল ব্রেইন) একজন গবেষক এবং ভাইসেস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। তবে এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে স্বাধীনভাবে প্রকাশ্যে কথা বলার জন্য ২০২৩ সালে তিনি গুগল থেকে পদত্যাগ করেন।
গুগল ছাড়ার পর থেকে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি, ভুয়া তথ্য ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র এবং মানবজাতির বিলুপ্তির সম্ভাব্য আশঙ্কার কথা তুলে ধরে বিশ্বজুড়ে জোরালো ভূমিকা পালন করছেন।
কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মেশিন লার্নিংয়ের ভিত্তি স্থাপনকারী উদ্ভাবনের জন্য মার্কিন বিজ্ঞানী জন জে হপফিল্ডের সঙ্গে যৌথভাবে হিন্টন ২০২৪ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
ব্রিটিশ-কানাডিয়ান এই বিজ্ঞানী গত ৯ সেপ্টেম্বর বিবিসির বিশ্লেষণধর্মী সংবাদ অনুষ্ঠান নিউজনাইটের প্রধান উপস্থাপক ভিক্টোরিয়া ডার্বিশায়ারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, মানুষ আগে কখনো এমন কিছু তৈরি করেনি যা মানুষের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠতে পারে। তাই এর ঝুঁকি আগে থেকে অনুমান করা খুব কঠিন।
“আমরা এমন কোনো সত্তা আগে কখনো বানাইনি যা খুব শিগগিরই আমাদের চেয়ে বেশি স্মার্ট হয়ে যেতে পারে। সামনে কী হতে যাচ্ছে, তা আমাদের জানাই নেই,” বলেন হিন্টন।
আগামী এক দশকের মধ্যে এআই সব মানুষকে মেরে ফেলতে পারে—এই শঙ্কা ১০ শতাংশের চেয়ে বেশি কি না জানতে চাওয়া হলে হিন্টন বলেন, এই ঝুঁকি মাত্র ১ শতাংশ মনে করাটা হবে “ভীষণ বোকামি”।
তিনি বলেন, “১০% আশঙ্কা আছে মনে হওয়াটা আমার কাছে অযৌক্তিক কিছু লাগে না। কিন্তু একটা সঠিক হিসাব কীভাবে দিতে হয়, তা আসলে কেউই জানে না।”
হিন্টন সতর্ক করে বলেন, “বিশাল হুমকি হয়ে ওঠার জন্য উন্নত এআইকে একদম বাস্তব জগৎ বা ফিজিক্যাল সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই।
“প্রথমেই যে কথাটা বুঝতে হবে তা হলো, মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর জন্য ওকে বাস্তব জগতে এসে কাজ করতেই হবে না।"
তিনি আরও বলেন, এআই “শুধু মানুষের সঙ্গে কথা বলেই পুরো তালগোল পাকিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে।”
তিনি জানান, মারাত্মক ক্ষমতাসম্পন্ন এসব সিস্টেমকে ব্যবহার করে বিপজ্জনক বায়োলজিক্যাল বা কম্পিউটার ভাইরাস বানানো সম্ভব, আবার ভয়াবহ সাইবার হামলাও চালানো যেতে পারে।
হিন্টনের এই সতর্কতা এমন একটা সময়ে এলো যখন শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলোতে কাজ করা গবেষকরাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
জ্যাকব কক্সন নামের ২৭ বছর বয়সী এক গবেষক, যিনি আগে ওপেনএআই আর অ্যানথ্রোপিকে মূল এআই মডেলগুলো নিয়ে কাজ করেছেন, তিনি সম্ভাব্য ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কোম্পানি দুটি “স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের ক্ষমতা বাড়াতে পারা সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে” —এই অভিযোগ তুলে গত ৮ সেপ্টেম্বর অ্যানথ্রোপিক থেকে পদত্যাগ করেন।

গত ৮ সেপ্টেম্বর অ্যানথ্রোপিক থেকে পদত্যাগ করেন জ্যাকব কক্সন। ছবি: অ্যানথ্রোপিক
“কোনো কোম্পানিই দায়িত্বশীল আচরণ করছে না। তারা জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে সোজা এমন এক সুপারইন্টেলিজেন্স বানানোর প্রতিযোগিতায় ছুটছে যা নিজে থেকেই নিজের উন্নতি করতে পারে,” কক্সন বলেন।
তিনি আরও সতর্ক করেন, যেসব মানুষ এই উন্নত এআই সিস্টেমগুলো বানাচ্ছেন, তারা নিজেরাও আড়ালে ভয় পাচ্ছেন যে এই দশকের শেষের দিকে গিয়ে এই প্রযুক্তি অস্তিত্বের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অ্যানথ্রোপিকের ‘অ্যালাইনমেন্ট সায়েন্স’ বিভাগের প্রধান ইভান হাবিনগার প্রকাশ্যে কক্সনের এই উদ্বেগকে সমর্থন করে গত ৮ সেপ্টম্বর বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করেন আগামী এক দশকের মধ্যে এআই “সব মানুষকে মেরে ফেলবে" —এই আশঙ্কা ১০ শতাংশের চেয়েও বেশি।
তবে হাবিনগার জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান এআই সিস্টেমগুলো থেকে তাৎক্ষণিক তেমন কোনো বিপদ নেই। তার মূল চিন্তা হলো নিজের বুদ্ধিমত্তা নিজে বাড়িয়ে নেওয়ার মাধ্যমে হয়তো সুপারইন্টেলিজেন্স চলে আসতে পারে, যেখানে এআই সিস্টেমগুলো মানুষের সাহায্য ছাড়াই নিজের চেয়েও শক্তিশালী নতুন এআই তৈরি করতে থাকবে।
হিন্টন জোর দিয়ে বলেন, গবেষকদের এখনই বের করতে হবে কীভাবে এমন উন্নত এআই সিস্টেম বানানো যায় যা মানুষের ক্ষতি করার মতো কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য তৈরি করবে না।
তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের এমনভাবে এটা ডিজাইন করা শিখতে হবে যাতে ও নিজে থেকে কখনোই অমন কিছু করতে না চায়।”






