প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫০ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬। ০৭:০৪ পিএম
আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬। ১৯:১৭ পিএম
দিল্লির ছোট্ট, ঠাসাঠাসি ঘরে বসেও ইশামুদ্দিন খান এখনো জাদুর কৌশলে দড়িকে শূন্যে উঠাতে পারেন। ৫৫ বছর বয়সী এই জাদুশিল্পী জীবনের কয়েক দশক কাটিয়েছেন এমন একটি কৌশল দেখিয়ে, যেটিকে একসময় নিছক কিংবদন্তি বলে উড়িয়ে দেওয়া হতো। আন্তর্জাতিক খ্যাতির দিনগুলোর ছবি আর সংবাদপত্রের কাটিং এখনো যত্ন করে রেখে দিয়েছেন তিনি।
তবে আজকাল সেই কৌশল দেখানোর চেয়ে পুরোনো স্মৃতির দিকে ফিরে তাকিয়েই বেশি সময় কাটে তার। “সময় বদলে গেছে,” বলেন তিনি। “পথের জাদু ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছে। এখন যেন ভেন্টিলেটরে বেঁচে আছে।”
খানের গল্প আসলে ভারতের আরও বড় এক পরিবর্তনের প্রতিফলন। দেশটিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাস্তায় পরিবেশনা করে আসা শিল্পীদের জন্য এখন এই পেশা ধরে রেখে জীবিকা চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।
একসময় জাদুকর, জাগলার, পুতুলশিল্পী ও অ্যাক্রোব্যাটরা জনসমাগমের জায়গায় ভিড় টেনে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু বিনোদনের ধরন বদলে যাওয়া এবং জনসমক্ষে পরিবেশনার ওপর বিধিনিষেধ বাড়ায় দর্শক পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই এসব পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।
ভারতের পরিচিত জাদুশিল্পীদের একজন ইশামউদ্দিন খান হলেন মাদারি সম্প্রদায়ের মানুষ। জনসমক্ষে নানা ধরনের খেলা ও জাদু দেখানোর দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে এই সম্প্রদায়ের।
এ নিয়ে সরকারি কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। তবে খানের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রদায়ের নিজস্ব নথিতে দিল্লিতে প্রায় ৪০০ মাদারি পরিবারের উল্লেখ রয়েছে। উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান ও তেলেঙ্গানায়ও রয়েছে আরও কয়েকশ পরিবার।
আজ তাদের সংখ্যা কমে এলেও মাদারিদের শিকড় বহু শতাব্দী পুরনো।
ইতিহাসবিদ অশোক মাথুর বলেন, মাদারি ঐতিহ্যের শিকড় রয়েছে ভারতীয় লোককথা, পুরাণ এবং ভ্রাম্যমাণ শিল্পীদের দীর্ঘ ইতিহাসে। “প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবারের মধ্যেই এসব দক্ষতা শেখানো হতো।” বলেন তিনি।
ইশামউদ্দিন খানও সেই পথেই এগিয়েছেন। বাবা ও চাচাদের কাছ থেকে জাদু শিখেছেন। ১২ বছর বয়স থেকেই পরিবেশনা শুরু করেন। বিশের কোঠায় পৌঁছানোর আগেই আয়ত্ত করে ফেলেন সেই বিখ্যাত দড়ির খেলা, যা পরে তাকে বড় পরিসরে পরিচিতি এনে দেয়।
এই কৌশলে একটি দড়ি যেন নিজে থেকেই বাতাসে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ায়, এরপর একটি ছেলে সেই দড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যায়।
দীর্ঘদিন ধরে এটিকে ভারতীয় পথের জাদুর লোককথার অংশ হিসেবে দেখা হতো। অনেকেই মনে করতেন, বাস্তবে এমন কৌশল দেখানো সম্ভব নয়। খান সেটি করে দেখানোর পর সেই ধারণা বদলে যায়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কৌশলটি আয়ত্ত করতে ছয় বছর লেগেছিল। ১৯৯৫ সালে দিল্লির বিখ্যাত কুতুব মিনারের বাইরে তিনি প্রথমবার প্রকাশ্যে এটি দেখান।
দুই বছর পর কর্ণাটকের একটি সমুদ্রসৈকতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের সামনে একই কৌশল দেখান তিনি।
এই জাদুই তাকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। এরপর যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও জাপানে সফর করেন খান।
তিনি আশা করেছিলেন, নিজের খ্যাতির আলোয় ভারতের ঐতিহ্যবাহী পথশিল্পীদের কথাও সামনে আসবে। কিছু সময়ের জন্য তা হয়েছিলও। কিন্তু সেই আগ্রহ বেশিদিন টেকেনি।
দর্শকেরা যখন নতুন ধরনের বিনোদনের দিকে ঝুঁকতে শুরু করলেন এবং জনসমক্ষে পরিবেশনার সুযোগ কমতে থাকল, তখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শেখা দক্ষতা দিয়ে জীবিকা চালানো অনেক জাদুশিল্পীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
তাদেরই একজন ৪০ বছর বয়সী ইমাম খান।
একসময় তিনিও জাদু দেখাতেন। এখন দিল্লির রাস্তায় বোতল ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিসপত্র কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। পশ্চিম দিল্লির একটি আবর্জনার স্তূপের কাছে বেশির ভাগ সময় কাগজ ও বর্জ্য কুড়িয়ে দিনে প্রায় ২০০ রুপি আয় করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পথের পরিবেশনা কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় একটি হলো জনপরিসরের চরিত্র বদলে যাওয়া।
কাটকথা পাপেট আর্টস ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা অনুরূপা রায় বলেন, জনসমক্ষে উন্মুক্ত জায়গা কমে যাওয়ায় শিল্পীদের দর্শক পাওয়া ক্রমেই কঠিন হচ্ছে।
তার ভাষায়, “বন্ধ পার্ক এবং বাইরের লোকজনের প্রবেশে বাধা দেওয়া আবাসিক কমপ্লেক্সগুলো পরিবেশনার জায়গা কমিয়ে দিচ্ছে।”

ইশামউদ্দিন খান ভারতের অন্যতম পরিচিত পথের জাদুশিল্পী। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ
গবেষক ও শিল্পী কোমিতা ধান্দার মতে, জনপরিসর নিয়ে মানুষের মনোভাব বদলানোও এই পতনের একটি বড় কারণ।
তিনি বলেন, “কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা, বিশেষ করে ব্যস্ত শহর ও নগরকেন্দ্রে, পথশিল্পীদের জন্য খুব সামান্য জায়গা রেখে দিয়েছে।”
শুধু একক শিল্পীরাই যে অনুমতি পেতে সমস্যায় পড়ছেন, তা নয়। ধান্দা জানান, তার পরিচিত পথনাট্য দল জন নাট্য মঞ্চও জনসমক্ষে পরিবেশনার সময় প্রায়ই নানা বাধার মুখে পড়ে।
অনেক শিল্পীর জন্য সমস্যা শুধু জায়গা খুঁজে পাওয়া নয়; কী করা যাবে আর কী করা যাবে না, এই নিয়মের অস্পষ্টতাও বড় বাধা।
অধিকাংশ পথশিল্পী দর্শকের স্বেচ্ছা অনুদানের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থের বিনিময়ে পরিবেশনা আর ভিক্ষাবৃত্তির মধ্যে সীমারেখা অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে যায়।
যুক্তরাজ্যের মতো ভারতে পথশিল্পীদের জন্য কোনো কেন্দ্রীয় ‘বাস্কিং’ নীতিমালা নেই। ফলে শিল্পীদের রাজ্যভেদে জনশৃঙ্খলা, প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, শব্দদূষণ ও সরকারি জমি ব্যবহারের বিভিন্ন নিয়ম মেনে চলতে হয়।
আইনজীবী কৌশিক মিত্র বলেন, “এই কারণেই পথশিল্পীদের প্রায়ই জনপরিসর নিয়ন্ত্রণে থাকা পৌর ও পুলিশি বিধিনিষেধের পাশাপাশি রাজ্যভেদে ভিক্ষাবিরোধী আইনের মুখোমুখি হতে হয়।”
অনেক শিল্পীর জন্য কোভিড পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে দিয়েছে।
২০২০ সালে ভারতে লকডাউন জারি হলে জনসমক্ষে সব ধরনের পরিবেশনা বন্ধ হয়ে যায়। অনেক জাদুশিল্পী নিজ গ্রামে ফিরে যান; কেউ কেউ আর শহরে ফেরেননি।
ধান্দা বলেন, “এই সময়ের পর আমরা জনসমক্ষে পরিবেশনা কমে যেতে দেখেছি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পথের জাদুকর ও অন্যান্য পরিবেশকরা। তাদের অনেকেই আর শহরে ফিরে আসেননি।”
যারা ফিরেছেন এবং পেশা ধরে রেখেছেন, তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে।
৪২ বছর বয়সী শাহিম খান এখনো দিল্লির রাস্তায় জাদু দেখান। কখনো কখনো সঙ্গে থাকে তার ১২ বছরের মেয়ে আলিয়া।
তবে এখন তার অধিকাংশ পরিবেশনা সীমাবদ্ধ শিল্পাঞ্চলে, শহরের সেই ব্যস্ত জনপরিসর থেকে অনেক দূরে যেখানে একসময় তিনি খেলা দেখাতেন। এতে তার আয়ও ব্যাপকভাবে কমেছে।
মহামারির আগে দিনে চার-পাঁচটি শো করতে পারতেন তিনি। আয় হতো ১,০০০ থেকে ১,২০০ রুপি।
তিনি বলেন, “এখন কোনোমতে দুইটা শো করতে পারি, আয় হয় ২০০ থেকে ৪০০ রুপি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ডিজিটাল বিনোদনের উত্থান ঐতিহ্যবাহী শিল্পীদের ওপর আরও চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে পথশিল্প সম্পর্কে মানুষের মনোভাবও বদলেছে।
ধান্দা বলেন, “কয়েক দশক আগে দড়ির খেলার মতো বিষয়ের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বে প্রচুর আগ্রহ ছিল। কিন্তু শিল্পের ধরন ও রুচি বদলেছে। ভারত নিজেকে কীভাবে তুলে ধরতে চায়, সেটাও বদলেছে।”
ইশামউদ্দিন খানের কাছে এই ক্ষতি শুধু অর্থের নয়। তার ভয়, কেউ যদি এই শিল্প না শেখে, তাহলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা পুরো ঐতিহ্যটাই হারিয়ে যেতে পারে।
তার মতে, “কোনো কৌশল তখনই টিকে থাকে, যখন কেউ সেটি শেখে।”
তার ছেলে আলতামাশ কিশোর বয়সে বাবার সঙ্গে পরিবেশনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু এখন তিনি বেলুন দিয়ে পার্টি সাজানোর কাজ করেন। ত্রিশের কোঠায় থাকা আলতামাশ প্রায় পুরোপুরিই পরিবেশনা থেকে সরে এসেছেন। বছরের পর বছর নিয়মিত অনুশীলন না থাকায় তার দক্ষতাও ভোঁতা হয়ে গেছে।
বিবিসিকে জাগলিং দেখাতে গিয়ে তিনি তাল ধরে রাখতে হিমশিম খান। তিনি বলেন, “আমি ধীরে ধীরে সব কৌশল ভুলে যাচ্ছি।”
ইশামউদ্দিন খান আশা করেছিলেন, তার ছেলে পারিবারিক ঐতিহ্যটি এগিয়ে নিয়ে যাবে। আলতামাশও চেয়েছিলেন নিজের নাম তৈরি করতে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি।
তিনি বলেন, “আমি জানতাম, বাবার মতো খ্যাতি হয়তো কখনো পাব না। কিন্তু এমন একটা সময় আসবে, যখন জাদু দেখানোই আর পেশা হিসেবে টিকে থাকবে না; এটা কখনো ভাবিনি।”






